ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা অতিথি হিসেবে পেয়েছি বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগীতশিল্পী আমাদের অগ্রজ রফিকুল আলমকে। রফিকুল আলম ভাই, আপনাকে স্বাগত জানাই।
রফিকুল আলম: অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে এবং প্রথম আলোকে।
আমরা এ অনুষ্ঠানে জীবনের কাহিনি শুনি। জন্ম থেকে শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর আপনার জন্ম?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
রাজশাহীতে?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, রাজশাহীতেই। রাজশাহী থেকে আরও বেশ দূরে ভারতের সীমান্তের কাছে একটা জায়গা আছে। জায়গাটার নাম অদ্ভুত, লক্ষ্মণপুর। অর্থাৎ শিবগঞ্জ পার হয়ে। ওখান থেকে ভারতের বিভিন্ন আলো-টালো দেখা যায়, এত কাছে আরকি! ওখানে আমার নানির বাড়ি। আমার নানির বাড়িতেই জন্ম।
আর দাদার বাড়ি কোথায়?
রফিকুল আলম: রাজশাহীতেই মূল, ওই চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ আমার দাদাদের অবস্থান ছিল মালদহে (পশ্চিমবঙ্গ)।
মালদহ–চাঁপাইনবাবগঞ্জ একই জেলা ছিল?
রফিকুল আলম: চাঁপাইনবাবগঞ্জ মালদহের একটা সাব-ডিভিশন ছিল ব্রিটিশ আমলে। আমার জন্ম সেখানেই, আমার নানির বাড়িতে।
আপনার আব্বার নাম কী? তিনি কী করতেন?
রফিকুল আলম: আমার বাবা ভূস্বামী; যা হয় আরকি ওই অঞ্চলের মানুষদের। আমার বাবার নাম মাহমুদ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ।
আর আম্মার নাম?
রফিকুল আলম: আম্মার নাম মমতাজ মহল।
আপনার প্রথম স্কুল কোনটা?
রফিকুল আলম: রাজশাহী শহরেই। আমি গ্রামে কখনো থাকিনি। হ্যাঁ, থাকতে হয়নি। শহর হলো সাগরপাড়া, রাজশাহীর। ওখানে ওই সময় খুব বিখ্যাত একটা স্কুল ছিল। ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমি। সেটাই আমার প্রথম স্কুল।…হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য স্কুল করা হয়েছিল। ওখানে মুসলমান ছাত্রদের নেওয়া হতো না। মানে যেতও না এবং ব্রিটিশ আমল থেকে ওটা একটা টোলের মতো ছিল যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের, সনাতন ধর্মের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে। কিন্তু আমাদের পারিবারিক একটা প্রভাব ও সুনাম ছিল সংস্কৃতির দিক দিয়ে। তখন আমার বড় ভাই ডক্টর সারওয়ার জাহান খুব জনপ্রিয়। আমার চাচারা খুবই প্রভাবশালী শিক্ষিত লোক ছিলেন শিক্ষা অঙ্গনে। ফলে ওই স্কুল অথরিটি আমার বড় ভাইকে একমাত্র মুসলমান ছাত্র হিসেবে নিল এবং পরবর্তীকালে আমাকেও নিল। সেটার কারণ কিন্তু ওই গানবাজনাই। আমার বড় ভাই খুবই জনপ্রিয় ছিলেন গান। ওইখানে আমার লেখাপড়া। তখন একটাই বোর্ড ছিল—ঢাকা বোর্ড। ওই স্কুলের সুনাম ছিল যে এক থেকে দশের মধ্যে একজন থাকতই। খুব ভালো ভালো শিক্ষক ছিলেন। সেটাই মূল কারণ আরকি!
ম্যাট্রিক পাস করেছেন কত সালে?
রফিকুল আলম: ’৬৩–তে।
’৬৩–তে। তারপর রাজশাহী কলেজ?
রফিকুল আলম: রাজশাহী কলেজ।
সেখান থেকে পড়ে আপনি কোথায় এলেন?
রফিকুল আলম: রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে। এই দুটো প্রতিষ্ঠান আমাকে ভীষণ সহায়তা করেছে। আমার স্কুল ভোলানাথ একাডেমি। বলা হতো, একাডেমি নামেই স্কুলটা পরিচিত ছিল। পরে গভর্নমেন্ট কলেজে ঢুকে আরও চমৎকার পরিবেশ পেলাম শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখাপড়ার। আমি সায়েন্সের ছাত্র ছিলাম না। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে আমি ভর্তি হলাম ইকোনমিকসে। ভর্তি হওয়ার পর আমার মনে হলো যেন আমার শিক্ষকেরা বলল, ‘ইকোনমিকসে তুমি যদি ভালো করতে না পারো, তাহলে তো তোমার অসুবিধা হবে। তোমার ভাই বাংলা সাহিত্যে পড়েছে।’ তো তখন আমি শিফট করলাম পলিটিক্যাল সায়েন্সে–রাষ্ট্রবিজ্ঞানে।…অনার্স পড়লাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব চমৎকার সাংস্কৃতিক বাতাবরণ ছিল, এখনো আছে।
সংগীতশিল্পী হিসেবে আপনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন?
রফিকুল আলম: ভীষণ জনপ্রিয় হলাম। আমার ভাই জায়গাটা তৈরি করে রেখেছিল। সেও যেহেতু অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তারপর আমারও সেই সুবিধা হলো। এ কথাও ঠিক যে রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে সংস্কৃতিচর্চার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নয়। ছাত্ররা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন চালাত, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল ইউনিভার্সিটিতে। ওখানে আমার গান গাওয়ার জন্য চমৎকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
আপনি ছোটবেলা থেকেই গান শিখতেন?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
আপনার ওস্তাদদের কথা মনে আছে?
রফিকুল আলম: অবশ্যই। আমার গান শেখাটা সত্যি সত্যিই একেবারে শৈশব থেকে। গানের চর্চা আমার বাড়িতে ছিল। আমার চাচারা—ছোট চাচা এবং আমার বাবাও গান করতেন। পেশাগতভাবে নয়, তবে চর্চাটা ছিল। বারবার আমার বড় ভাইয়ের প্রসঙ্গ এসে যাবে গানের ব্যাপারে। উনি তখন গান শিখছেন, প্রথাগত শাস্ত্রীয় সংগীত শিখছেন। একজন অত্যন্ত বিখ্যাত মানুষ ছিলেন, হরিপদ দাস, তাঁর কাছে। তিনি আবার লক্ষ্ণৌ মরিস কলেজ থেকে শিখে আসা মানুষ।…মরিস কলেজের শাস্ত্রীয় সংগীত শেখা। ওনার একটা বিষয় ছিল, উনি খুব বড়লোকের সন্তান ছিলেন, জমিদারসন্তান ছিলেন; গান শিখিয়ে কোনো টাকাপয়সা নিতেন না। কখনোই কারও কাছ থেকে টাকাপয়সা নেননি। আমার বড় ভাই এবং অন্য যাঁরা আছেন–ছিলেন, অর্থাৎ যাঁরা সত্যি সত্যি গান শিখতে চান, তাঁদের তিনি শেখাতেন শাস্ত্রীয় সংগীত। পরবর্তীকালে আব্দুল জব্বার খান নামের তাঁরই ছাত্র, খুব নামকরা শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ছিলেন। উনি ভারতেও ওই সময়ে গান গাইতে যেতেন। ওনার কাছে তালিমও আমি নিয়েছি এবং ওনার কাছ থেকেই আমার লাইট মিউজিকের প্রতি আকর্ষণটা হয়েছে। শাস্ত্রীয় সংগীতটা হরিপদ বাবুর কাছ থেকে শিখেছি। উনি খুব চমৎকার ভজন গাইতেন। আধুনিক গান তো গাইতে পারতেনই, নজরুলসংগীতও গাইতে পারতেন। কিন্তু লাইট সিঙ্গিংয়ের গায়কিটা ওনার চমৎকার ছিল। ওই সময় যেহেতু ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ অতখানি ছিল না, তাই উনি এক্সপোজারটা পাননি। কিন্তু আমার যতটুকু সংগীতের মেধা, তা দিয়ে আমি জাজ করতে পারি, ভদ্রলোকের লাইট মিউজিকের একটা অসাধারণ মেধা ছিল। তার কিছুটা আমরা পেয়েছি।
আপনি প্রথম রেডিওতে গান করলেন কি রাজশাহীতে?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ। রাজশাহী বেতারে হলো কী, তখন অডিশনের ব্যাপারটা অর্থাৎ তালিকাভুক্তি হওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু খুবই কঠিন ছিল।… সেখানে পাস করতে হতো। আমি তখন কেবল আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি। বেশ ফাঁকা সময়। ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা মেরে বেড়াচ্ছি। তখন রাজশাহী বেতারে ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’ নামে একটা অনুষ্ঠান হলো। সেখানে আকরাম হোসেন সাহেব, সম্ভবত তিনি এখনো বেঁচে আছেন, পরবর্তীকালে তিনি সিভিল সার্ভেন্ট হয়েছিলেন, উনি প্রোগ্রামটা করতেন। যেহেতু খুব বেশি গাওয়ার সুযোগ পাইনি; কারণ, গান গাইতে নিষেধ করেছিলেন আমার ওস্তাদরা। গান গাইতে দিতেন না, (বলতেন) স্টেজে এখন গান গাইবে না। এবং সেই নিষেধাজ্ঞা খুব জুডিশিয়াসলি অনুসরণ করতে হতো আমাদের। করতাম, কোথাও গান গাইতাম না। কিন্তু মাঝে মাঝেই তিনি কী করে জেনেছেন যে আমি মোটামুটি ভালো গাই; সারওয়ারের ছোট ভাই, নিশ্চয়ই ভালো গান গাইবে। স্টুডেন্টস ফোরামে একটা গান গাইতে হবে উইদাউট অডিশন, অডিশন লাগবে না। অর্থাৎ একটা ছাত্র, কে কী গান গাইছে—এ রকম। তো খুবই অনাগ্রহের সঙ্গে গানটা গাইতে গেলাম যে ভালো হবে না হয়তো। কিন্তু ওই একটা লাইভ, তখন তো রেকর্ডিংয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, লাইভ একটা গান গাইলাম। আমার খুব প্রিয় একটা গান—রবীন্দ্রসংগীত। তখন আমি রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাটাই করতাম বেশি, আধুনিক গান গাইতাম না। এবং গাওয়াটা আমার খুব ভালো হয়েছিল। তাতেই তখনকার রেডিও অথরিটি বলল যে শিল্পী-টিল্পী তো কম এখন। ঢাকা থেকে শিল্পী এনে অনেক গানের প্রোগ্রাম চালাতে হয়। এ তো ভালো গায়, একে এখানে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। সলিমুদ্দীন সাহেব নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন, আব্দুল কাহার নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন। ওনারা খুব সংস্কৃতিমান লোক ছিলেন। রেডিওর গভর্মেন্ট অফিসার, কিন্তু তাঁদের ভেতরে এই সংস্কৃতির চিন্তাটা ও শিল্প-সাহিত্যের প্রতি খুব অনুরাগ ছিল। তো তাঁরা বলেন যে আমরা একটা স্পেশাল অডিশন নিয়ে একে নিয়ে নিই। এবং সত্যি সত্যি একদিন ডাক পড়ল যে তোমার অডিশনে গান গাইতে হবে। আমি তো আরও ভয় পেয়ে গেলাম যে অডিশনে গান গাওয়া! তারপর দেখলাম যে হ্যাঁ, ওনারা যাঁরা আছেন, আমাকে গান গাইতে বললেন। আমি একটা গানই গেয়ে এলাম এবং অডিশনে তখনই তালিকাভুক্ত হলো। অর্থাৎ তালিকাভুক্তির ব্যাপারটা খুবই অফিশিয়ালি স্ট্রিক্ট ছিল যেহেতু, তাই ওই স্পেশাল অডিশনে নিয়ে আমাকে রেডিওতে নেওয়া হলো। তারপরই গাওয়া শুরু করলাম। তখন আমার ওস্তাদরা বলেন যে, হ্যাঁ ঠিক আছে, এখন গাও রেডিওতে। গাইতে গেলে অভিজ্ঞতাও বাড়বে। শুধু রবীন্দ্রসংগীতে আমাকে নেওয়া হলো। আর আধুনিক গাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
আপনার মনে আছে, প্রথম গান কোনটা গেয়েছিলেন?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ। মনে আছে? রবীন্দ্রসংগীত। ‘যায় নিয়ে যায় আমায় আপন গানের টানে/ ঘর–ছাড়া কোন্ পথের পানে।’
খুব অপ্রচলিত একটা রবীন্দ্রসংগীত, কিন্তু আমার খুব প্রিয় গান ছিল এটা।
’৬৩-তে ম্যাট্রিক?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
’৬৫-তে ইন্টারমিডিয়েট?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
তার মানে ’৬৯ পর্যন্ত তো আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ছেন?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান আপনি রাজশাহীতে দেখেছেন?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ। ’৬৯ দেখেছি এবং তখন আমার অনার্স পরীক্ষা হয়ে গেছে। অনার্স পরীক্ষার রেজাল্টও হয়েছে, আমার খুব ভালো রেজাল্ট হলো। তখন ফার্স্ট ক্লাস কেউ পায়নি, আমি সেকেন্ড হয়ে গেলাম ডিপার্টমেন্টে। বেশ সুনাম হয়ে গেল, বাপরে বাপ! তখন আমার চেয়ারম্যান ছিলেন বদরুদ্দীন উমর সাহেব। উনি একদিন, খুব গম্ভীর মানুষ, ডেকে বললেন যে অনেক হয়েছে, মানে অনেক হয়েছে, এবার লেখাপড়ার দিকে মনোযোগ দাও। কারণ, আমাদের পরিবার সম্পর্কে তখনকার যাঁরা বড় শিক্ষক ছিলেন, তাঁরা জানতেন। বললেন, না, অনেক হয়েছে, এবার লেখাপড়ার দিকে মনোযোগ দাও। তো সেটা অনুসরণ করতে পারিনি। তারপর তো স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
মুক্তিযুদ্ধে তো আপনি যোগ দিয়েছেন?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ। তাতে হলো কী, স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রসঙ্গটা এ কারণে আমার সব সময় আনতে হয় যে আমার ভেতরে যে পরিবর্তনটা হলো, অর্থাৎ শুধু রবীন্দ্রসংগীত করতাম, শাস্ত্রীয় সংগীত করতাম, মাঝেমধ্যে হয়তো গজল কিংবা ভজন গাইতাম। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গিয়ে আমার একটা মানসিক পরিবর্তনও হলো—এই যে রবীন্দ্রসংগীত গায়, ধরাবাঁধা সুর, এর বাইরে গেলেই মানুষ সমালোচনা করে, আমার নিজস্ব কিছু দিতে পারছি না এবং সেই সুযোগটা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এলে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের গান। হ্যাঁ? ‘জাগো, জাগো প্রদীপ নিভায়ে দাও, জাগো...’ এই যে এই নোট স্ট্যাকাটো, নোট লাগানোর আমার তখনো অভ্যাস হয়নি। কিন্তু ওখানে গিয়ে সেটা হলো। তাতে আমার মনে হলো, স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিজেকে নিয়ে ভাবনা এল যে আমি তো আরও অনেক কিছু দেখাতে পারি আমার গান দিয়ে। এভাবে আধুনিক গানে এলাম স্বাধীনতার পর।
তাহলে আপনি ঢাকায় এলেন কবে?
রফিকুল আলম: স্বাধীনতার পর। স্বাধীনতার পর, আমার এমএ ফাইনাল পরীক্ষা বাকি। তখন তো থ্রি ইয়ার্স কোর্স ছিল অনার্স, এক বছর ছিল এমএ। এমএ পরীক্ষায় আমার রেজাল্ট অত ভালো হলো না। আমি ফোর্থ হলাম। তারপর ওখানে আমার টিচার ছিলেন ডক্টর তালুকদার মনিরুজ্জামান। উনি আমাকে বললেন, ‘দেখো আরেকটু কষ্ট করো, দুই–একটা আর্টিকেল ছাপো সাবজেক্টের ওপরে। আর তোমাকে সিনপসিস দিচ্ছি, তুমি একটা পিএইচডি থিসিসের জন্য অ্যাপ্লাই করো। আর দুই–একটা আর্টিকেল ছাপাও। আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্কোপ আছে, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে তোমাকে নিয়ে নিতে পারব। তো সেই অনুযায়ী এগোতে যাচ্ছি। ডক্টর মাজহারুল ইসলাম নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন—বিরাট বড় মাপের ফোকলোরিস্ট। তখন তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। উনি কী একটা কাজে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন, তখনকারই টিচার ছিলেন। আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘তুমি আগামী মাসে অবশ্যই ঢাকা আসবে, অনেক কাজ আছে।’ উনি এভাবেই কথা বলতেন। ‘কাজ আছে, আমি তালুকদার মনিরুজ্জামান...’
তালুকদার মনিরুজ্জামান তো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন...
রফিকুল আলম: হ্যাঁ হ্যাঁ, উনি আমার সরাসরি...
উনি পরে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন। আর ড. মাজহারুল ইসলাম তো রাজশাহীতে ছিলেন, পরবর্তীতে ঢাকায় এলেন, বাংলা একাডেমির...
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, স্বাধীনতার পর ঢাকায় এলেন। উনি বিখ্যাত ফোকলোরিস্টও ছিলেন। উনি বললেন, ‘দেখা করো।’ আমি ভাবলাম যে হয়তো সাংস্কৃতিক বা অন্য কোনো কারণে আমাকে ডেকেছেন। ডেকে খুবই গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমরা একটা প্রজেক্ট করছি; তোমার রাজশাহীতে থাকার দরকার নেই।’ আমি কী রকম দোটানায় পড়লাম। আমার শিক্ষক বলছেন, ‘তুমি এখানে থাকো, একটা আর্টিকেল ছাপো। তোমাকে চাকরিতে নিয়ে নেব।’ আর উনি বলছেন, ‘না, বাংলা একাডেমিতে চলে আসো। রাজশাহীতে থেকে তুমি কিছু করতে পারবা না।’ এবং উইদাউট অ্যানি ইন্টারভিউ, উইদাউট অ্যানি অ্যাপ্লিকেশন উনি বাংলা একাডেমিতে আমাকে নিয়ে নিলেন। তখন উনি ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ব বিভাগ নামে একটা বিভাগ খুলেছিলেন, একটা প্রজেক্ট। এইভাবে আমাকে চলে আসতে হলো। সত্যি কথা বলতে কি, যখন এলাম, তখন আমি কাউকেই বলিনি। কারণ, সবাই না করত আমি জানি, আমার মা বিশেষ করে। চলে এলাম। এসে জয়েন করলাম। তখন খুব ভালোই লাগল। একটা গবেষণামূলক কাজ আর বিরাট সুযোগ। তখন আমাকে পেয়ে ঢাকার শিল্পীমহল আরও খুশি। কাদের হোসেন খান সাহেব, সুজেয় শ্যাম, তারপর লাকী আখান্দ্—এঁরা খুব খুশি, ‘হ্যাঁ, চলো অনেক কাজ আছে, অনেক সুযোগ আছে।’ এবং সত্যি সত্যি খুব ভালো লাগল। এইভাবে আমার জীবন খুব চমৎকারভাবে চলতে শুরু করল।
ফলে রাজশাহীর পিছুটানটা আমার কেটে গেল। আমার মা তো তখন আমার অফিসে টেলিফোন করে, আমার বাড়িতে তখন টেলিফোন ছিল না, আমার চাচার বাড়ি থেকে টেলিফোন করে বলেন, ‘তুই কেন ওখানে গেলি? কত টাকা বেতন দিবে? আমি ওই টাকা তোকে এখানে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। তোর ঢাকায় থাকার দরকার নেই।’ তো সেটা আর রক্ষা করা হয়নি, থেকে গেলাম।
ঢাকায় রেডিওতে গান গাইলেন কবে? টিভিতে গান গাইলেন কবে? সিনেমাতে গান গাইলেন কবে?
রফিকুল আলম: আচ্ছা। বাংলা একাডেমিতে জয়েন করার বোধ হয় মাস ছয়েকের মধ্যেই আমি কিন্তু চাকরিতে খুব নিমগ্ন হয়ে গেলাম—এটা একটু রিসার্চ ওয়ার্ক। তো তখন খুব স্বাভাবিকভাবে ঢাকা রেডিও থেকে…তাহের খান… তাহের উদ্দিন…তাহের খান নামে একজন ভদ্রলোক, রিসেন্টলি কানাডায় মারা গেছেন, মিউজিকের তিনি বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। উনি লোক পাঠিয়ে বললেন, লাকী আখান্দ্ একটা গান করবে, আধুনিক গান শুরু হয়েছে, করতে হবে। সেইখানে তখন আমি রেগুলার। তখন আবার আইনগুলো খুব কঠিন ছিল যে তুমি ঢাকাতে যে গান গাইবে, তাতে রাজশাহী বেতারের একটা ছাড়পত্র লাগবে। তো আমাকে ছাড়পত্র ছাড়াই বলে গাইতে হবে। আমি গান গাইলাম। লাকী আখান্দ্ একটা গান সুর করল আমার জন্য। এস এম হেদায়েতের লেখা এই গান গাওয়ার সময় আমার এত ভয় লাগল যে এই গান তুই আমাকে দিয়ে গাওয়াচ্ছিস? কারণ, কেউ শুনবে না তো। একটু রাগাশ্রয়ী গান। তো এই গানের কথাও খুব চমৎকার ছিল। এখনো খুব জনপ্রিয় গানটা। আমি একটু করছি।
একটু গেয়ে শোনান।
রফিকুল আলম: গানটা ছিল এ রকম: (গান গাইছেন) তোমাকে যেন ভুলে না যাই, সে আশিস দাও মোরে। দূর থেকে যেন ওগো মরমে তোমায় খুঁজে পাই, তোমাকে যেন ভুলে না যাই...
এ ধরনের এই গায়কি তখন ঢাকাতে খুব কম ছিল। এর প্রভাব এসেছে কিন্তু দুজন শিল্পীর মাধ্যমে। যেটাতে লাকী, লাকীও খুব ট্যালেন্টেড মানুষ ছিল। কাকে দিয়ে কী কাজ করাতে হবে, এটা সে জানত। মেহেদী হাসান সাহেবের গায়কিটা আমার ওপর তখন খুব ভর করেছে। খুব ভীষণ। কলকাতায় তখন মেহেদী হাসান সাহেবের গান শুনলেই মানুষ পাগল হয়ে যাচ্ছে এবং তার প্রভাবটা আমার পড়েছিল। এবং আরও একজন শিল্পী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের, যার গান অত জনপ্রিয় ছিল না, কিন্তু তার গায়কিটা খুব নতুন ছিল, পিন্টু ভট্টাচার্য।
জি।
রফিকুল আলম: তো গানটা রেকর্ডিং হওয়ার দুদিন পর আবার টেলিফোন আমার কাছে—তোমার গানটা শুনে আরডি সাহেব ভীষণ খুশি হয়েছেন। রিজিওনাল ডিরেক্টর, নাম ভুলে গেছি ভদ্রলোকের। হ্যাঁ, তখন রিজিওনাল ডিরেক্টর একটা বিরাট পোস্ট। আমার গান শুনে বলেছে যে এর থেকে আরও গান পাওয়া যায়। আজাদ রহমান সাহেবকে দিয়ে গান করানোর কথা হলো। রেডিওর গান যে এত তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হতে পারে, অনেকেই ভাবেনি। তারপর একটা গান করলাম, ওটা করল মীর কাসেম খান সাহেব। ওটা কেবল গাওয়া হয়েছে। তারপর স্টেডিয়ামে ’৭৪-এর জানুয়ারির দিকে হবে বোধ হয়। স্টেডিয়ামে বিরাট সংগীত সম্মেলন হয়েছিল। তখন বড় অনুষ্ঠানকে সংগীত সম্মেলন বলা হতো। ওখানে কোনো লাইট সং হবে না। ওখানে ভারত থেকে ফহিমুদ্দিন খান ডাগর সাহেব, যাঁরা বিখ্যাত বীণবাদক, তারপরে আলী হোসেন খান সাহেব সানাইয়ের, ওনারা এসেছিলেন। আর আধুনিক গানের শিল্পীরাও এসেছিলেন, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরও শিল্পীরা এসেছিলেন। আয়োজক ছিল ঢাকা কলেজ অব মিউজিক। উদ্যোক্তারা বললেন, একটা নতুন ধরনের গান তো দেওয়া দরকার, এই রফিককে দিয়ে গাওয়া হোক। কামাল লোহানী সাহেব এবং তৎকালীন আরও কারা কারা যেন বললেন যে স্টেডিয়ামে বাপরে! আমি তখন ভয় পেলাম যে স্টেডিয়ামে গান গাইব, আমাকে কেউ চেনে না, হয়তো মানুষ আমাকে উঠিয়েই দেবে। তো স্টেডিয়ামে গান গেয়েছিলাম, সেটাও মানুষ খুব পছন্দ করেছে। তারই একটা করোলারি এফেক্ট হলো, গানটা ছিল এ রকম। ওটাও একটু রাগপ্রধান গান, কিন্তু খুবই চমৎকার আধুনিক গান। এইচ মোহাম্মদ রফিক নামের রাজশাহীর আমাদের একজন সুরকার ছিলেন, রেজওয়ানুল হক নামের এক লেখক ছিলেন, তাঁরা সবাই প্রয়াত হয়েছেন।
একটু শোনালে বোঝা যাবে যে কী পরিবর্তনটা কীভাবে হলো।
(গান গাইছেন) স্বজনী গো...নিশি পোহালো...তবু না এলে...মালা গাঁথা মোর মিছে হলো...
অর্থাৎ রাগপ্রধান টাইপের গানই তখন বেশি হতো এবং স্বজনী কথাটা তখন কিন্তু গানে খুব ব্যবহৃত হতো। স্বজনী, রজনী—এই ধরনের। তো স্টেজে এ ধরনের গান গাইলাম। পাশেই এত বড় বড় শিল্পী—মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। আমার তো ভয়, আর মাহমুদুন্নবী ভাই। তারপর গাইলেন মাহমুদুন্নবী ভাই। এবং আমার প্রথা ভেঙে আমাকে আরেকটা গান গাইতে হলো। তো এই প্রসঙ্গটা কেন আনলাম? আমি যে ভালো গান গেয়েছি, এই রিপোর্ট শুনে তৎকালীন খুবই বিখ্যাত ব্যস্ত সংগীত পরিচালক সত্য সাহা বাংলা একাডেমিতে একদিন আমাকে লোক পাঠালেন যে উনি দেখা করতে বলেছেন। তো আমি অফিস থেকেই গেলাম, তখন আড়াইটা পর্যন্ত অফিস। খুব গম্ভীরভাবে বললেন, ‘তোমার জন্য তো একটা কাজ আছে, স্বপন তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’ স্বপন মানে ওনার বেহালাবাদক স্বপন সাহা, খুব বিখ্যাত। উনি যোগাযোগ করলেন। এখন যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ওখানে আমার একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। তখন অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যেত না। আমি আর আমার আরেক বন্ধু নূরুল আলম থাকতাম। ওখানে স্বপনদা এলেন। বললেন, ‘আপনাকে ফিল্মের একটা গান গাইতে হবে।’ কিন্তু ফিল্মের গান গাওয়া ছিল বিরাট ব্যাপার। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা না থাকলে ফিল্মে গান গাওয়ার কেউ সুযোগ পেত না। সবাই ভয় পেতেন কিংবা একটা প্রথাই ছিল যে তুমি আগে গাও, এস্টাবলিশ হও, তোমার জনপ্রিয়তা আসুক, তোমার ভেতরে কিছুটা অভিজ্ঞতা আসুক, তারপর তুমি ছায়াছবির গান গাইবে। কিন্তু এ রকম অল্প সময়ের মধ্যে আমার ডাক এল, আমি তো খুব ভয় পেলাম। গেলাম, গান একটা শেখালেন। তো গানটা গাইতে আমার কোনো অসুবিধা হলো না। আমার টাইপেই পড়ল। লাকী যে রকম গান করেছে, প্রায় ওই রকমই গান। কিন্তু সমস্যাটা হয়ে গেল, রাজ্জাক সাহেবের লিপসিং হবে। তখন রাজ্জাক সাহেব মানে একটা বিরাট পর্বতের মতো। তাঁকে সবাই দেখবার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
নিশ্চয়ই।
রফিকুল আলম: তিনি লিপসিং করবেন। আরও বিরাট সমস্যা হয়ে গেল, আমার জন্য অগ্নিপরীক্ষা হয়ে গেল যে ওখানে একটু অভিনয় করতে হবে। অভিনয়ে কী করতে হবে? রাজ্জাক সাহেব খুব একজন বিরহী নায়ক, তিনি মদ্যপান করেছেন, একটু এলোমেলোভাবে গান গাইছেন। অর্থাৎ গানের সুরটা ঠিক রেখে একটু অভিনয়ের মতো করে।
এটা ‘রংবাজ’ নাকি?
রফিকুল আলম: না না, ‘অতিথি’।
‘অতিথি’? আমি দেখেছি।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, ‘অতিথি’। খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল ছবিটা। তো ওখানে গান গাইতে গিয়ে—সত্যদার শ্যালক ছিলেন দিলীপ বিশ্বাস, তাঁকে বললাম, দাদা আমি গান তো গাইতে পারি, কিন্তু এইটা তো পারব না। বলছেন, ‘পারবা, পারবা, কোনো জায়গায় একটু সুর থেকে বেরিয়ে যাবা, তাহলেই হবে।’ তারপর দিলীপ বিশ্বাস বললেন, ‘আমি বুথে থাকব, তুমি পারবা, আমি দেখিয়ে দেব।’ তারপর গানটা এই রকম:
(গান গাইছেন) আমায় বন্ধু মাফ করে দাও, হয়ে গেছি আমি এলোমেলো...
এ ধরনের কাজ করতে হয় আরকি! সেটা আমার জন্য খুবই কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু তখনকার নতুন অভিজ্ঞতা—আলাদা রেকর্ডিং বুথ, কানে হেডফোন দিয়ে গান গাইতে হবে, প্রায় দেখাই যায় না এ রকম দূরত্বে মিউজিশিয়ানরা বসে আছে। তখন প্রজেকশন হলে এফডিসিতে রেকর্ডিং হতো। তা হলো। এই গান হওয়ার ফলে এফডিসি পাড়াতে—তখন এটা ছোট ছিল এবং জিনিসগুলো খুব ইন্টারেক্টিভ ছিল; কোনো খারাপ গান হলেও যেমন আলোচনা হতো, ভালো গান হলেও সে রকম আলোচনা হতো—সেখানে খুব আলোচনা হচ্ছে। সুবল দত্ত খুব নামকরা ভায়োলিনিস্ট ছিলেন। পরের দিন রেডিওতে এসে বললেন, ‘আরে খুবই ভালো গান হয়েছে তোর, খুবই ভালো।’ আমার মনে আছে, মাহমুদুন্নবী ছিলেন তখন বিশাল জনপ্রিয় শিল্পী, ফিল্মের। আমি গেট দিয়ে ঢুকছি কী কারণে যেন, তিনি দূর থেকে, ‘এই রফিকুল!’ এসে জড়িয়ে ধরে বললেন, রাজশাহীর ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলার চেষ্টা করল, ‘তুই তো ফাটিয়ে দিয়েছিস।’ এ রকম বলার চেষ্টা করল। তারপর একটু গেয়েও দিল, ‘তোমার গানটা শুনলাম এফডিসিতে।’
একটু যদি আজ নেশায়...
রফিকুল আলম: হ্যাঁ একটু যদি আজ নেশায়, খুবই ভালো। তার মানেই বুঝলাম যে তখন আমি অ্যাকসেপ্টেবল হয়ে গেছি ফিল্ম জগতে। এই আরকি! এভাবে ফিল্মে আসা।
টেলিভিশনেরটা তাহলে আলাদা তাৎপর্যপূর্ণ কিছু না?
রফিকুল আলম: না না, অবশ্য এইখানে ফিল্মের ক্ষেত্রে আরেকটা পরীক্ষা আমাকে দিতে হলো। তখন রাজ্জাক ভাইয়ের একটা রেওয়াজ ছিল ওর লিপসিংয়ের কোনো গান হলে সেটে চলে যেতেন। এবং আমি যখন রিহার্সালের মাঝখানে, তখন দেখি সে তার দলবল নিয়ে প্রজেকশন রুমে ঢুকেছেন। ওখানে আমার আরও অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। তারপর এসে বললেন, যে এই তোমার বাড়ি কোথায় ভাই? …তখন তো আমার স্বাস্থ্য-টাস্থ্য খুবই খারাপ। হ্যাঁ খুব...
‘অতিথি’তে মনে হয় কবরী ছিলেন।
রফিকুল আলম: না, বোধ হয়।
ও পাখি তোর যন্ত্রণা...
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, কবরী ছিলেন, কবরী ছিলেন। তো তাতে আমার খুব অসুবিধা হলো যে এই লোকটা এখানে এল এবং একটা মনিটর টেক শুনল। মনিটর টেক শুনে বলল যে গাও শুনি, হ্যাঁ হ্যাঁ ভালো হবে, ভালো হবে, ভালো হবে। সে খুব উৎসাহ দিল। তো সেটাও একটা বেশ আমার জন্য অবস্ট্রাকশন তৈরি হয়েছিল। কনফিডেন্সটা আনতে আমার দেরি হয়েছিল। এই। আর টেলিভিশনে হলো কি? টেলিভিশনেও একই অবস্থা। তখন অডিশন লাগে। তো শফিকুর রহমান নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন, পরবর্তীকালে তিনি চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলেন। টেলিভিশনের ঊর্ধ্বতন প্রযোজক ছিলেন। উনি আমার এই স্টেডিয়ামের গান শুনে বললেন যে আমার একটা নতুন প্রোগ্রাম করছি, আপনাকে গাইতে হবে। তো সেটা গাইতে গিয়ে ওই গানটাই করতে রিকোয়েস্ট করলেন যে স্টেডিয়ামে যে গানটা করেছিলেন, ওইটাই করুন। ওটা করলাম, খুবই ভালো হলো। ওটা লাইভ প্রোগ্রাম। তখন তো জীবনে কখনো ক্যামেরা ফেস করিনি। করলাম, তাতে ওরা খুব খুশি। মোস্তাফিজুর রহমান সাহেব যে কদিন আগে যিনি মারা গেলেন, তিনি মিউজিকের হেড ছিলেন। উনি এনলিস্টমেন্ট করে নিলেন যে না ঠিক আছে, তোমার অডিশন লাগবে না, এটা হয়ে গেছে। … রেডিও, টেলিভিশন এরা খুব দেখতেন যে কে প্রসপেক্টিভ একটা ছেলে, তাকে আনো। এটা খুব ভালো ছিল।
আপনার বিয়ে হলো কত সালে, কীভাবে হলো? আবিদা সুলতানাকে দেখলেন কোথায়, প্রস্তাব করলেন কীভাবে?
রফিকুল আলম: ওটা একটা ইন্টারেস্টিং। ওই যে বলছিলাম যে ওর সঙ্গে গানের মাধ্যমে পরিচয়। তবে ঘনিষ্ঠতা হলো ওই যে আমি স্টেডিয়ামে যে গান করলাম, ওখানে লাকী পরিচয় করিয়ে দিল। দু-তিনটা মেয়ে এল, পরিচয় করিয়ে দিল যে রফিক ওর নাম আবিদা, আর খুরশীদা নামে একটা মেয়ে ছিল। বলল যে এরা এরা ভালো গান গায়। আর আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল রফিকুল আলম, রাজশাহী থেকে এসেছে। আমরা একসঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছিলাম। এইভাবে পরিচয় হলো। এটা হলো পরিচয়। তারপরে সম্ভবত ওই বছরের শেষ দিকে পয়লা বৈশাখ, তখন তো ঋতুভিত্তিক খুব অনুষ্ঠান হতো রেডিওতে, টেলিভিশনেও। পয়লা বৈশাখ নিয়ে তখন আমরা স্কেচ প্রোগ্রাম বলতাম। ওখানে মীর কাসেম খান সাহেব আমাকে বললেন যে তোমাকে গান গাইতে হবে। দুটো গান, একটা সলো, আরেকটা ডুয়েট। ডুয়েট তো আমি চিন্তা করছি নতুন মেয়ে সাবিনাও আছেন, কিন্তু তোমাকে নতুন মেয়ের সঙ্গে গান গাওয়াব। মীর কাসেম ভাই খুব আমাকে পছন্দ করতেন। ওই ‘তোমাকে যেন ভুলে না যাই’-এর রেকর্ডিংয়ের সময় ছিলেন উনি। কোনো কারণে ছিলেন। সে কারণে তিনি পছন্দ করতেন। তো গাইতে হবে। সলো গানটা এখন আর মনে নেই। ডুয়েট গানটা মনে আছে। ডুয়েট গানটা হবে আবিদার সঙ্গে। এবং তখন ওই...
আমরা একটু গানটা শুনব তো?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয় করছি। পরিচয়টা, ঘনিষ্ঠতা ওইখানে এল যে একটা ছোট বুথে বসে দুজনে রিহার্সাল করছি। তারপর ও বলল যে হ্যাঁ, আপনার গান শুনেছি এ রকম। আমার মা–ও আপনার গান শুনেছে, বেশ পছন্দ করে। আপনার ওই গানটা রেডিওতে তখন খুব বাজত, খুব ব্রডকাস্ট হতো ‘তোমাকে যেন ভুলে না যাই’। আর যে ডুয়েট গানটা করলাম, সেটাও খুব মিলে গিয়েছিল। রফিকুজ্জামান সাহেবের লেখা আর মীর কাসেম খান ভাই সুর করেছিলেন।
(গান গাইছেন) দূরের আকাশ রূপবতী নদী, সবুজ কোমল বন, তোমাদের বুকে ছড়িয়ে দিলাম প্রাণের সম্ভাষণ... দূরের আকাশ রূপবতী নদী...
এই ধরনের। দুজনের একটা লাইন ছেড়ে দিয়ে ও ধরবে, আমি ধরব, তারপর একসঙ্গে মিলতে হবে। এইভাবে রিহার্সাল হতে দেখে তার সঙ্গে পরিচয়টা হলো। তারপর আমাদের মধ্যে কখন যে দুজনে দুজনকে পছন্দ করে ফেলেছি, সেটা বুঝতে পারতাম না।
তাহলে কত দিন পরে বিয়ে হলো?
রফিকুল আলম: ’৭৮–এ। বেশ কিছুদিন পরে।
বেশ কিছুদিন পরে?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, বেশ কিছুদিন পর।
তো ভালোই ঘোরাফেরা করেছেন? কোথায় কোথায় চায়নিজ খেয়েছেন?
রফিকুল আলম: তখন তো এই সুযোগগুলো থাকত না। তবে হ্যাঁ...
একবার বিকেলবেলায় তখন আমাদের বুড়িগঙ্গা নদীতে খুব ছোট ছোট ছইওয়ালা নৌকা চলত। ওখানে আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব প্রেম করতে যেত। আমি একদিন বললাম যে চলো যাই, ওখানে ঘোরাফেরা করি। সঙ্গে ওর আরেক বোন এবং তাকে নিয়ে নৌকাতে উঠলাম। ঘুরছি ঘুরছি, দুজনে কথাবার্তা বলছি। ইন দ্য মিনটাইম হঠাৎ দেখি একটা ছইওয়ালা নৌকা এসে আমাদের থামিয়ে দিল, পুলিশের লোক। তোমরা অবৈধভাবে ঘোরাফেরা করছ, কোথায় যাচ্ছ, কী হচ্ছে? তখন আমার পরিচয়টা দিতেই হলো। তখন অত জনপ্রিয় না, তা–ও বললাম যে আমরা দুজন...না এটা তো আপনাদের ঠিক হবে না, আপনাদেরকে থানায় যেতে হবে। আমি বললাম যে কেন, থানায় যেতে হবে কেন? যে না, আপনারা অবৈধভাবে ঘোরাফেরা করছেন। যাহোক আরেকটা মাঝি এসে বলল যে না স্যার, ওনার আরেক ভাই… ওনারা ঘোরাফেরা করছে, ওনারা একসঙ্গে এসেছে। এরা তো ওই রকম লোক নন। বেশ মনে আছে মাঝিটা। তারপর সব ছেড়ে দিল। আমরা সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলাম। আর এরপরে কক্সবাজারে গেলাম। আবিদার এক মামা ছিলেন ভদ্রলোক, ভুলে যাচ্ছি নাম, উনি খুব উৎসাহী ছিলেন আমার ব্যাপারে। আমার গান খুব পছন্দ করতেন। তো বলল, চলো আমরা কক্সবাজার যাই। তখন কক্সবাজার যাওয়া খুব কঠিন বিষয় ছিল। বেশ বড়লোক মানুষ ছিলেন, ওনার দুটো গাড়ি। গাড়িতে করে অল দ্য ওয়ে আমরা এখান থেকে কক্সবাজার গেলাম। যেতেই প্রায় সারা দিন লেগে গেল। তখন কক্সবাজারে চা খাওয়ার দোকানও দু-চারটা এ রকম। ন্যাচারাল বিচ। বিচ একেবারে রুপালি বিচ। সেখানে ছোট ছোট লতার মতো কিছু গাছ আর কিছু নতুন ঝাউগাছ এখন যেগুলো দেখা যায়, ওগুলো তখন হাইট চার-পাঁচ ফুট হয়েছে। তখন এত ভালো হোটেল ছিল না। কিন্তু তখনকারই পর্যটন ডিপার্টমেন্ট তটিনী নামে কতগুলো ছোট টিনশেডের ইনডিপেনডেন্ট হাউস...
আমি কল্পনা করতে পারি, কারণ এটা আপনি বলছেন ’৭৮ সালের আগের কথা?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
আর আমি গিয়েছি প্রথম ’৯৩ সালে। গিয়ে দেখি যে তখনই কিছু নেই।
রফিকুল আলম: না।
প্রবাল, উপাল, শৈবাল এই তিনটা তো হয়েছে।
রফিকুল আলম: ওটা কেবল হয়েছে। তখন ওটা...
তার মানে আপনার সময়ে কিছুই ছিল না?
রফিকুল আলম: না, ওই সময় ওই যে প্রবালের কথা বলছেন, ওটা কনস্ট্রাকশন হচ্ছে। আর আমি যেটা বলছি টিনের বাড়ি অর্থাৎ চৌচালা করে বাড়ি করে দেওয়া ইনডিপেনডেন্ট হাউস। ওখানে রান্নাটান্না করা যেত। চমৎকার তখন লোকজনও খুব ভালো ছিল। ওখানে আমরা ছিলাম তিন–চারটা ফ্যামিলি। ওখানে খুব ঘনিষ্ঠতা হলো এবং ভার্চ্যুয়ালি ওখানেই ওর মামা একটা প্রস্তাবের মতো বলল যে অনেক ঘোরাফেরা করলা, এবার তোমরা বিয়ে করে ফেলো।
আপনাদের বিয়েটায় কে কে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত লোকজন?
রফিকুল আলম: সমস্ত লোক। আমাদের মিউজিকের সমস্ত মানুষ। এবং ইন্টারেস্টিং, ওর সঙ্গে এক পয়লা বৈশাখে যে গান গাইলাম আর পরের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় পয়লা বৈশাখে আমার বিয়ে হলো। এবং এই ঢাকা ক্লাবের অফিসার্স ক্লাব তখন এত বিল্ডিং-টিল্ডিং ছিল না। ওখানে বিয়ে হয়। বউভাতটা হয় এখন যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বললাম যে আমার একটা ফ্ল্যাট ছিল, ওখানে একটা টেরেস ছিল। ওইখানে...
শামিয়ানা টাঙিয়ে?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ হ্যাঁ, শামিয়ানা টাঙিয়ে। ওখানে বেশ সমস্যাই হয়েছিল। বড় বড় সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী আপা থেকে শুরু করে জব্বার ভাই, আব্দুল হাদী ভাই, সমরদা, রাজা হোসেন খান, মীর কাসেম খান সাহেব সমস্ত মানুষ এসেছে। কিন্তু এত চমৎকার তখনকার দিনে যোগাযোগ শুধু রেডিওতেই হতো কিংবা টেলিভিশনের ক্যানটিনে হতো। কিন্তু আমার ওই বিয়েতে সবাই এসে গল্পে মশগুল হয়ে গেছে, কেউ আর যায় না। খাওয়া-দাওয়ার পরেও কেউ যায় না। মনে আছে এবং অনেকক্ষণ ধরে আড্ডা হয়েছিল এবং খাওয়া-দাওয়া হয়েছিল। ওই জায়গাটা এখনো আছে। ওই জায়গাটাতে বিল্ডিং হয়েছে, এখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যেটা বিল্ডিং, ওটা ওইখানে।
আপনার গান তো অনেকগুলো খুবই জনপ্রিয়, আমার খুবই প্রিয়। গানগুলো ‘কখনো আমার মাকে’...
রফিকুল আলম: ও ওরে বাবারে বাবা! ‘কখনো আমার মাকে’ গানের প্রসঙ্গটা আনায় আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এই গানটা সম্পর্কে আমার বলার সুযোগ হয় না। ‘কখনো আমার মাকে’ কবি শামসুর রাহমানের কবিতা, বিখ্যাত কবিতা ‘কখনো আমার মাকে’। এই কবিতাটা, সত্যদা বলল যে আমার টেলিভিশনে একটা অনুষ্ঠান হবে কবিতার গান। তোমাকে দিয়েই আমি গানটা করব। সে দীর্ঘ গান, প্রায় পাঁচ-ছয় মিনিটের গান। এত কর্ড চেঞ্জ আছে গানটাতে, আমি একটু করব আপনাকে শোনানোর জন্য। এই গানটা আমাকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এত সফলভাবে গানটা তখন অবশ্য রেকর্ডিং ফ্যাসিলিটি এসে গেছে।
কারণ, আমরা এটা রেডিওতে অনেক শুনেছি।
রফিকুল আলম: না, টেলিভিশনেও তখন ভিটিআর প্রযুক্তিটা এসে গেছে। অর্থাৎ দু–একটা ১০-১২টা টেপে রাখা যায় এ রকম। তো এক হলো ‘কখনো আমার মাকে’। আরেকটা গান গাইতে হলো সম্ভবত নির্মলেন্দু গুণের হবে, ‘আমরা হয়তো মানুষ নই’ এ রকম একটা।
‘আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্য রকম, হাত থাকবে, পা থাকবে’।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, ওটাও একটা গান হয়েছে। ওই গানটা অত ভালো হয়নি। ওটা আমার সুরটা মনেও নেই। ‘আমরা হয়তো মানুষ নই মানুষ হলে...’ এ রকম একটা ছিল। কিন্তু ‘কখনো আমার মাকে’ এত ওই যে একধরনের পশ্চিমা দেশে কতগুলো গান আছে, যে গানগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো তুমি এক জায়গায় সুর শুরু করবে, এক স্কেলে শুরু করবে, বিভিন্ন অক্টেভ চেঞ্জ করে অন্য স্কেলে গিয়ে শেষ হয়ে যাবে। এটার ইংরেজি পাশ্চাত্য সংগীতে একটা কী নাম আছে, এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না আমার। তো এই গানটা এ রকম ছিল, একটু করি।
(গান গাইছেন) কখনো আমার মাকে কোন গান গাইতে শুনিনি, সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কিনা মনে পড়ে না আজ, মনে পড়ে না আজ... যখন শরীরে তার বসন্ত সম্ভার আসেনি...
এভাবে চলছিল গানটা। অসাধারণ একটা কবিতা। পড়তেই তো ভালো লাগে। … সত্যি সত্যি আমার খুব গর্বের বিষয় এই গানটা। যদিও গানটা সাধারণ মানুষের কাছে...
না, আমি ধরেন ’৭১ সালে ওয়ানে পড়ি। কাজেই ’৭৮ সালে এইটে পড়ি, ৯, ১০, ১১, ১২ এইসব সময়ে তখন তো রেডিওই ছিল।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ হ্যাঁ।
এই দুপুরবেলা গানের ডালি অনুষ্ঠান, অনুরোধের আসর, সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে দুর্বার অনুষ্ঠান। আপনাদের গান বাজছে। এই গানগুলো... ‘বৈশাখী মেঘের কাছে’ও আপনার?
রফিকুল আলম: ‘বৈশাখী মেঘের কাছে’ একটু পরে। একটু পরে।
কিন্তু ওটা আপনারই তো?
রফিকুল আলম: আমারই হ্যাঁ, আমারই গান। একটু পরে হলো। ওটা হলো কি আমার ‘বৈশাখী মেঘের কাছে’ গানটা তো খুবই মৌলিক একটা সুরের গান, একটা রাগের ওপর গান। এই আমি বলতে ভুলে গেছি একটা কথা। তাহলে আমার কিন্তু গানের হাতেখড়ি আরেকজনের কাছে। আমি বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। হাতেখড়ি কীভাবে প্র্যাকটিস করতে হয় হারমোনিয়ামযোগে, তানপুরাযোগে। সেটা অনুপ ভট্টাচার্য। আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন। খুবই চমৎকার একজন গায়ক ছিলেন, চমৎকার গান কম্পোজিশন করতেন। তো উনি আমার জন্য একটা গান করেছিলেন, এই গানটা।
(গান গাইছেন) বৈশাখী মেঘের কাছে জল চেয়ে তুমি কাঁদবে আমি চাই না, তুমি কাঁদবে আমি চাই না...শুধু স্বপ্নকে সত্যি মনে করে তুমি কাঁদবে আমি চাই না, তুমি কাঁদবে আমি চাই না...
এটা অনুপদা সুর করলেন। লিখেছিলেন আবুল হায়াত মোহাম্মদ কামাল, যিনি আমাদের ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল সাহেবের ছোট ভাই ছিলেন। যিনি খুব নামকরা কবি ছিলেন। কিন্তু যেহেতু রেডিওতে চাকরি করতেন আর খুব টিমিড টাইপের মানুষ ছিলেন, খুব ইন্ট্রোভার্ট টাইপের মানুষ ছিলেন, ওর লেখা এই গান।
অসাধারণ গান।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ। পরবর্তীকালে আবার গানটা জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর দিলীপ সোম নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন, ছবি করলেন একটা ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’। বলল যে তোমার এই গানটা আমি গানে ব্যবহার করব, আবার গাইতে হবে।
ছবিতে?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, ছবিতে গাইলাম। তো তখন অনুমতি খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। শুধু আমি রেডিওকে জানিয়ে রাখলাম যে এটা রেডিও...এগুলো রেডিওর কোনো কপিরাইটের তেমন কোনো স্ট্রিক্ট (নিয়ম) নেই, তো গাইতে পারো। গেয়েছিলাম। এই হলো আমার তারপর ওই যে আমার তখন ইতিমধ্যে কিন্তু আমার ছায়াছবিতে অনেক গান গাওয়া হয়ে গেছে। ওই যে ‘অতিথি’তে গান গাওয়ার পর। কিন্তু এই ‘বৈশাখী মেঘের কাছে’ আরও বছর পাঁচেক পর গাওয়া। সেটা একটা সুযোগ কেন হলো? ওটা …শহীদুল ইসলাম সাহেব নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন রেডিওর, উনি পরবর্তীকালে ডিডিজি হয়ে মারা গেছেন।
ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস বলে একটা জিনিস হলো, যেটা খুবই চমৎকার অর্থাৎ ওটাই ছিল রিয়েল আর্কাইভ। ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস কনসেপ্টটা আর্কাইভেরই কনসেপ্ট যে যত গান হবে শুধু গান, নাটক নয়, শুধু গান ওখানে রাখা হবে। তো ওই ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসেই এই গানটা রেকর্ডিং করা হয়েছিল। তখন স্পেশাল প্রজেক্ট ওয়াইজ গান করা হতো। এক একজন শিল্পীর চার-পাঁচটা গান করে রেখে দেওয়া হতো আর বিভিন্ন রেডিও স্টেশনে সেগুলো সাপ্লাই দেওয়া হতো প্রচারের জন্য। ফলে ইতিমধ্যে ওই যে আমার আরও একটা গান আছে, ওটাও ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসেরই গান। তখন এই বিরাট সংগীত পরিচালক, তখন তিনি সংগীত পরিচালক হননি, খুবই নামকরা মিউজিশিয়ান আলাউদ্দিন আলী। তখন তিনি ফুলফেজেড মিউজিক ডিরেক্টর হননি। দু–একটা গান করছেন। একটা দেশাত্মবোধক গানের কম্পিটিশনে গান করে তিনি জাতীয় পুরস্কারও পেয়ে গেছেন। কিন্তু তখনো তিনি ছায়াছবি কিংবা রেডিওতে মিউজিক ডিরেক্টর হননি। খুব ভালো যন্ত্রশিল্পী। পরবর্তীকালে তো আলাউদ্দিন আলী বিখ্যাত সংগীত পরিচালক এবং সংগীতজ্ঞ হয়ে উঠলেন। তো ওর সুরে আব্দুল হাই আল হাদী নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন, যিনি অনেক ভালো ভালো গান লিখেছেন। ওর লেখা এই ‘এক হৃদয়হীনা’ গানটা করা হলো ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে। ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে এ ধরনের কাজগুলো হতো, ক্রিয়েটিভ কাজগুলো করা হতো। বিশেষভাবে গান করার জন্য নয়, বিশেষভাবে লিখে আর্কাইভে রেখে দেওয়ার জন্য করা হলো। এটাও ওই একই গান, ‘এক হৃদয়হীনা’।
‘এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে’ এটাও একটু আমরা একটু দুই লাইন শুনি না?
রফিকুল আলম: আচ্ছা আচ্ছা, করছি।
(গান গাইছেন) এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে, সে আছে নিজেকে নিয়ে, আমি তো আপন দোষেই পেলাম শুধু অথই যন্ত্রণা...এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে...
এখানে আমি দুটো তথ্য দেব এই গানটা নিয়ে। তথ্যটা দেওয়া খুব দরকার। এই প্রথম দুটো লাইন কিন্তু আলাউদ্দিন আলীর লেখা। ‘এক হৃদয়ের দাম...’ তারপরে আব্দুল হাই আল হাদীকে দিয়ে লেখা হলো। আর আরেকটা জিনিস হলো গানটা যখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেল, খুবই জনপ্রিয় হলো, তখন জাফর ইকবাল আমাদের নায়ক জাফর ইকবাল তখন তার জীবনে একটা খুব ডিজাস্টার হলো পারিবারিক জীবনে। সে খুব ইমোশনাল ছেলে ছিল। এই গান তার এত ভালো লেগেছিল এবং ‘হাজার মনের কাছে’ সুবীর নন্দীর গাওয়া গান তার এত পছন্দ ছিল যে তখন ক্যাসেট কেবল চালু হয়েছে, ও একটা ক্যাসেটে পুরো এক দিকটা ‘এক হৃদয়হীনা’র কাছে, উল্টো দিকটা ‘হাজার মনের কাছে’। পুরোটা ঘুরে ঘুরে সে চালিয়ে দিয়ে সারা রাত কান্নাকাটি করত আর এই গান শুনত। এবং আমাকে অনেক দিন অন্ততপক্ষে পাঁচ-ছয়বার রাত একটা-দেড়টার দিকে টেলিফোন রিসিভ করতে হয়েছে। কাঁদছে আর ওই গানটা শোনাচ্ছে। কয়, কেন ওস্তাদ এই গান কেন গাইলেন? তারপরে অল দ্য ওয়ে যে সমস্যাটা আমার করে দিল, বলে যে ‘আমি বুঝি কম!’ এই গানটায় আমি লিপসিং দেব, আপনার গাওয়াটাই। আমি তো গাইতে পারব, কিন্তু গাইব না। … আপনার গাওয়াটাই… আমরা ফিল্মে যেভাবে লিপসিং করি...
টেলিভিশনে?
রফিকুল আলম: টেলিভিশনে, টেলিভিশনে একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ও...
এ নিয়ে আমরা পরে ববিতা আপার সাথে হাসাহাসি করেছি। ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী’, এটা কি আপনাকে নিয়ে গাইছে নাকি? তো ববিতা আপা হাসে, কিছু বলেন না।
রফিকুল আলম: তো গেয়ে দিল, তাতে হলো কি, পত্রিকায় পরবর্তীকালে বলল যে জাফর ইকবাল আরেকটা গান গেয়েছেন ‘এক হৃদয়হীনা’র কাছে। ফলে আমার গানটা প্রায় হারিয়ে যাওয়ার মতো। তখন বহুবার আমাকে পত্রিকার মাধ্যমে বলতে হয়েছে যে বাবা এটা উনি গাননি। উনি খুব সুগায়ক, কিন্তু উনি গাননি, আমার গানটার ওপরেই তিনি ঠোঁট মিলিয়েছিলেন। এই আরকি!
আসলে বাংলার গানের ভান্ডারে অমর কতগুলো গান আপনি দিয়ে গেলেন। রফিকুল আলম ভাই, আমাদের আগের প্রজন্ম, সবাই আপনার কাছে ঋণী। কারণ, আমাদের সংগীতের কান তৃপ্ত হয়েছে অথবা বারবার শুনতে চেয়েছে আপনার গান।
রফিকুল আলম: এটা বোধ হয় ঈশ্বরের কিছু বিষয় থাকে তো! জাগতিক ছাড়াও কিছু বিষয় থাকে। তারপরও আমি মনে করি যে আমার পারিবারিক পরিবারের প্রভাব আর আমি কিন্তু অনেক বড় বড় সংগীতজ্ঞের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছি। যেমন ধরুন সগীরউদ্দীন খাঁ সাহেব বিখ্যাত পণ্ডিত ভারতের। সগীরউদ্দীন খাঁ সাহেব বিখ্যাত সারেঙ্গী বাদক ছিলেন। ওনার মতো সারেঙ্গী প্লেয়ার ভারতে জন্মগ্রহণ করেনি, এখনো না, আগেও না। তো উনি সারেঙ্গী বাজানো ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বহু অসংখ্য ভালো ভালো ছাত্র তৈরি করেছেন এবং খুবই ভালো প্রশিক্ষক ছিলেন। শাস্ত্রীয় সংগীত কীভাবে ভেঙে ভেঙে চর্চা করতে হয়, এই সুযোগটা আমি পেয়েছিলাম ওনার কাছে শিখতে। আমি আর সুবীর নন্দী, নাশিদ কামাল—ওনার কাছে শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
আর আপনার বাংলা একাডেমির চাকরির পরে আর তো চাকরি করেছেন?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, বাংলা একাডেমির পরে হয়ে গেল কি, তখন এই সমাজ আমাদের সামাজিক অবস্থাটা সত্যি খুব চমৎকার ছিল। আমি বাংলা একাডেমিতে চাকরি করছি ৯–১০ বছরের মতো। রিসার্চ বিভাগ থেকে অনুবাদ বিভাগ, অনুবাদ বিভাগ থেকে সংস্কৃতি বিভাগ এভাবে গেলাম। গবেষণাতেও গেলাম। তখন জুট মিলস করপোরেশনে মোর্শেদ সাহেব নামে এক বিখ্যাত সিএসপি অফিসার ছিলেন। উনি খুব গানবাজনাপ্রিয় লোক ছিলেন। তো উনি একটা প্রজেক্ট নিলেন যে আমার এটা জুট তো তখন সাংঘাতিক ব্যাপার সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ থেকে জুট এক্সপোর্ট হচ্ছে। তো বলল যে আমি এই জুট নিয়ে এই শিল্পীদের নিয়ে আমি একটা প্রজেক্ট নেব। ওরা চাকরি করবে, মূল ধারায় চাকরি করবে; কিন্তু ওদেরকে আমরা এক্সপোজার দেব। এই যে পেইন্টিং, ভালো পেইন্টার, ভালো সিঙ্গার, ভালো অভিনেতা–অভিনেত্রী এদেরকে চাকরি দিয়ে আনব যারা শিক্ষিত। উনি বললেন যে বাংলা একাডেমিতে তো অনেক দিন চাকরি করলা, এবার দেখো এখানে একটা বিদেশ-টিদেশ আমরা পাঠাব। তো উনি একই অবস্থা আমাকে অ্যাপ্লাই করতে হলো না। উনি ডিজিকে একটা চিঠি লিখলেন। সেখানে গিয়ে এমন একটা ডিপার্টমেন্টে পড়লাম, যেখানে একই অবস্থা, লেখাপড়া, প্ল্যানিং। তারপরে বিজেএমসিতে গিয়ে আমি বললাম দুই বছর দুই চাকরি করার পর দেখলাম যে এটা অন্যায় হচ্ছে। যে যে কাজ আমার করার কথা, সেটা আমি যদি না করি বেতন নিয়ে যাব, প্রমোশন নিয়ে যাব, এটা আমার কাছে খুব… আমি একটা শিক্ষা-দীক্ষা পাওয়া মানুষ।…কাদেরী কিবরিয়াও তখন জয়েন করেছে ওখানে, ওই একই প্রজেক্টে। আমরা যে এটা মনে হয় ভালো হচ্ছে না। তখন আরও একটা বড় সুযোগ করে দিলেন সিরাজউদ্দিন সাহেব নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন, বিসিকের চেয়ারম্যান। উনি বললেন এটা তো হাইলি কমার্শিয়াল অর্গানাইজেশন, তুমি বিসিকে চলে আসো। বিসিকে ওখানে ডিজাইন সেন্টার আছে, ওখানে তোমাকে আমরা কাজেও লাগাতে পারব। তো আমি বিসিকে চলে এসেছিলাম।
তাহলে কামরুল হাসানের সঙ্গে…
রফিকুল আলম: কামরুল ভাই তখন আমি জয়েন করার মাস ছয়েক আগে উনি চলে গেছেন। কামরুল ভাই ছেড়ে গেছেন। পেলাম এমদাদ ভাইকে। তারপরে ওখানে আমার খুব ভালো সুযোগ হলো। তারপর বিসিক থেকেই একটা পোস্ট–গ্র্যাজুয়েশন করার সুযোগ এসে গেল হল্যান্ডের ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটিতে। সিরাজউদ্দিন সাহেব খুব খুশি। যাও যাও যাও। উনি আবার শিক্ষিত শিল্পীদের ভীষণ প্রমোট করতেন। যাও এটা ভালো। তারপর আমি হল্যান্ডে চলে গেলাম এক বছরের কোর্স করে। ওখানেও আমার বেশ ভালো সুনাম হলো। আমি ডিসটিংশন পেয়ে গেলাম। ওটাতে তো ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড ক্লাস বলা হতো না, ডিসটিংশন বলা হতো। ডিসটিংশন পেয়ে আমি চলে এলাম। আবার বিসিকে জয়েন করলাম। এবং বিসিকে তখন খুব রিল্যাক্সড ওয়েতে কাজ করছি আমি। আমাকে সবাই আদর–যত্ন করে, গানবাজনার জন্য যখন ইচ্ছা চলে যেতে বলে। তারপরেও আমি প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্টে আবার ফিরে এলাম। আমি কাজ করতাম এবং গান চলত এইভাবে। এই হলো।
তো আবিদা সুলতানা আপাও তো অনেক বিখ্যাত। সে যে ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’...
রফিকুল আলম: ও কী অসাধারণ গান!
তাই না? তখন আপনাদের মধ্যে শিল্পীর ঈর্ষা হয়নি যে ও বেশি জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে? এখন দুজনই তো আবার অত্যন্ত সুদর্শন। আপনিও খুব সুদর্শন, আবিদা আপাও সুদর্শন। এ তো ঢাকা শহরে একসঙ্গে চলতে গেলে তো মানে চাঁদের হাট একদম।
রফিকুল আলম: এ কথা ঠিক। আমরা যখন যেতাম, বের হতাম, তখন মানুষজন সত্যি সত্যি খুব আমাদের দিকে তাকাত। এখনো তাকায়। এই তো এখানে ঢুকতে গিয়ে দুজন লোক দাঁড়িয়ে গেল, কোথায় দেখা হয়েছে, এটা বিশাল পাওনা আমাদের। এই নিচেই কোথায় তার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কোথায় আমাকে চা এনে দিয়েছিল, সেসব গল্প করল। তখন তো আমাদের বেরোনোর জায়গা ছিল নিউমার্কেট। নিউমার্কেটে আমরা দুজনে যখন যেতাম, তখন চতুর্দিক কানাকানি যে এঁরা আসছে, এ রকম আরকি!
আপনারা দুজনেই জনপ্রিয়, আপনাদের ভেতরে কোনো পারসোনালিটি ক্ল্যাশ হয় না?
রফিকুল আলম: আমি এটাকে খুব পজিটিভলি দেখি। আমি মন থেকেই উত্তরটা দিই, একটা যুক্তিসংগত উত্তর দিই—দেখুন, ও আমার থেকে অনেক বেশি জনপ্রিয়, তাতে আমার একটা অ্যাডভান্টেজ হয়েছে। অ্যাডভান্টেজটা কোথায়? ওর একটা গুণ আছে, আমার কোনো গানের ডিফেক্ট হলে সে কিন্তু চুপ করে থাকে না। বলে, ‘না, এ তো বেশি হয়ে গেল, ভালো হলো না তো, এক্সপ্রেশনটা ভালো হলো না।’ ওর কিন্তু বিরাট ভূমিকা আছে আমার উচ্চারণ ঠিক করার ব্যাপারে। আমার উচ্চারণ তখন রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাবে একটু কাভার্ড ছিল। রবীন্দ্রসংগীতে একটা ব্যাপার ছিল না—একটু কাভার্ড উচ্চারণ করা, সেটা কিন্তু ভেঙেছে আবিদাই, ‘না, তুমি একটু খোলা গান করো। এটা কেমন ধরনের কথা, তোমার গানের অর্ধেক কথা বোঝা যায় না। তোমার বাংলা উচ্চারণ তো ভালো, কিন্তু গানের সময় এ রকম কাভার্ড হয়ে গোল হয়ে যায় কেন?’ তো এই সমালোচনা যদি বাড়িতেই আমি পাই, তাহলে আমার বিরাট সুযোগ নয়? এইটা আমার কিন্তু হয়েছে। এবং এ কথা ঠিক যে সে আমার থেকে অনেক বেশি জনপ্রিয়...
আমার মনে হয় না। কারণ, আমার কাছে আপনারা দুজনেই সমান জনপ্রিয়।
রফিকুল আলম: একটা অ্যাডভান্টেজ আছে আনিস ভাই, একটা অ্যাডভান্টেজ আছে নারীকুলের—আমি যদি একই কোয়ালিটির মানুষ হই, কিন্তু আমার স্ত্রী যদি একই কোয়ালিটি নিয়ে, আপনি যেটা বললেন, তার সৌন্দর্য ও তার জনপ্রিয়তা যদি বেড়ে যায়, তাতে মেয়েদের পপুলারিটির একটা অ্যাডভান্টেজ আছে কিন্তু। বলা হয় যে ফেয়ার সেক্সের পপুলারিটি বেশি। এটা আমাকে মেনে নিতে হয়েছে শুধু নয়, আমি মেনে নিয়েছি। তার কোয়ালিটি যেহেতু তার কাছে, আর সে তো নারী। নারী হিসেবে তার জনপ্রিয়তা বেশি হতেই পারে আমার থেকে।
না, পুরুষেরও তো অনেক সুবিধা আছে। আপনারও নিশ্চয় অনেক ভক্ত আছে। আচ্ছা, আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন?
রফিকুল আলম: আমার একটিই ছেলে। আমার কোনো মেয়ে নেই। সে–ও খুব সুগায়ক এখন। ওরা আমাদের...
পুরো নাম কী?
রফিকুল আলম: ফারশিদ আলম।
কী ধরনের গান করেন উনি?
রফিকুল আলম: ওরা প্রগ্রেসিভ রক গান করে। ঠিক...
ব্যান্ড আছে?
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, ও একটা নিজে ব্যান্ড করেছিল। সেটা এখন একটু ডিসম্যান্টেল হয়েছে। কিন্তু পেন্টাগনের সঙ্গে গান করত, এখনো করে। আর ওর একটা ব্যান্ড ছিল বোহেমিয়ান নামে। বোহেমিয়ান থেকে পাঁচটা খুব চমৎকার গান বের হয়েছিল।
বোহেমিয়ান তো বিখ্যাত।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ। আর ও মিডিয়াতেই আছে। টেলিভিশনে চাকরি করে, ৭১ চ্যানেল টেলিভিশনে। আর গান তো করেই।
আর নতুন গান কি হবে?
রফিকুল আলম: নতুন গান অদ্ভুত ব্যাপার, নতুন গানের সুযোগটা খুব কমে গেছে ইদানীং। কম্প্যাক্ট সিডি বের হচ্ছে না, ফিল্মে গান এখন হয় না। ফিল্মের গানের প্রয়োজনীয়তাটা অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই ২০১১ কি ২০২০ পর্যন্তও গানের ডিমান্ড ছিল চলচ্চিত্রে। এখন গানের প্রয়োজন হয় না। এর কারণ অনেক বড়। যাই হোক, চলচ্চিত্রে এখন গান নেই। এখন আমার একটা অ্যালবাম বেরোয় না। ওই অর্থে যেহেতু ক্যাসেটও নেই, সিডিও নেই। ফলে অ্যালবাম অর্থে ওইভাবে হয় না। এখন যেটা হয়—একটা–দুটো গান করে আপলোড করতে হয় প্ল্যাটফর্মগুলোতে; ইউটিউব, স্পটিফাই, সাউন্ড ক্লাউড—এই সমস্ত জায়গায় আপলোড করতে হয়। তাতে হচ্ছে কি, আমাদের গানের প্রোডাকশন কমে গেল। কারণ, কোথায় দেবে? ভালো সুরকারও বুঝতে পারছে না—‘গানটা করে আমি কী করব? টেলিভিশনে একবার চালাব, তো কী হবে?’ এখন আবার হয়েছে কি, কতগুলো পোর্টাল বেরিয়েছে, সেগুলো কিন্তু খুব জনপ্রিয় হয়েছে। যার জন্য আবার আমাদের ব্যস্ততা প্রায় আগের মতো। যেমন গত এক মাসে আমি চারটা নতুন গান করেছি, চারটা ব্র্যান্ড নিউ একেবারে...
দারুণ সুখবর আমাদের জন্য।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ, হ্যাঁ। এই তো গত সপ্তাহেই তো একটা গান করলাম।
(গান গাইছেন) শেষ বিকেলের আলোয় ভেসে যাক সব কথা...
এ রকম একটা গান। আমার টাইপেরই গান। তো এই স্কোপটা বেড়েছে। এই পোর্টালগুলো আরও...
খুবই সুখবর। আপনার চারটা নতুন গান আমরা নিশ্চয়ই শুনব।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
আমার শেষ প্রশ্ন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। ষাটের দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন বাংলাদেশে গান গাইতে গেলে বিভিন্ন জায়গায় বাধা দেওয়া হচ্ছে, কনসার্টে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কী দেখেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ?
রফিকুল আলম: না, আমি মনে করি না—এ দেশের মানুষ কখনো ভুল করে। এটা সাময়িক। বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কখনো ভুল করে না।
বাংলাদেশের জনগণও ভুল করবে না।
রফিকুল আলম: জনগণের কথাই বলছি। জনগণ...
গানের দেশ, কবিতার দেশ।
রফিকুল আলম: থাকবেই। এটা গানের দেশ। এটা প্রকৃতি থেকে আপনি আপরুট করতে পারবেন না। সাময়িক সমস্যা হতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়া হলেও আমি অত ডিপলি এগুলো নিয়ে চিন্তা করি না, গান-বাজনায় বেশি ইনভলব হওয়ার ফলে। কিন্তু যেটা হয়, ছোট দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক খেলাগুলো জমে যায়। ছোট দেশকে নিয়ে খেলতে খুব ভালোবাসে বড় এই তথাকথিত পাশ্চাত্য ও সভ্য দেশগুলো। সেটাও একটা কারণ হতে পারে।
কিন্তু এ দেশের মানুষ সচেতন আছে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী...
রফিকুল আলম: অবশ্যই।
মাটির সাথে সংলগ্ন।
রফিকুল আলম: হ্যাঁ।
ফলে গানের মধ্যে, কবিতার মধ্যে, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে থাকতেই হবে।
রফিকুল আলম: থাকবেই। এটা কোনো আমার চাহিদা না, এটাই মাটিরই চাহিদা, এই মানুষের মননের চাহিদা। এগুলো সাময়িক, খুবই সাময়িক। আমি এগুলোকে কোনো গুরুত্বই দিই না।
তাহলে আমরা সেই আশাবাদ দিয়েই শেষ করি। আমরা অনেকগুলো অভিজ্ঞতার আলোর অনুষ্ঠান করেছি। কিন্তু এই প্রথম এত গান শুনতে পেলাম। ফলে আমি খুবই আনন্দিত যে আমাদের সময়টা ভালো গেছে। রফিকুল আলম ভাই, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
রফিকুল আলম: আমি বারবার বহুবার কৃতজ্ঞতা জানাব আপনাকে এবং প্রথম আলোকে এই অনুষ্ঠানে আমাকে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য, নিজের কিছু কথা বলবার জন্য।