
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম কিছুদিন আগে পদত্যাগ করছেন। সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই বছরের মাথায় এ পদ থেকে সরে গেলেন। প্রথা ভেঙে আমলাদের পাশে রেখে বা পাশ কাটিয়ে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে এ পদে দেখা যায়নি। এখন তাঁর পদত্যাগের পর আবার একটি বিষয় সামনে এসেছে—এ পদে কি আবার একজন আমলা আসবেন, নাকি আগেরবারের মতোই অন্য পেশা থেকে কাউকে এই পদে দেখা যাবে?
প্রায় এক দশকে তরুণদের মধ্যে তুমুল জনপ্রয়ি এই চাকরির সংবাদ পরিবশেন করার অভজ্ঞিতা বলে, পিএসসি এমন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বিসিএসসহ বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান যাঁদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ দেয়, তাঁদের অনেকেই পরবর্তী ২৫-৩০ বছর রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাই পিএসসির চেয়ারম্যান কে হবেন—একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাকি দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন আমলা—এ প্রশ্ন নিছক পদায়নের আলোচনা নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ জনপ্রশাসনের মানও জড়িত।
সাম্প্রতিক দুই চেয়ারম্যানের পেশাগত পটভূমি এ আলোচনাকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের আগে পিএসসির চেয়ারম্যান ছিলেন মো. সোহরাব হোসাইন। তিনি ছিলেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন আমলা। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পিএসসির চেয়ারম্যান হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তিনি এবং কমিশনের ১২ সদস্য পদত্যাগ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
দুজনের পেশাগত পথ ভিন্ন। একজন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘ সময় কাজ করে এসেছেন, অন্যজন জনপ্রশাসন নিয়ে দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন ও গবেষণা করেছেন। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে—পিএসসির নেতৃত্বের জন্য কোনটি বেশি দরকার: প্রশাসন সম্পর্কে একাডেমিক জ্ঞান, নাকি প্রশাসন পরিচালনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা?
আমার বিবেচনায়, প্রশ্নটিকে ‘শিক্ষক বনাম আমলা’ হিসেবে দেখলে সমস্যাটিকে অতিসরলীকরণ করা হবে। বরং পিএসসির মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন একাডেমিক জ্ঞান ও বাস্তব প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কার্যকর সমন্বয়।
শুধু ভালো পরীক্ষার্থী নয়, ভালো কর্মকর্তা নির্বাচন
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শিক্ষা, গবেষণা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন কিংবা আন্তর্জাতিক নিয়োগপদ্ধতি নিয়ে গবেষণাভিত্তিক ধারণাও তাঁর থাকতে পারে। পিএসসির মতো প্রতিষ্ঠানে এসব দক্ষতার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু পিএসসির কাজ কি শুধু ভালো একটি পরীক্ষা নেওয়া?
একজন পরীক্ষার্থী বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি কিংবা সাধারণ জ্ঞানে অসাধারণ ফল করতে পারেন। কিন্তু তিনি কি একজন ভালো সরকারি কর্মকর্তা হবেন? জনগণের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন? সংকটের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? চাপের মধ্যে সততা ও পেশাদারত্ব ধরে রাখতে পারবেন? একজন জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে মানুষের সমস্যা বুঝতে পারবেন? মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জটিলতা সামলাতে পারবেন?
এ জায়গাতেই প্রশাসনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গুরুত্ব।
দীর্ঘদিন মাঠ প্রশাসন, মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়ে কাজ করা একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জানেন রাষ্ট্রযন্ত্র বাস্তবে কীভাবে চলে। তিনি জানেন, একটি সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে গিয়ে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়ে, কোন জায়গায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে এবং একজন তরুণ কর্মকর্তার কোন দক্ষতাগুলো কর্মজীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।
সহজভাবে বললে, একজন শিক্ষাবিদ বলতে পারেন আধুনিক জনপ্রশাসন কেমন হওয়া উচিত; একজন অভিজ্ঞ আমলা বলতে পারেন জনপ্রশাসন বাস্তবে কীভাবে চলে। পিএসসির আদর্শ নেতৃত্বের জন্য এ দুই জগতের মধ্যে সেতুবন্ধ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় সংকট আস্থার
চেয়ারম্যানের পেশাগত পরিচয় নিয়ে আলোচনা করার আগে পিএসসির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভবত প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা।
২০২৪ সালে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। ওই বছরের জুলাইয়ে সিআইডি পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, একটি চক্র দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সূত্র:
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। পিএসসির নিজস্ব তদন্ত কমিটি পরবর্তী সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছিল। অন্যদিকে ৪৬তম বিসিএসের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে হাইকোর্ট সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত এবং পিএসসির নিজস্ব অনুসন্ধানের ফল এক জায়গায় মেলেনি। সূত্র:
এমন পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর একটি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী যদি মনে করেন তাঁদের মেধা ও বছরের পর বছর প্রস্তুতির চেয়ে অন্য কোনো উপায়ে সরকারি চাকরি পাওয়া সম্ভব, তাহলে ক্ষতি শুধু পিএসসির নয়, রাষ্ট্রের ওপরই আস্থা কমে যায়।
দীর্ঘসূত্রতা কমানোও বড় পরীক্ষা
বিসিএসের আরেকটি পুরোনো সমস্যা দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়া। একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে বিসিএসের প্রস্তুতি নেন, প্রিলিমিনারি দেন, লিখিত পরীক্ষা দেন, ভাইভার অপেক্ষা করেন, এরপর ফলাফলের অপেক্ষা। একটি বিসিএস শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি বিসিএসের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।
এটি শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার প্রশ্ন নয়, এর মানবিক মূল্যও রয়েছে। একজন চাকরিপ্রার্থীর জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম কয়েকটি বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে যেতে পারে।
তাই পিএসসির নেতৃত্বকে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে একটি বিসিএস সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু গতি বাড়াতে গিয়ে পরীক্ষার মান, নিরাপত্তা কিংবা নিরপেক্ষতার সঙ্গে আপস করা যাবে না। দ্রুততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
মুখস্থবিদ্যা থেকে দক্ষতা যাচাই
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমান পরীক্ষাব্যবস্থা আসলে কী যাচাই করছে। বাংলাদেশে বিসিএসকে ঘিরে বিশাল কোচিং ও প্রস্তুতিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। একজন প্রার্থী কত তথ্য মনে রাখতে পারেন, তার ওপর যদি পরীক্ষার বড় অংশ নির্ভর করে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি ভবিষ্যতের কর্মকর্তা নির্বাচনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়?
আগামী দিনের একজন সরকারি কর্মকর্তাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, বৈশ্বিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির বাস্তবতায় কাজ করতে হবে। তাঁর শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, নৈতিক বিচারবোধ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
পিএসসির পরীক্ষায় এসব দক্ষতা কতটা যাচাই হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রযুক্তি যেমন সুযোগ, তেমনি ঝুঁকি
আবেদন থেকে ফল প্রকাশ—পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির আরও কার্যকর ব্যবহার পিএসসিকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে পারে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল অ্যাসেসমেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কিছু প্রযুক্তিও নিয়োগব্যবস্থায় সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু ডিজিটালাইজেশন নিজে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা নয়। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, সাইবার আক্রমণ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঝুঁকিও একই সঙ্গে বাড়ে। ফলে পিএসসির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে প্রশাসনের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও বুঝতে হবে।
চেয়ারম্যান কি তবে আমলাই হবেন
আমার উত্তর—শুধু আমলা হলেই কাউকে পিএসসির চেয়ারম্যান করা উচিত নয়। আবার শুধু একজন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ হওয়াও যথেষ্ট নয়।
একজন সাবেক সচিবের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর মধ্যে যদি ক্যাডারপ্রীতি, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা পুরোনো আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা থাকে, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা পিএসসির সংস্কারের পথে বাধাও হতে পারে।
একইভাবে একজন অধ্যাপকের জনপ্রশাসন নিয়ে অসাধারণ গবেষণা থাকতে পারে, কিন্তু বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, মাঠ প্রশাসন, আন্তক্যাডার সম্পর্ক এবং সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতে পারে।
তাই মো. সোহরাব হোসাইন ও অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম—এই দুই ভিন্ন পেশাগত পটভূমির অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের আরও বড় প্রশ্ন করা উচিত।
পিএসসির চেয়ারম্যান নির্বাচনে আমরা কি শুধু ব্যক্তির সর্বশেষ পদবি দেখব, নাকি তাঁর পুরো পেশাগত সক্ষমতা দেখব?
আমার মতে, ভবিষ্যতে এমন ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যাঁর প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি জনপ্রশাসন, গবেষণা, আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগব্যবস্থা সম্পর্কে শক্তিশালী ধারণা রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে হতে হবে সৎ, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ, সংস্কারমুখী এবং কোনো একটি ক্যাডার বা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে।
কারণ, পিএসসির দায়িত্ব শুধু আগামী বিসিএসের কয়েক হাজার পদ পূরণ করা নয়। আজ যাঁদের নির্বাচন করা হচ্ছে, তাঁদের মধ্য থেকেই আগামী কয়েক দশকের সচিব, রাষ্ট্রদূত, কর কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী তৈরি হবেন।
তাই পিএসসির চেয়ারম্যানের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত ‘আমলা না শিক্ষক’ নয়; আসল প্রশ্ন হলো, কে একই সঙ্গে প্রশাসনকে জানেন, আধুনিক নিয়োগব্যবস্থা বোঝেন, প্রতিষ্ঠানটির হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন এবং আগামী দিনের রাষ্ট্রের জন্য সঠিক মানুষগুলোকে বেছে নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন?
সেই মানুষটি শিক্ষকও হতে পারেন, আমলাও হতে পারেন। কিন্তু তাঁর মধ্যে একাডেমিক প্রজ্ঞা ও প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় থাকলে পিএসসি ও রাষ্ট্র—দুটিই লাভবান হবে।
*লেখক: মোছাব্বের হোসেন, যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত
*মতামত লেখকের নিজস্ব