দীর্ঘদিনের কাজের চাপ, অতিরিক্ত দায়িত্ব কিংবা নিজের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা—এসব থেকে ধীরে ধীরে একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু কখন বুঝবেন এটি সাধারণ ক্লান্তি নয়, বরং বার্নআউট?
যুক্তরাজ্যের জো হুপারের অভিজ্ঞতা বিষয়টি সামনে এনেছে। ক্যারিয়ারে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ছিল তাঁর এবং স্বপ্ন পূরণও করেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ সময় কাজ করা, সব দায়িত্ব নেওয়া এবং অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরির কারণে শেষ পর্যন্ত বার্নআউটে আক্রান্ত হন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বার্নআউটকে দীর্ঘস্থায়ী কর্মক্ষেত্রের চাপ থেকে তৈরি হওয়া একটি অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করে। এতে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন, কাজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে এবং কর্মদক্ষতা কমে যাচ্ছে বলে মনে হতে পারে। তবে ডব্লিউএইচও বার্নআউটকে কোনো মানসিক রোগ বা অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করে না।
মনোবিজ্ঞানী ও বিজনেস কোচ জিল উইলিয়ামস বলেন, যাঁরা কাজে নিখুঁত হতে চান কিংবা সব সময় বাড়তি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকেন, তাঁদের বার্নআউটের ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ যে বৈশিষ্ট্যগুলো কাউকে কর্মক্ষেত্রে সফল করে তুলতে পারে, সেগুলোই কখনো কখনো অতিরিক্ত চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছুটি বা বিরতি নেওয়া উপকারী হতে পারে। এতে শরীর ও মনকে কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া যায়। তবে যে পরিবেশ বা পরিস্থিতি থেকে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটিতে পরিবর্তন না আনলে দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা থেকে যেতে পারে। পাবলিক হেলথ ওয়েলসের অ্যামি ডেভিস বলেন, ছুটি কখনো কখনো সহায়ক হতে পারে, তবে চাপ তৈরির কারণগুলোর পরিবর্তনও প্রয়োজন।
বার্নআউটকে শুধু চাকরির সঙ্গে যুক্ত করে দেখাও ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা চাপ থেকে তৈরি হতে পারে।
পরিচর্যাকারী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষও বার্নআউটে আক্রান্ত হতে পারেন।
বার্নআউটকে অনেক সময় উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বার্নআউটকে মানসিক স্বাস্থ্যগত রোগ বা অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করে না। তবে দীর্ঘদিন অবহেলা করা হলে বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মতো সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তাই দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টিকে শুধু ‘কাজের ক্লান্তি’ হিসেবে এড়িয়ে না গিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মেন্টাল হেলথ ইউকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রতি ৫ তরুণ কর্মীর মধ্যে প্রায় ২ জন কাজের চাপজনিত মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার কারণে ছুটি নিয়েছেন।
শুধু ব্যক্তির নিজের আচরণ নয়, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কম বেতন, অনিরাপদ চাকরি ও অসম্ভব মাত্রার কাজের চাপের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা প্রয়োজন। তা না করে শুধু কর্মীদের জন্য ‘ওয়েলবিয়িং’ উদ্যোগ নিলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও জো হুপারের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বার্নআউটের লক্ষণকে অবহেলা না করা, প্রয়োজনে কাজ থেকে বিরতি নেওয়া, অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার অভ্যাস পর্যালোচনা করা এবং চাপের মূল কারণ চিহ্নিত করা। শুধু কর্মীকে আরও ‘সহনশীল’ হওয়ার পরামর্শ না দিয়ে কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপ, অসম্ভব কাজের বোঝা ও অস্বাস্থ্যকর প্রত্যাশারও পরিবর্তন প্রয়োজন।