সকাল থেকে টানা বৃষ্টি। রাজধানীর ঝিগাতলার বাসায় আটকে আছেন দীপ্ত। বাইরে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে দেখলেন, চাল আছে, ডাল আছে, কিন্তু রান্নাঘরে হলুদ নেই। বৃষ্টির দিনে বাজারে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়ারও সুযোগ নেই। অগত্যা চুলায় উঠল ‘সাদা খিচুড়ি’।
তবে দীপ্তের চিন্তা খিচুড়ির রং নিয়ে নয়, তাঁর মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা—চাকরি। ল্যাপটপ খুলে সামনে বসে আছেন পুরোনো সিভি নিয়ে। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন। কোথাও কোনো উত্তর নেই। কয়েকটি জায়গায় সাক্ষাৎকার পর্যন্ত গিয়েও শেষ মুহূর্তে সুযোগ হয়নি। বন্ধুরা অবশ্য মজা করেন, ‘তোর সিভি এত জায়গায় গেছে যে এখন ওটাই সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা!’ দীপ্ত হাসেন। কিন্তু জানেন, এই হাসির আড়ালে রয়েছে হাজারো তরুণের একই অপেক্ষা। চাকরির বাজারে এখন শুধু যোগ্যতা থাকলেই হচ্ছে না, সেই যোগ্যতা কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবার সিভির চিরচেনা খোলসটাই বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
সিভিতে শুধু দায়িত্ব নয়, দেখান আপনার সাফল্য—
একসময় সিভি ছিল কেবলই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পূর্ববর্তী চাকরির একটি সাধারণ তালিকা। বর্তমান সময়ে এসে সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। নিয়োগদাতারা এখন শুধু প্রার্থীর ডিগ্রির খাতা দেখতে চান না, তাঁরা জানতে চান প্রার্থী প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা ফলপ্রসূ হতে পারবেন।
তাই সিভিতে শুধু নিজের প্রাত্যহিক দায়িত্বের কথা না লিখে, সেখানে সুনির্দিষ্ট অর্জনগুলো ফুটিয়ে তোলা জরুরি। যেমন ‘বিক্রয় বিভাগে কাজ করেছি’ লেখার চেয়ে ‘গ্রাহক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোম্পানির বিক্রি ১৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছি’—এমন তথ্য একজন প্রার্থীর সক্ষমতা নিয়োগদাতার কাছে অনেক বেশি স্পষ্ট করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো সিভির মূল শক্তি হলো কম কথায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের উপস্থাপন। বড় বড় গালভরা শব্দ বাদ দিয়ে নিজের কাজের ফলাফল, সংখ্যা, শতকরা হিসাব ও শেখার বিষয়গুলো হাইলাইট করলে তা সহজেই নজর কাড়ে। বর্তমান চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে সিভিতে ‘আমি কী কী করেছি’–এর পাশাপাশি ‘আমাকে কেন বেছে নেওয়া উচিত’—এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট থাকতে হবে।
লিংকডইনে তৈরি করুন নিজের পেশাদার পরিচয়—
ডিজিটাল যুগে চাকরি খোঁজার ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। শুধু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মেইল পাঠিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করার দিন এখন শেষ। অনেক তরুণ এখন লিংকডইনকে ব্যবহার করছেন নিজের একটি শক্তিশালী পেশাগত ব্র্যান্ড তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। সেখানে তাঁরা নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা, নতুন শেখা বিষয়, বিভিন্ন প্রকল্পের নমুনা ও পেশাগত আগ্রহ তুলে ধরছেন। একটি গোছানো ও সক্রিয় লিংকডইন প্রোফাইল কোনো আবেদন ছাড়াই নিয়োগদাতার নজর কাড়তে পারে।
প্রোফাইলকে আকর্ষণীয় ও পেশাদার করতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন—
পেশাদার ছবি ব্যবহার: একটি হাসিমুখের একক ও স্পষ্ট ছবি আপনার সম্পর্কে প্রথম ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট হেডলাইন: আপনি মূলত কোন ক্ষেত্রে কাজ করছেন এবং আপনার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী, তা ছোট ও স্মরণীয় বাক্যে ডেসক্রিপশনে লিখুন।
দক্ষতার নিয়মিত আপডেট: নতুন কোনো প্রশিক্ষণ, কোর্স বা প্রজেক্ট শেষ করলেই তা প্রোফাইলে যোগ করুন এবং বন্ধুদের বলুন সেই দক্ষতাগুলোতে ‘এনডোর্স’ বা স্বীকৃতি দিতে।
পেশাগত যোগাযোগ বাড়ানো: নিজের ক্ষেত্রের সফল মানুষের সঙ্গে যুক্ত হোন, তাঁদের কাজ ফলো করুন এবং ইনবক্সে নিজের একটি মার্জিত পেশাদার পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ বাড়ান।
বিশ্বজুড়ে এখন প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে তরুণেরা নিজেদের অন্যভাবে উপস্থাপন করছেন। তবে মনে রাখতে হবে, সিভি বা লিংকডইন কোনো জাদুর কাঠি নয়। নিজের প্রকৃত দক্ষতা, ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি এবং সঠিক উপস্থাপনার নিখুঁত সমন্বয়ই একজন প্রার্থীকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে দেয়।
দীপ্তের সাদা খিচুড়ির দিন হয়তো একদিনেই শেষ হবে, কিন্তু সিভিতে নিজের দক্ষতার গল্প নতুনভাবে লেখার এই চেষ্টা তাঁকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। কারণ, ২০২৬ সালের এই আধুনিক কর্মসংস্থানের বাজারে শুধু তথ্যের খতিয়ান দিয়ে নয়, নিজের সম্ভাবনার গল্প দিয়েই জায়গা করে নিতে হয়।