
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ থেকে শুরু হবে এবং এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলবে। তাই এখনই প্রস্তুতির শেষ সময়। প্রত্যেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আশা করে। কিন্তু পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফলের জন্য একজন পরীক্ষার্থীকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি নিতে হবে। এই সময় অনেকেই ভালো ফলাফল, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নম্বর বা এ প্লাস পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ অনুভব করে এবং শরীর ও মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কঠোর পড়াশোনা করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শুধু সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। নিজের দক্ষতা, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসই একজন শিক্ষার্থীর আসল শক্তি।
পরীক্ষার আগে বাকি সময়টুকু সঠিকভাবে কাজে লাগানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কিছু শেখার চেয়ে এখন আগের পড়াগুলো ভালোভাবে পুনরাবৃত্তি করা বেশি দরকার। প্রতিদিন একটু একটু করে পড়লে এবং পরিকল্পনা মেনে পড়াশোনা করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যদি তোমরা তোমাদের সময় এবং সক্ষমতাকে সঠিকভাবে কাজে না লাগাও, তাহলে পরে কষ্ট পেতে হবে। কারণ, যখন নিজের প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে পারবে, তখন হয়তো ফলাফল ঠিক করার মতো সময় আর থাকবে না।
শিক্ষার্থীরা, তোমাদের মা–বাবা সব সময় তোমাদের সুখে-দুঃখে পাশে আছেন। তাই অযথা ভয় বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে যে জীবন শুধু একটি পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে না। জীবনে আরও অনেক পরীক্ষা আসবে এবং প্রতিটি ধাপেই নতুন সুযোগ থাকবে। তাই এসএসসি পরীক্ষাকে জীবনের শেষ বা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ভাবার কোনো কারণ নেই। ফলাফল যা–ই হোক না কেন, শিক্ষকেরা, বাবা-মা এবং বড়রা সব সময় তাদের পাশে আছেন। তাঁরা সন্তানের চেষ্টা, পরিশ্রম এবং সততাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
তবে বাস্তবতা হলো, অনেক সময় অভিভাবকেরাই সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন। অনেকেই মনে করেন যে জিপিএ–৫ না পেলে যেন জীবনের কোনো মূল্যই নেই বা সমাজে তাদের মর্যাদা কমে যাবে। এই ধরনের চিন্তা শিক্ষার্থীর মনে অযথা ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করে। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের স্বপ্নকে সম্মান করা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা। একজন শিক্ষার্থী যেন আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিভাবক হিসেবে আমাদের উচিত সন্তানদের স্বপ্ন অনুসরণ করতে দেওয়া এবং তাদের সর্বোচ্চভাবে সমর্থন করা।
এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অনেকেই পরীক্ষার আগে এসব প্রলোভনে পড়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এ ধরনের অবৈধ পথ তাদের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। কখনোই প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অন্য কোনো অসৎ উপায়ের দিকে ঝুঁকে পড়া উচিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকেরাও সন্তানের ভালো ফলাফলের জন্য এমন অনৈতিক পথে উৎসাহ দেন। কিন্তু এভাবে পাওয়া ফলাফল কখনোই সত্যিকারের সাফল্য নয়; বরং এটি ভবিষ্যতে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আবার, পরীক্ষার হলে নকল করা বা অন্য পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নকল করা দুটিই একই ধরনের অসৎ কাজ। তাই পরীক্ষার হলে যেকোনো ধরনের নকল থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
পরীক্ষায় ভালো করার জন্য কৌশল বা সঠিক পরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় কৌশলী হতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান একজন শিক্ষার্থীকে প্রত্যাশিত সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সময় ব্যবস্থাপনা একজন শিক্ষার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরীক্ষা প্রস্তুতির সময়, পরীক্ষার দিন হলের উদ্দেশে বের হওয়ার সময় এবং পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার সময়—সব ক্ষেত্রেই সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে।
পরীক্ষার আগে নিজের অ্যাডমিট কার্ড ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিতে হবে এবং সেগুলো একটি স্বচ্ছ ফাইলে করে পরীক্ষার হলে নিয়ে যেতে হবে। পরীক্ষার দিন সময়মতো কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখা একজন দায়িত্বশীল পরীক্ষার্থীর পরিচয়। পরীক্ষার সময় নির্ধারিত নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার্থীদের জন্য যে নির্দেশনাগুলো আগে থেকেই দেওয়া থাকে, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ে ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। বিশেষ করে উত্তরপত্রে রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, বিষয় কোড, সেট কোড ইত্যাদি সঠিকভাবে লিখতে হবে এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে নির্ধারিত বৃত্ত সতর্কতার সঙ্গে পূরণ করতে হবে। এমসিকিউ প্রশ্নের বিষয় কোড ও ওএমআর শিটের বৃত্তগুলোও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পূরণ করতে হবে, যেন কোনো ভুল না হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন পরীক্ষার শেষে স্বাক্ষর শিটে নিজের রোল নম্বর অনুযায়ী সঠিকভাবে স্বাক্ষর করতে হবে, উত্তরপত্রের ক্রমিক নম্বর লিখতে হবে। এসব বিষয়ে অসাবধানতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে, তাই প্রতিটি ধাপ খুব যত্নসহকারে সম্পন্ন করা উচিত। পরীক্ষা শুরু করার আগে তাড়াহুড়া না করে শান্ত ও স্থির থাকতে হবে। পুরো প্রশ্নপত্রটি ভালোভাবে পড়ে নিতে হবে এবং কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে উত্তর লেখা শুরু করা উচিত। এতে ভুল কম হয় এবং উত্তরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে—Have faith in yourself.
সবশেষে মনে রাখতে হবে, তোমাদের মা–বাবা সব সময় তোমাদের সুখে-দুঃখে পাশে আছেন। তাই অযথা ভয় বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শিক্ষকদের উপদেশ, বাবা-মায়ের ভালোবাসা এবং বড়দের আশীর্বাদকে শক্তি হিসেবে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করো।
সবার জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। তোমাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর ও উজ্জ্বল হোক।
*লেখক: শুভাশীষ দাশ, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি, সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, ফেনী shubha8430@gmail.com