শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ফল পুনর্নিরীক্ষণে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তাদের উচ্ছ্বাসটা এমনই হয়। ছবিটি গত বছরের
শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ফল পুনর্নিরীক্ষণে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তাদের উচ্ছ্বাসটা এমনই হয়। ছবিটি গত বছরের

এসএসসি ও সমমান

এসএসসি ও সমমানে খাতা পুনর্নিরীক্ষণে এত বেশি আবেদন, এবার হবে পুনর্মূল্যায়নও

এ বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য ৪ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী প্রায় ১৩ লাখ আবেদন করেছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি আবেদন পড়েছে লিখিত (তত্ত্বীয়) পরীক্ষার উত্তরপত্রের জন্য। আর ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতার জন্য আবেদন পড়েছে ২ লাখ ৩১ হাজারের বেশি।

এবার ফল পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন বা পুনর্নিরীক্ষণ করা হবে। এত দিন বোর্ডের নিয়মে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না। আবেদন করা পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করে মূলত প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা দেখা হতো।

এবার বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্নিরীক্ষণ করতে গিয়ে চাপের মুখে পড়ছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। জানতে চাইলে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক পরীক্ষক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বিকল্প নেই।

ঢাকা বোর্ডের ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার জন্য ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ৫৮ হাজার ১২টি আবেদন করেছে।

১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘদিন তুলনামূলক উচ্চ পাসের হার থাকার পর দুই বছর ধরে এসএসসির ফল কিছুটা নিম্নমুখী। এবার শুধু ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায়ও পাসের হার কমেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।

৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৩৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। ফলে পাসের হার কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা বেশি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনেও।

ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি আবেদন করেছে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার জন্য ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি আবেদন জমা পড়েছে।

প্রতিবছর লাখ লাখ উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো মানসম্মত পরীক্ষকের যেমন ঘাটতি আছে, তেমনি সময় কম থাকায় উত্তরপত্র মূল্যায়নে তাড়াহুড়োও থাকে। ফলে ভুলভ্রান্তির সুযোগ বাড়ে এবং যথাযথ মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের
এসএসসির ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট মনজুরুল কবীর প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ঢাকা বোর্ডের ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার জন্য ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ৫৮ হাজার ১২টি আবেদন করেছে।

অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঢাকা বোর্ডেই সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লা বোর্ডে ৩৫ হাজারের বেশি, রাজশাহী বোর্ডে ৩৯ হাজারের বেশি, যশোরে ২৮ হাজারের বেশি, চট্টগ্রামে ৩৯ হাজারের বেশি, বরিশালে ১৭ হাজারের বেশি, সিলেটে ২০ হাজারের বেশি, দিনাজপুরে ৩৭ হাজারের বেশি এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ২৭ হাজার ৬৭৬ জন পরীক্ষার্থী একাধিক বিষয়ের ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছেন।

এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪০ হাজারের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ২০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছেন।

বড়দের ভুলের খেসারত দেয় পরীক্ষার্থীরা

এত দিন প্রতিবছরই এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সময় নম্বর গণনায় অসংখ্য ভুল ধরা পড়েছে। পরীক্ষার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের পর অনেকের ফলও পরিবর্তন হয়। যেমন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় পুনর্নিরীক্ষণের পর নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২৮৬ জন পরীক্ষার্থী। এ ছাড়া ফেল থেকে পাস করেছিল ২৯৩ জন।

এত দিন আবেদন করা পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করে মূলত প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগে ভুল হয়েছে কি না, তা দেখা হতো। কিন্তু উত্তরপত্রের মূল্যায়নে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। ফলে ফল নিয়ে সন্দেহ বা সংশয় থাকলেও সব শিক্ষার্থী উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করত না। সে ক্ষেত্রে ভুলের প্রতিকারও সবাই পেত না। এ ছাড়া উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ার দাবিও ছিল দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিটও হয়েছিল। এবার ফল পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন বা পুনর্নিরীক্ষণ করা হবে।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, প্রতিবছর লাখ লাখ উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো মানসম্মত পরীক্ষকের যেমন ঘাটতি আছে, তেমনি সময় কম থাকায় উত্তরপত্র মূল্যায়নে তাড়াহুড়োও থাকে। ফলে ভুলভ্রান্তির সুযোগ বাড়ে এবং যথাযথ মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। তাই উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুলের সুযোগ কমাতে পরীক্ষক নির্বাচন, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও তদারকিতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।