চা-বাগানের সবুজ বুকে পাতা তোলার ছবি মানুষকে মুগ্ধ করে। কৈশোর-তারুণ্যে গল্প ও উপন্যাসে চা-বাগানের নান্দনিক বর্ণনা পড়ে চা-বাগান ঘিরে স্বপ্নও বোনেন অনেকে। ফলে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে কেউ কেউ মুগ্ধতার আবেশে স্বপ্নের সেই সবুজ-শ্যামল আর স্নিগ্ধতায় জড়ানো চা-বাগানেই থিতু হতে চান। এমন রোমাঞ্চকর জীবনযাপনের ভাবনা বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় চা-বাগানে ভালো একটি চাকরি নেওয়া। চা-বাগান পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে উৎপাদন কাজে সহযোগিতাসহ নানা ধরনের চাকরি আছে বাগানগুলোতে। যোগ্যতা অনুযায়ী আগ্রহী প্রার্থীরা সেসব পদের জন্য আবেদন করতে পারেন।
বাংলাদেশের ১৬৬টি চা-বাগানের মধ্যে ১৩৮টিই সিলেট বিভাগে। সিলেটের এসব বাগানে প্রায়ই লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিবছর এসব বাগানে গড়ে কয়েক শ লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। সিলেটে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মৌলভীবাজার জেলার দেওয়াছড়া, বড়লেখা উপজেলার সমনবাগ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিটিআরআই চা-বাগান তিনটি পরিচালিত হয়। এর বাইরে সিলেট বিভাগের অন্য বাগানগুলো বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি লিমিটেড কোম্পানি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন।
ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের অধীন সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ১২টি চা-বাগান রয়েছে। প্রায়ই এসব বাগানে বিভিন্ন পদে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ দেওয়ার পর বাগানে কাজ করার উপযুক্ত করে তুলতে তাঁদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ন্যাশনাল টি কোম্পানি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বছরের বিভিন্ন সময় প্রয়োজন অনুসারে লোকবল নিয়োগ দিয়ে থাকে। অন্য সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বা নিজেদের পূর্বপরিচিত যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানগুলো নিজস্ব নিয়মানুযায়ী বিভিন্ন পদের বিপরীতে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে সেসব পদে নিয়োগ দেয়।
চা-বাগানের গুরুত্বপূর্ণ পদ সহকারী ব্যবস্থাপক। এ পদের জন্য যেকোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস প্রার্থীরা আবেদন করতে পারেন। তবে ফরেস্ট্রি, নৃবিজ্ঞান ও কৃষি বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হয়। সহকারী ব্যবস্থাপক ছাড়াও চা-বাগানে চিকিৎসক, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, টেকনিশিয়ান, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীসহ বাগান, ফ্যাক্টরি ও অফিস পরিচালনার জন্য টিলা করণিক, ফ্যাক্টরি করণিক, অফিস করণিক, ফোরম্যান, পরিসংখ্যান সহকারী, জ্যেষ্ঠ মেকানিক, সার্ভেয়ার, কম্পিউটার অপারেটর, হিসাব সহকারীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া গাড়িচালক, ইলেকট্রিশিয়ান, কার্পেন্টার, পাচক, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী, চেইনম্যান, মালিসহ নানা পদে কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়।
চিকিৎসক পদের জন্য এমবিবিএস পাস, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি, টেকনিশিয়ান পদের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি, প্রশাসনিক কর্মকর্তার জন্য স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস এবং কর্মচারী পদের জন্য মাধ্যমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস নবীন স্নাতকেরা যেমন চা-বাগানের চাকরিতে আবেদন করতে পারেন, তেমনি অভিজ্ঞদের জন্যও রয়েছে নানা পদের চাকরি। মহাব্যবস্থাপক, উপমহাব্যবস্থাপক, ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও প্রধান করণিক পদে প্রায়ই অভিজ্ঞ প্রার্থীদের নেওয়া হয়। বিশেষ করে, ব্যক্তিমালিকানাধীন চা-বাগানে এসব পদে লোকবল বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়।
চা-বাগানে যাঁরা চাকরি নেন, তাঁদের সবাই আবাসন, চিকিৎসা ও বিদ্যুতের সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে একেক বাগান কর্তৃপক্ষের বেতন কাঠামো একেক রকম। তাই একই পদে চাকরি করেও বাগান ভেদে বেতনের পরিমাণ কমবেশি রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানে তুলনামূলকভাবে বেতন কিছুটা বেশি।
সহকারী ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা শুরুতেই বাগান ভেদে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়ে থাকেন। পাশাপাশি বিনা মূল্যে চিকিৎসা, আবাসন, বিদ্যুৎসহ নানা সুবিধা পেয়ে থাকেন। প্রতিবছর আবার দক্ষতা অনুযায়ী তাঁদের বেতনও বৃদ্ধি পায়। আবাসন-সুবিধার পাশাপাশি শুরুতেই একজন চিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ২২ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং টেকনিশিয়ান ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা চাকরির শুরুতে লাখ টাকারও বেশি বেতন পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে কর্মচারীরা কমবেশি ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পান।