বৈষম্যহীন সমাজ ও সমৃদ্ধিশালী দেশের জন্য চাই শিক্ষার্থীদের বৈষম্যমুক্ত শিক্ষাজীবন

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কোনো বিভাগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীই মনে না করার রোগে আক্রান্ত আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই পুরোনো রোগের কোনো প্রতিষেধক এখনো, এই আধুনিক যুগেও বাজারে আসেনি, যেই আধুনিক যুগকে বর্তমান আধুনিকতায় নিয়ে আসার পেছনে বিজ্ঞান বিভাগের পাশাপাশি ব্যবসায় এবং মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত অসংখ্য ব্যক্তিরও রয়েছে অনস্বীকার্য অবদান।

সভ্য সমাজের এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা এটাই মনে করেন, ব্যবসায় শিক্ষা এবং মানবিকে পড়া শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের চেয়ে দুর্বল এবং যারা ভালো শিক্ষার্থী, তাদের মোটেও ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিক বিভাগে লেখাপড়া করা উচিত নয়। বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করা যেন এক আভিজাত্যের ব্যাপার, যেই আভিজাত্য অর্জন করতে না পারলে জীবনটাই বৃথা। এই আভিজাত্য অর্জন করতে গিয়েই অনেক শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিকের পরিবর্তে মা-বাবার চাপে পড়ে এবং সভ্য সমাজ কর্তৃক তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সম্মুখীন হওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করে।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। আর এখন সমাজে ছোট হওয়ার ভীতি প্রতিনিয়ত আমাদের আগামী বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্নগুলোকে হত্যা করে চলেছে। আমাদের একবার হলেও চিন্তা করা উচিত, এ ধরনের শিক্ষার্থীরা যদি তাদের পছন্দের বিষয় নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে লেখাপড়া করতে পারত, তাদের মেধাকে তাদের পছন্দের ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারত, তাহলে তারা দেশ ও সমাজের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারত।

আলোচিত চিন্তাধারাটির কুফল শুধু এটাই নয় যে অনেক শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের বিষয়ে লেখাপড়া করা থেকে বঞ্চিত হয়। আরেকটি বড় কুফল হচ্ছে, যারা অনেক আশা নিয়ে বিজ্ঞানের বদলে তাদের পছন্দের অন্য কোনো বিভাগে লেখাপড়া করে, তাদের প্রতিটি পদে পদে সভ্য সমাজের রোগাক্রান্ত অংশ কর্তৃক তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং বৈষম্যের শিকার হতে হয়।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে যেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, সেই স্বাধীন বাংলাদেশেরই ব্যবসায় শিক্ষা এবং মানবিকে পড়া শিক্ষার্থীদের যদি তাদের শিক্ষাজীবন থেকেই বৈষম্য নামক এই মানসিক অত্যাচারে অত্যাচারিত হতে হয়, তবে আমাদের বুঝে নিতে হবে যে প্রকৃত অর্থে বৈষম্যমুক্ত একটি সমাজ গড়ার পথে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। যদি এখনো শিক্ষার্থীদের তাদের পছন্দের বিভাগে লেখাপড়া করা থেকে জোরপূর্বক বঞ্চিত করা হয়, তবে আমাদের বুঝে নিতে হবে, সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার পথের অনেকাংশই আমাদের পাড়ি দেওয়া বাকি রয়েছে।

এই কারণে আবার আমাদের তরুণ সমাজের অনেকে ভুল পথ বেছে নিয়ে নিজেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে আমরা হারিয়ে ফেলি অসংখ্য মূল্যবান মানবসম্পদ, যারা বৈষম্যের পরিবর্তে যদি অনুপ্রেরণা পেত, তবে জীবনকে গুছিয়ে সমাজের উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারত।

তাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যের আদর্শের প্রতি ধাবিত হয়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মতো অন্য দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও সমান চোখে দেখতে হবে এবং তাদের উন্নতির দিকে একইভাবে গুরুত্ব সহকারে নজর দিতে হবে। এতে সব শিক্ষার্থী আলোর পথের সন্ধান পেয়ে সেই পথে হেঁটে আলোকিত মানুষ হওয়ার সুযোগ পাবে। সেই সঙ্গে বিভাগের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করার রোগ হতে সমাজ মুক্তি পাবে এবং একটি বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার অবশিষ্ট পথে আমরা অগ্রসর হতে পারব।


*লেখক : নাফিস এহসাস চৌধুরী, শিক্ষার্থী, সাবেক প্রিফেক্ট, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা