২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) বর্তমানে ৩১টি বিভাগে পাঠদান চলছে
২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) বর্তমানে ৩১টি বিভাগে পাঠদান চলছে

ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি: একটি আধুনিক শিক্ষাঙ্গনের চিত্র

সাভারের বিরুলিয়ার আকাশটা যেন একটু বেশিই নীল। পিচঢালা চওড়া রাস্তার দুই পাশে চোখজুড়ানো সবুজ আর আধুনিক স্থাপত্যের মেলবন্ধন। দূর থেকে তাকালে মনে হতে পারে কোনো উন্নত দেশের পরিকল্পিত আধুনিক শহর। কিন্তু একটু এগোলেই কানে আসবে হাজারো তরুণের কোলাহল, আড্ডা আর স্বপ্নের গুঞ্জন। এটি কোনো সাধারণ আবাসিক এলাকা বা বাণিজ্যিক শহর নয়; তারুণ্যের মেধা আর আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর মেলবন্ধনে সাভারে গড়ে ওঠা ‘ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি।’ কেউ কেউ বলে থাকেন এটা এক ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ শিক্ষানগরী’।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) ক্যাম্পাসের খেলার মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল সাভারের রাজাশন এলাকা থেকে আসা অভিভাবক আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। নিজের সন্তানের জন্য দেশের অনেক ক্যাম্পাসই ঘুরে দেখেছেন তিনি। ডিআইইউর ক্যাম্পাস ঘুরে দেখে নিজের মুগ্ধতা লুকাতে পারলেন না সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মিলনের বাবা আমিনুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘এমন গোছানো ও চমৎকার পরিবেশ আর কোথাও দেখিনি। অভিভাবক হিসেবে আমাদের বড় একটা চিন্তা থাকে পড়াশোনার খরচ আর নিরাপত্তা নিয়ে। এখানে এসে শুনলাম, মেধাবীদের জন্য ৩৬টি ক্যাটাগরিতে স্কলারশিপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে টিউশন ফি মওকুফ সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।’

আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে আরও জানান, ‘সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা হলো, তারা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য গ্রুপ লাইফ ইনস্যুরেন্স চালু করেছে। ইতিমধ্যেই ৫ শতাধিক পরিবারকে ১৫ কোটি টাকার বেশি বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। এমন সুরক্ষার কথা আগে কোনো ইউনিভার্সিটিতে শুনিনি।’

সুযোগ-সুবিধা ও স্মার্ট ক্যাম্পাস

ক্যাম্পাসের মূল প্রশাসনিক ভবনের দিকে যেতেই চোখে পড়ে সম্পূর্ণ ‘ক্যাশলেস’ বা নগদ টাকার ঝামেলাহীন এক আধুনিক জীবনযাত্রা। শিক্ষার্থীরা পকেট থেকে কোনো মানিব্যাগ না বের করেই একটি ‘ওয়ান কার্ড’ ও বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে সব লেনদেন সেরে ফেলছেন। দূরদূরান্তের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য রাস্তাজুড়ে চলছে শতাধিক লাল-সবুজ বাস। পাশেই আবাসিক সুবিধা–সংবলিত ৫টি হলের ৯টি আধুনিক ভবন।

ক্যাম্পাসের এই নান্দনিকতা ও পরিবেশ নিয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ক্যাম্পাসটি নান্দনিক হওয়ার অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরাই এর সৌন্দর্য ধরে রাখে। তাদের দায়িত্বশীলতার কারণেই এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।’

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য ডিআইইউতে রয়েছে আবাসিক সুবিধা

একটু সামনে এগোতেই চোখে পড়ে ৭০ হাজার বর্গফুটের লাইব্রেরি, যেখানে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৩৬৭টি বই ও ই-রিসোর্সের সংগ্রহ রয়েছে। সেখানে ল্যাপটপ নিয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলেন সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাফিদ মুহতাদি মাহমুদ। ২০১০ সাল থেকে পরিচালিত ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ল্যাপটপ’ প্রকল্পের আওতায় ল্যাপটপটি পেয়েছেন তিনি।

ক্যাম্পাস ও পড়াশোনার অভিজ্ঞতা নিয়ে রাফিদ বলেন, ‘এখানে প্রথাগত বিষয়ের বাইরেও আমাদের জন্য রিয়েল এস্টেট, ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ, মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি (এমসিটি), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবটিকস এবং ফিশারিজের মতো একদম আধুনিক ও বিশেষায়িত বিভাগ রয়েছে। আমাদের প্র্যাকটিক্যাল শেখার জন্য এখানে ১৬০টি আধুনিক ল্যাবরেটরি আর ১৭টি বিশেষায়িত গবেষণাগার আছে। ফলে থিওরির পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাচ্ছি।’

ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। প্যারামাউন্ট সোলার লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে এখানে ৩.৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছে না, বরং প্রকৌশল ও পরিবেশবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ‘লাইভ লার্নিং ল্যাব’ বা হাতে-কলমে শেখার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।

উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান

শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের প্রস্তুতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি) পরিচালনা করছে ‘এমপ্লয়বিলিটি-৩৬০ ডিগ্রি’ মডেল। এর মাধ্যমে ৫০০টিরও বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে গত দুই বছরে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর চাকরি ও ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ মার্কেট ও ‘লার্ন অ্যান্ড আর্ন’ প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠেছেন। গ্র্যাজুয়েটদের এই দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ মাসুম ইকবালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু গ্লোবাল নয়, বরং লোকাল এমপ্লয়মেন্টের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান ফোকাস করি। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আমাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে আছেন। আমরা ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশনকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত করি।’

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) নান্দনিক ক্যাম্পাস

র‍্যাংকিংয়ে স্বীকৃতি

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, ড্যাফোডিলের এই মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণায় জোর দেওয়ার সুফল মিলছে বৈশ্বিক বিভিন্ন র‍্যাঙ্কিংয়ে। এর মধ্যে রয়েছে—টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) সাসটেইনেবিলিটি ইমপ্যাক্ট রেটিংস ২০২৬-এ বাংলাদেশের শীর্ষস্থান ও বিশ্বের সেরা ১০০ টেকসই বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান, ইউএস নিউজ বেস্ট গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিজ র‍্যাঙ্কিং ২০২৬-২৭-এ এশিয়ায় ৩৬৬তম ও বিশ্বে ১ হাজার ৬১তম অবস্থান, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিংস ২০২৭-এ ১০০১-১২০০ ব্যান্ডে অবস্থান, টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং ২০২৫-এ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথভাবে প্রথম স্থান। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘ডিআইইউ আরএকে’ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।

ডিআইইউ কর্তৃপক্ষ জানায়, বিশ্বের ৬৯০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের শক্তিশালী একাডেমিক নেটওয়ার্ক এবং ৫৫টিরও বেশি বৈশ্বিক সদস্যপদ রয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২ হাজার ৬০৩ শিক্ষার্থী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আর কবির বলেন, ‘আমরা চেয়েছি শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি বিস্তৃত করতে। আজকের এই অবস্থানের পেছনে প্রধান অবদান আমাদের সঠিক পলিসি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। শিক্ষার মান ও সাফল্যের এই ধারা বজায় রাখতে আমরা পৃথিবীর সব উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোলাবোরেশনে যাচ্ছি।’

অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্যও কাজ করছে ডিআইইউ। ‘ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস’ (ডিআইএসএস)-এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত প্রায় ৯৬ শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে শিক্ষা ও পুষ্টি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

নিয়মিত বিভিন্ন আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্রীড়া-সক্ষমতার পরিচয় বহন করে

ডিআইইউ সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি ও শক্তিশালী নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মানের যোগ্য করে তোলাই এখন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মূল লক্ষ্য। সাভারের স্মার্ট ক্যাম্পাস থেকে গ্র্যাজুয়েটরা শুধু সনদ নিয়ে নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। তাত্ত্বিক বিদ্যার পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানটিকে উচ্চশিক্ষার মানদণ্ডে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তাঁরা।