
চীনে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জীবনযাপন বাংলাদেশি তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। আধুনিক শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা ও আন্তর্জাতিক পরিবেশে নিজেকে গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও পিএইচডি গবেষক মো. আবু কাওসার।
জীবনের কিছু যাত্রা কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকেও নতুনভাবে গড়ে তোলে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে চীনে আসার অভিজ্ঞতা তেমনই এক পরিবর্তনশীল যাত্রা। দূর থেকে চীনকে মূলত দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দেশ হিসেবে জানা ছিল। এখানে এসে আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি, এই উন্নয়নের পেছনে রয়েছে শিক্ষা, বিজ্ঞান, গবেষণা, শৃঙ্খলা কঠোর পরিশ্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনার একটি সমন্বিত সংস্কৃতি। বিদেশে পিএইচডি করার সিদ্ধান্ত শুধু একটি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়নি। পরিচিত পরিসর ও স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন জ্ঞান, নতুন মানুষ এবং ভিন্ন এক গবেষণা-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার গভীর আগ্রহ থেকেই এ যাত্রার সূচনা।
উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকার প্রচলিত আকর্ষণ আমাকে সেভাবে টানেনি; বরং প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সহাবস্থান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত অগ্রগতি এবং গবেষণায় চীনের ক্রমবর্ধমান সাফল্য দীর্ঘদিন ধরেই আমাকে কৌতূহলী করেছে। কীভাবে দেশটি নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখেই আধুনিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এমন একটি পরিবেশে কাজ করতে চেয়েছি, যেখানে গবেষণাকে শুধু তাত্ত্বিক অনুশীলন হিসেবে নয়, বাস্তব সমস্যা সমাধান ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। এসব কারণেই উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়া।
পরবর্তী সময়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্যাস-আনসো স্কলারশিপ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসে পিএইচডি গবেষক হিসেবে যোগ দিই। ‘নেচার ইনডেক্স ২০২৫ রিসার্চ লিডার্স’–এর বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসে চীনের উন্নত গবেষণাব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিবেশ ও বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষাজীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। চীনের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি গবেষণার ব্যবহারিক প্রয়োগ, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং নতুন সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগও এখানে লক্ষণীয়। ফলে গবেষণাগারে অর্জিত জ্ঞান শুধু প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিল্প, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত হয়।
এক সেমিস্টারের একাডেমিক পাঠ্যক্রম শেষ করে গবেষণার জন্য গুয়াংজুতে অবস্থিত চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সাউথ চায়না সি ইনস্টিটিউট অব ওশানোলজিতে যোগ দিই। বেইজিং থেকে গুয়াংজুতে স্থানান্তর শুধু শহর পরিবর্তন নয়; এটি ছিল আবহাওয়া, জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে এক নতুন অভিজ্ঞতার সূচনা। বেইজিংয়ের শীতে তাপমাত্রা প্রায়ই শূন্যের নিচে নেমে যায়, শুষ্ক বাতাস ও দ্রুতগতির নগরজীবন সেখানে দৈনন্দিন বাস্তবতা। বিপরীতে দক্ষিণ চীনের গুয়াংজু উষ্ণ ও আর্দ্র উপক্রান্তীয় শহর, যেখানে শীত তুলনামূলক মৃদু এবং সবুজ প্রকৃতির উপস্থিতি বেশি।
গুয়াংজুর নগরজীবনের সঙ্গে পার্ল রিভারের সম্পর্ক গভীর। শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই নদী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি গুয়াংজুর বাণিজ্যিক ইতিহাস, যোগাযোগব্যবস্থা ও নগর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সন্ধ্যায় নদীর দুই তীরের আলোকসজ্জা, ক্রুজ সার্ভিস, সেতু ও আধুনিক স্থাপত্য শহরটির ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সহাবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
দুই শহরের সাংস্কৃতিক আবহেও সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বেইজিংয়ে চীনের প্রাচীন ইতিহাস, রাজকীয় স্থাপত্য ও জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রভাব বেশি দৃশ্যমান। অন্যদিকে গুয়াংজুর জীবনধারায় ক্যান্টনিজ সংস্কৃতি, স্থানীয় ভাষা, খাদ্যাভ্যাস এবং দক্ষিণ চীনের বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের স্বতন্ত্র ছাপ রয়েছে। খাবারের স্বাদ, মানুষের কথাবার্তা এবং দৈনন্দিন সামাজিক আচরণেও এই ভিন্নতা অনুভব করা যায়।
প্রযুক্তির ব্যবহারে দুই শহরই অত্যন্ত আধুনিক। তবে বেইজিংয়ে বৃহৎ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তি অবকাঠামোর ঘনত্ব বেশি চোখে পড়ে, আর গুয়াংজুতে স্মার্ট পরিবহন, ডিজিটাল সেবা, দ্রুত নগরায়ণ এবং শিল্প ও গবেষণার সমন্বিত উপস্থিতি বিশেষভাবে অনুভূত হয়। এক শহর থেকে অন্য শহরে আসার এই পরিবর্তন চীনের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগ দিয়েছে।
আমার বর্তমান গবেষণার মূল ক্ষেত্র অয়েস্টার ইমিউনোলজি, যেখানে অয়েস্টারের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, ইমিউন প্রাইমিং, পরিবেশগত চাপের সঙ্গে অভিযোজন এবং বিপাকীয় পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা চলছে। চীনের গবেষণাগারে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সফল বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, দলগত সহযোগিতা, ধৈর্য এবং প্রতিটি ফলাফলকে প্রশ্ন করার মানসিকতা। কোনো এক্সপেরিমেন্টের ফল প্রত্যাশামতো না এলে সেটিকে ব্যর্থতা হিসেবে নয়; বরং নতুন প্রশ্নের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অধ্যাপক ও গবেষকদের অংশগ্রহণে ল্যাব মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাম্প্রতিক কাজের অগ্রগতি, ফলাফল ও সমস্যাগুলো সময় নিয়ে উপস্থাপন করতে হয় এবং প্রত্যেকে নিজের পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পায়। এই প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের শুধু নির্দেশনা অনুসরণে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনে অভ্যস্ত করে। ল্যাবগুলোর অবকাঠামোও অত্যন্ত উন্নত। প্রয়োজনীয় রাসায়নিক, রিএজেন্ট ও যন্ত্রপাতি দ্রুত সরবরাহ করা হয়, আর বিভিন্ন বায়োটেকনোলজি কোম্পানি প্রযুক্তিগত সহায়তায় সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকে। অধ্যাপকেরা গবেষণা ও ফান্ড সংগ্রহে ব্যস্ত থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাজের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। চীনা ল্যাবমেটদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতামূলক মনোভাবও এই গবেষণা পরিবেশকে আরও কার্যকর করে তোলে।
চীনে এসে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে ভাষা। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে ইংরেজিতে যোগাযোগ করা গেলেও বাজার, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, গণপরিবহন কিংবা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় মান্দারিনের প্রয়োজন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। শুরুতে সাধারণ কথাবার্তাও বুঝতে অসুবিধা হতো। কখনো অনুবাদ অ্যাপ, কখনো ইশারা, আবার কখনো আশপাশের মানুষের সহায়তায় প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। কোর্সওয়ার্কের সময় মান্দারিন ভাষার একটি কোর্স করার সুযোগ ছিল। সেখান থেকে শেখা কিছু প্রয়োজনীয় শব্দ ও বাক্য পরবর্তী সময়ে দৈনন্দিন জীবনকে অনেকটাই সহজ করেছে। তবে ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর অভিজ্ঞতা এসেছে শ্রেণিকক্ষের বাইরে—দোকানে প্রয়োজন বোঝাতে গিয়ে, ট্যাক্সিচালককে গন্তব্য বলতে গিয়ে কিংবা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ছোট ছোট কথোপকথনের মাধ্যমে। ভুল উচ্চারণে কখনো মজার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ধৈর্য ধরে বুঝতে চেষ্টা করেছেন।
এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যোগাযোগ শুধু ভাষার ওপর নির্ভর করে না। একই ভাষায় কথা বলতে না পারলেও একটি হাসি, সহযোগিতার মনোভাব কিংবা প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে দেয়। চীনা সহপাঠী ও সহকর্মীদের সহযোগিতা দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, আর বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের কৌতূহল নিজের দেশ, সংস্কৃতি, খাবার, নদী, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ নিয়ে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরে এমন ছোট ছোট মানবিক যোগাযোগই বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় করে তোলে।
চীনে বসবাসের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে উন্নত গণপরিবহন, সাবওয়ে, হাইস্পিড রেল, ডিজিটাল সেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং দৈনন্দিন জীবনের শৃঙ্খলা। বড় শহরগুলোয় বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করলেও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ও নাগরিক সেবার কারণে জীবন তুলনামূলকভাবে সহজ, নিরাপদ ও গতিশীল। দোকানে কেনাকাটা, খাবার অর্ডার, পরিবহন ব্যবহার কিংবা প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধ—প্রায় ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাভাবিক জীবনের অংশ। উইচ্যাট ও আলিপের মতো দুটি অ্যাপের মাধ্যমেই অধিকাংশ আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। নগদ অর্থের ব্যবহার খুবই সীমিত, আর ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহির সুযোগও বাড়ে।
প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধার পাশাপাশি চীনের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার আরও কিছু দিক পরিবারসহ বসবাসকে স্বস্তিদায়ক করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ভাড়ায় বাসা পাওয়া যায়, আর স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শাকসবজি ও খাবারের দামও অনেক ক্ষেত্রে সহনীয়। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় সুশৃঙ্খল পরিবেশে দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়, যা বিদেশে পরিবার নিয়ে থাকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিশ্চয়তা দেয়। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, রাতেও রাস্তাঘাটে চলাচল করতে সাধারণত নিরাপদ মনে হয়। সব মিলিয়ে পরিবারসহ দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করা এখানে বেশ সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।
চীনের শিক্ষা এবং গবেষণা পরিবেশে সময়ানুবর্তিতা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্বও স্পষ্ট। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, গবেষণার তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং দলীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাকে পেশাগত সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা হয়। চীনের দ্রুত উন্নয়নের পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা আধুনিক রেলব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বিজ্ঞানশিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং তুলনামূলক কম খরচে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রচেষ্টাও এই অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে শেখার সুযোগ শুধু ক্লাস ও গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে উইন্টার, সামার ও স্প্রিং স্কুল আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ, বক্তৃতা ও একাডেমিক আলোচনায় অংশ নেন। এসব আয়োজন নতুন জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি করে। মাল্টিলিঙ্গুয়াল সায়েন্স পোস্টার, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও ও গবেষণা ফেলোশিপ প্রতিযোগিতাসহ নানা সৃজনশীল কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের গবেষণা উপস্থাপন এবং নিজেদের দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। নিয়মিত গবেষণা সেমিনার, ক্যারিয়ার টক, অ্যালামনাই সেশন ও বিশেষজ্ঞ বক্তৃতা তাদের একাডেমিক ও পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করে।
অন-ক্যাম্পাস ফেয়ারে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংস্কৃতি, খাবার ও ঐতিহ্য তুলে ধরে। পাশাপাশি নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজন এবং ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল ও জিমনেসিয়ামের মতো ইনডোর সুবিধা পড়াশোনা ও গবেষণার চাপ কমাতে সহায়তা করে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য কাউন্সেলিং সুবিধাও রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব উদ্যোগ যোগাযোগ, নেতৃত্ব, দলগত কাজ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের দক্ষতা গড়ে তোলে।
চীনে আসার আগে পরিচয় ছিল একজন শিক্ষক ও অ্যাকোয়াকালচার গবেষক হিসেবে; এখানে থাকার অভিজ্ঞতা সেই পরিচয়কে আরও বিস্তৃত করেছে। ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া ও বৈজ্ঞানিক সমস্যাকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা—এসবই এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে থাকা, গবেষণার চাপ এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতা সহজ ছিল না। তবে এসব চ্যালেঞ্জ ধৈর্য, আত্মনির্ভরতা ও দায়িত্ববোধ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে উন্নত গবেষণাপদ্ধতি শেখা, বহু সাংস্কৃতিক পরিবেশে কাজ করা এবং আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে।
পিএইচডি শেষে দেশে ফেরার সময় সঙ্গে শুধু একটি সনদ নয়; থাকবে নতুন জ্ঞান, গবেষণাদক্ষতা এবং বাংলাদেশ-চীন বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন। তাই এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের নয়; এটি শেখা, বদলে যাওয়া এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সেতু গড়ে তোলার গল্প।
লেখক: মো. আবু কাওসার, পিএইচডি গবেষক, সাউথ চায়না সি ইনস্টিটিউট অব ওশানোলজি, গুয়াংজু, চায়না; এবং সহকারী অধ্যাপক, অ্যাকোয়াকালচার বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com