বাংলাদেশের চাকরির বাজারে একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘মামা-চাচা’ না থাকলে চাকরি হয় না। একে আমরা নেতিবাচকভাবে ‘তদবির’ বা ‘লবিং’ বলে থাকি। কিন্তু আধুনিক করপোরেট বিশ্বে এই ধারণা বদলে গেছে। একে এখন বলা হয় ‘প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং’ বা পেশাদার যোগাযোগ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্যারিয়ার–বিষয়ক প্রতিষ্ঠান মাইপারফেক্টরিজিউমের ২০২৫ সালের এক বৈশ্বিক সমীক্ষা বলছে, ৫৪ শতাংশ মানুষই কোনো না কোনো পরিচিতির মাধ্যমে তাঁদের পছন্দের চাকরিটি পেয়েছেন। অথচ অবাক করার মতো বিষয় হলো, চাকরি খোঁজার সময় মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ তাঁদের পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বাংলাদেশে ‘রেফারেন্স’ শব্দটিকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কিন্তু পেশাদার রেফারেন্স আর অনৈতিক তদবির এক নয়। তদবির মানে হলো অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে সুযোগ নেওয়া। অন্যদিকে নেটওয়ার্কিং হলো নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার কথা পেশাদার উপায়ে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। নিয়োগকর্তারাও পরিচিত কাউকে নিয়োগ দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ, এতে প্রার্থীর নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে আগে থেকেই একটি ধারণা পাওয়া যায়।
কেন আমরা পিছিয়ে থাকি—
সমীক্ষা বলছে, আত্মবিশ্বাসের অভাবে প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষ পরিচিতদের কাছে সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করেন। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও এই জড়তা প্রবল। অনেকেই ভাবেন, সাহায্যের কথা বললে অন্যজন কী ভাববেন। কিন্তু ক্যারিয়ারে সফল হতে হলে এই লজ্জা ঝেড়ে ফেলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, যোগাযোগ একটি দক্ষতা এবং এটি অর্জন করা সম্ভব।
পেশাদার যোগাযোগ বা নেটওয়ার্কিং গড়ার জন্য কিছু সৃজনশীল কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে—
সাহস নিয়ে কথা বলুন: আপনি চাকরি খুঁজছেন বা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ—এটি আপনার চারপাশের মানুষকে জানান। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, সাবেক সহকর্মী বা পরিচিত শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
কেবল চাকরি নয়, পরামর্শ চান: সরাসরি ‘চাকরি আছে কি না’ না বলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কাজের ধরন সম্পর্কে পরামর্শ চান। বাংলাদেশে এখন লিংকডইন বেশ জনপ্রিয়; সেখানে অভিজ্ঞদের কাছে ইনবক্সে কোনো বিষয়ে ‘গাইডলাইন’ চাইলে সুসম্পর্ক তৈরি হয়।
সৃজনশীল আড্ডা: গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে ছোট কফি আড্ডা বা গেট টুগেদার আয়োজন করতে পারেন। যখন আপনি বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের সঙ্গে মিশবেন, তখন তথ্যের আদান-প্রদান বাড়বে। একজনকে অন্যজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াও আপনার নিজের নেটওয়ার্ককে বড় করে।
স্বেচ্ছাসেবী কাজ: পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ করলে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভলান্টিয়ারিং কাজের মাধ্যমে পেশাদার দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি আয়ের পথও প্রশস্ত হয়।
চাকরির বাজার এখন প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক। কেবল বড় ডিগ্রির জোরে কাঙ্ক্ষিত পদ পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। নিজের মেধা ও যোগ্যতাকে সঠিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তুলে ধরাই হতে পারে ২০২৬ সালের ক্যারিয়ারের মূল চাবিকাঠি। তাই গুটিয়ে না থেকে আজই আপনার ফোনবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করুন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে একটি ছোট ‘রেফারেন্স’ আপনার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।