
৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ৩০ জানুয়ারি দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হলো। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্নপত্রে বানান ভুলের ছড়াছড়ি এবং ভুল প্রশ্ন নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—যে পরীক্ষায় প্রার্থীর শুদ্ধ বানান জানা বাধ্যতামূলক, সে পরীক্ষার প্রশ্নকর্তারা বানানরীতি সম্পর্কে কতটা সচেতন?
বিসিএস প্রশ্নপত্রে বানান ভুলের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। গত বছরের ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতেও ‘গণ-অভ্যুত্থান’, ‘গণমাধ্যম’, ‘কারণ’ কিংবা ‘উচ্চারণ’-এর মতো শব্দগুলোতে মারাত্মক বানান ভুল ছিল। পিএসসি সেই ভুলের বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ৫০তম বিসিএসেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো।
বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাসে বানানরীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ প্রশ্নপত্রে ‘আচরণ’, ‘গবেষণা’, ‘সাধারণ’-এর মতো বহুল ব্যবহৃত শব্দে ‘ণ’-এর পরিবর্তে প্রায় সব জায়গাতেই ‘ন’ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ভুল করা হয়েছে জানুয়ারি, জ্বালানি ও ব্যক্তিগত বানানেও। পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের নামের বানানও সঠিকভাবে লেখা হয়নি। ‘বাঙালি’ শব্দকে লেখা হয়েছে ‘বাংগালি’ আর ‘দ্বন্দ্ব’ শব্দটিতেও ছিল ভুল।
বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাসে বানানরীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ প্রশ্নপত্রে ‘আচরণ’, ‘গবেষণা’, ‘সাধারণ’-এর মতো বহুল ব্যবহৃত শব্দে ‘ণ’-এর পরিবর্তে প্রায় সব জায়গাতেই ‘ন’ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ভুল করা হয়েছে জানুয়ারি, জ্বালানি ও ব্যক্তিগত বানানেও।
সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় ছিল ৩ নম্বর সেটের (ধরলা) ৩০ নম্বর প্রশ্নে ‘সদ্গুণ’ শব্দটির ব্যবহার। একই প্রশ্নে শব্দটিকে দুবার দুই রকম বানানে লেখা হয়েছে—‘সদগুন’ ও ‘সদগূণ’, যার কোনোটিই সঠিক নয়। এ ছাড়া অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের মতো ইংরেজি শব্দের বাংলা বানানেও প্রশ্নকর্তারা মুনশিয়ানা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রথমবার বিসিএস দিতে আসা এক পরীক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, ‘এতগুলো ভুল দেখে অবাক হয়েছি। পিএসসির মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমরা আরও দায়িত্বশীলতা আশা করি।’
শুধু বানানই নয়, তথ্যেও ভুল পাওয়া গেছে ৫০তম বিসিএসের প্রশ্নপত্রে। উদাহরণ হিসেবে ৩ নম্বর সেটের ২১ নম্বর প্রশ্নটির কথা বলা যায়। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছিল—জলবায়ু পরিবর্তন–সংক্রান্ত জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (UNFCCC) প্রথম ‘কনফারেন্স অফ দ্য পার্টিস’ (COP) কোন শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল? অপশনে কোপেনহেগেন, প্যারিস, ওয়ারশ ও বন শহরের নাম থাকলেও সঠিক উত্তর ‘বার্লিন’ অপশনেই ছিল না। এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন লাখো পরীক্ষার্থী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রার্থী প্রথম আলোকে বলেন, বিসিএসের প্রশ্নটি মানসম্মত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কঠিন এবং কিছু ক্ষেত্রে অতি সাধারণ প্রশ্ন করা হয়েছে।
বিসিএসে পিএসসি পরীক্ষার ফি কমিয়েছে, যা সাধারণ পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্রের মুদ্রণ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই। প্রার্থীরা জানান, ৮ পাতার প্রশ্ন সেটে ২০০টি প্রশ্ন ৭ পাতায় ছোট ফন্টে ছাপানো হয়েছে। একদিকে পরীক্ষার সময় ভয়াবহ স্নায়ুচাপ, অন্যদিকে এত ছোট ফন্টে প্রশ্ন পড়তে গিয়ে অনেকেরই চোখে সমস্যা হয়েছে এবং সময়ের অপচয় হয়েছে। সংকুচিত ফন্টের কারণে প্রশ্নপত্রটি ঘিঞ্জি মনে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
প্রশ্নপত্রে বানান ভুল ও অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বানান ভুলের বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে যেন এমন ভুল আর না হয়, সে বিষয়ে আমরা সচেতন থাকব।’
তবে চাকরিপ্রার্থী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিসিএসের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় এমন ভুল প্রিলিমিনারি পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও গাম্ভীর্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।