বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার চেনা ছবিটা এখন আর আগের মতো নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে এখন আর মৌলিক গবেষণার বইয়ের ভিড় নেই; বরং সেখানে রাজত্ব করছে নীলক্ষেতের বিসিএস গাইড। ক্লাসের একাডেমিক পড়াশোনায় মন দেওয়ার চেয়ে স্নাতক জীবনের প্রথম বর্ষ থেকেই মেধাবী তরুণদের ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠছে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। এ প্রবণতার কারণে শিক্ষার্থীরা তাঁদের মূল পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বিসিএস পরীক্ষায় টেকার কৌশলে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ছেন। প্রশ্ন উঠেছে, মেধাবীদের ক্যারিয়ার–ভাবনায় বিসিএসই কেন একমাত্র গন্তব্য হবে?
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) এক বিশেষ আলোচনা সভায় নীতিনির্ধারকেরা এই গভীর সংকটের কথা তুলে ধরেন। পিএসসি আয়োজিত ‘সিভিল সার্ভিস নিয়োগে মেধা ও জন–আস্থা শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক ওই প্যানেল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বিসিএস নিয়ে প্রচলিত এ উন্মাদনাকে সরাসরি এক ‘সামাজিক ব্যাধি’ হিসেবে অভিহিত করেন। পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর উপস্থিতিতে তিনি এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
জাহেদ উর রহমান প্রশ্ন তোলেন, স্নাতক জীবনের শুরু থেকেই নিজের একাডেমিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে কেন একজন শিক্ষার্থীকে একটি চাকরির পেছনেই কয়েক বছর নষ্ট করতে হবে? তাঁর মতে, এই আসক্তি মেধাবী জনশক্তি গঠনের পথে বড় অন্তরায়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর প্রায় পৌনে চার লাখ তরুণ এ প্রতিযোগিতার দৌড়ে নামছেন। ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে অংশ নেওয়া ৩ লাখ ৭৪ হাজার প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০ হাজার ৬৪৪ জন পরবর্তী ধাপের জন্য টিকেছেন। অর্থাৎ চূড়ান্তভাবে ক্যাডার হওয়ার সুযোগ পান মাত্র ১ শতাংশের কম প্রার্থী। এই বিশালসংখ্যক তরুণের ব্যর্থতা ও বারবার একই মোহের পেছনে ছুটে চলা প্রজন্মের মধ্যে গভীর হতাশা জন্ম দিচ্ছে।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা। অনেক মেধাবী তরুণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক কিংবা ভালো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে কর্মরত থেকেও কেবল ‘ক্যাডার’ পদের মোহে বছরের পর বছর এ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা বা সৃজনশীল কোনো পেশার পরিবর্তে তরুণেরা তাঁদের শ্রেষ্ঠ সময়টি ব্যয় করছেন গতানুগতিক মুখস্থবিদ্যায়।
প্যানেল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা মত দেন যে সিভিল সার্ভিসের এই তীব্র মোহ থেকে তরুণদের বের করে আনা না গেলে মেধাবীদের একটি বড় অংশ সৃজনশীল পেশার বদলে কেবল প্রশাসনিক জীবনের শৃঙ্খলে বন্দী থাকবে। অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত হন যে একাডেমিক শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনা জরুরি। বিসিএসের এই সামাজিক উন্মাদনা নিয়ন্ত্রণে এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাহসী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। পিএসসির এ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।