সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়নে নতুন পদ্ধতি চালু করেছে সরকার। উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয়—এই চার স্তরের কমিটির মাধ্যমে বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি করা হবে। তবে অনলাইনের পরিবর্তে সনাতন ব্যবস্থা এবং কমিটিগুলোয় ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, সরকারি শিক্ষকদের বদলির মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বাইরের ব্যক্তিদের যুক্ত করা হলে স্বচ্ছতার পরিবর্তে তদবির ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
২১ জুন এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বদলি কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য রাখার বিধান করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের কমিটিতে অবশ্য এ ধরনের কোনো সদস্য রাখা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শিক্ষক বদলি কার্যক্রমে স্থবিরতা দূর করা এবং মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ কমাতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রযুক্তিনির্ভর ও অনলাইনভিত্তিক বদলিব্যবস্থার পরিবর্তে কমিটিনির্ভর প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়া কতটা যৌক্তিক।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক প্রায় পৌনে ৪ লাখ।
অনলাইনের পরিবর্তে সনাতন ব্যবস্থা এবং কমিটিগুলোয় ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, সরকারি শিক্ষকদের বদলির মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বাইরের ব্যক্তিদের যুক্ত করা হলে স্বচ্ছতার পরিবর্তে তদবির ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন উপজেলা বা থানা, জেলা, বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে হবে। জাতীয় কমিটির সভাপতি হবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব। বিভাগীয় কমিটির সভাপতি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা বা থানা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিটি কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য থাকবেন।
আবেদনের প্রক্রিয়া কী হবে, তা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, কমিটিগুলো প্রতি মাসে অন্তত একবার সভা করে বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবে। একই উপজেলা, জেলা বা বিভাগের মধ্যে বদলির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে আদেশ জারি করা হবে। অন্যদিকে আন্তবিভাগীয় বা আন্তসিটি করপোরেশন বদলির আবেদন জাতীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। নতুন নিয়োগ পাওয়া সহকারী শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে পদায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা কমিটিকে।
শিক্ষক বদলির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। তা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে এসব কমিটি কাজ করবে।ববি হাজ্জাজ, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারি শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন মূলত একটি প্রশাসনিক ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া। এ ধরনের সিদ্ধান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদেরই ভূমিকা থাকার কথা। বদলি কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। তবে সেখানে বেসরকারি ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়েই প্রশ্ন। শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে তদবির এবং পছন্দের কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কমিটিতে গণমান্য ব্যক্তির নামে বাইরের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার কারণে এ ধরনের তদবিরের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
আবার গণমান্য ব্যক্তি বলতে কাদের বোঝানো হবে, তার কোনো সংজ্ঞাও নেই। মূলত এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবই বেশি কাজ করে থাকে। তাঁদের মতে, বদলির ক্ষেত্রে কারা অগ্রাধিকার পাবেন, কোন পরিস্থিতিতে আবেদন গ্রহণ করা হবে এবং কোথায় পদায়ন করা হবে—এসব বিষয়ে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ যত বাড়বে, স্বচ্ছতা তত কমতে পারে।
শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রেও শূন্য পদের তথ্য, চাকরির মেয়াদ, দুর্গম এলাকায় কর্মকাল, নিজ বাড়ি থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব, পারিবারিক অবস্থা, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় বদলির ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব। এতে মানুষের হস্তক্ষেপ কমবে, তদবির ও অনিয়মের সুযোগও সীমিত হবে।
আগে অনলাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমেই প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির কাজটি হতো। শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন সেবায় ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রেও শূন্য পদের তথ্য, চাকরির মেয়াদ, দুর্গম এলাকায় কর্মকাল, নিজ বাড়ি থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব, পারিবারিক অবস্থা, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় বদলির ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব। এতে মানুষের হস্তক্ষেপ কমবে, তদবির ও অনিয়মের সুযোগও সীমিত হবে। তাঁদের মতে, উন্নত প্রযুক্তির এই সময়ে বদলির মতো প্রশাসনিক কাজ কমিটির ওপর নির্ভরশীল না করে অনলাইনভিত্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থায় পরিচালনা করা উচিত। এতে শিক্ষকেরা আবেদন করে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ফলাফল জানতে পারবেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ বা সুপারিশের প্রয়োজনও কমে আসবে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন এই ব্যবস্থা স্থায়ী নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক বদলির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। তা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে এসব কমিটি কাজ করবে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা ‘সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা-২০২৬’ অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সাধারণত প্রতি শিক্ষাবছরের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে অনলাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে একই উপজেলা বা থানা, আন্ত–উপজেলা বা থানা, আন্তজেলা, আন্তবিভাগ এবং সারা দেশে বদলির সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছিল। মূলত মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই অনলাইনে বদলির অনুমোদন দিতেন।
তবে এই নির্দেশিকা অনুযায়ী বাস্তবে বদলি কার্যক্রম শুরু হয়নি। মূলত ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর থেকেই সাধারণ বদলি বন্ধ রয়েছে।
এর আগে ‘সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা-২০২৩’ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সাধারণত প্রতিবছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে অনলাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে একই উপজেলা বা থানা, আন্ত–উপজেলা, আন্তজেলা ও আন্তবিভাগ বদলি করা যেত। সে ক্ষেত্রেও মূল দায়িত্বে ছিলেন মাঠপর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারাই। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজন হলে বছরের অন্য সময়েও অনলাইনে বদলির সুযোগ ছিল।
শিক্ষা প্রশাসন ও শিক্ষকসমাজের একটি অংশের মতে, বদলিপ্রক্রিয়া সুস্পষ্ট মানদণ্ড, অনলাইন আবেদন, শূন্য পদের উন্মুক্ত তথ্য এবং স্বয়ংক্রিয় অগ্রাধিকারব্যবস্থার ওপর নির্ভর হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। কিন্তু ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ যত বাড়বে, তদবির ও প্রভাবের অভিযোগও তত বাড়তে পারে।