
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রশ্ন যখন ওঠে মানুষের জীবনমরণ বা সাইবার নিরাপত্তার, তখন প্রযুক্তির ‘নির্ভুলতা’র চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় ‘আস্থা’। এই আস্থার সংকট দূর করতে এবং নিরাপদ ও ব্যাখ্যাযোগ্য এআই (Explainable AI) উন্নয়নে বিশ্বজুড়ে কাজ করছেন একদল গবেষক। সেই আন্তর্জাতিক গবেষক দলে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন এক বাংলাদেশি তরুণ—কাঞ্চন কুমার বিষ্ণু।
নটর ডেম থেকে বিশ্বমঞ্চে—
কাঞ্চন কুমার বিষ্ণুর এই যাত্রা শুরু হয়েছিল রাজধানীর নটর ডেম কলেজ থেকে। ২০১৫-১৭ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে পাঞ্জাবের লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (২০১৮-২২) স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেসে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর (২০২৩-২৫) গবেষণায় নিয়োজিত। দক্ষিণ এশিয়া থেকে বিশ্বমঞ্চে তাঁর এই পদচারণা প্রমাণ করে, মেধা ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে সীমানা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
কাঞ্চন কুমার বিষ্ণু প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই সার্থক হবে, যখন তা মানুষের কল্যাণে আস্থার সঙ্গে ব্যবহৃত হবে।’
যখন নির্ভুলতা মেলে আস্থার সঙ্গে—
কাঞ্চনের গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো ‘অনিশ্চয়তা-সচেতন’ (Uncertainty-aware) এআই। আমরা জানি, এআই অনেক সময় ভুল ফলাফল দেয়, কিন্তু কাঞ্চন এমন এক ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম নিয়ে কাজ করছেন, যা ৯৭ শতাংশের বেশি নির্ভুল। ২০২৪ সালে স্বাস্থ্যসেবা ও এআই নিয়ে তাঁর প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি গবেষক মহলে সাড়া ফেলে। তাঁর উদ্ভাবিত উন্নত ‘ডিপ লার্নিং’ ফ্রেমওয়ার্ক নিউরোডিজেনারেটিভ বা মস্তিষ্কজনিত জটিল রোগ শনাক্তকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তবে কাঞ্চন কেবল তথাকথিত নির্ভুলতার পেছনে ছোটেননি। তাঁর গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে ‘ব্যাখ্যাযোগ্যতা’। অর্থাৎ একটি এআই মডেল কেন একটি নির্দিষ্ট ফলাফল দিল, তার গাণিতিক ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকা জরুরি। বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যেখানে ভুল করার কোনো অবকাশ নেই, সেখানে কাঞ্চনের উদ্ভাবিত ‘বেয়েশিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্ক’ ও ‘অ্যাটেনশন মেকানিজম’ প্রযুক্তিকে আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।
সাইবার জগতের অতন্দ্রপ্রহরী—
স্বাস্থ্যসেবার গণ্ডি পেরিয়ে কাঞ্চনের মেধার স্বাক্ষর রয়েছে সাইবার নিরাপত্তাতেও। ২০২২ সালে এই বিষয়ে তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ডিজিটাল জালিয়াতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতারণা শনাক্তকরণে তাঁর গবেষণাগুলো আন্তর্জাতিক জার্নালে বেশ সমাদৃত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে হাসপাতাল বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো যখন প্রতিনিয়ত সাইবার ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন তাঁর ‘সিকিউর বাই ডিজাইন’ দৃষ্টিভঙ্গি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এক অনন্য উদাহরণ।
সাফল্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—
কাঞ্চন কুমারের সাফল্যের ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। তাঁর গবেষণাগুলো প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ‘নেচার’ পাবলিশিং গ্রুপের সায়েন্টিফিক রিপোর্টস, আইইইই অ্যাকসেস এবং একাধিক এলসেভিয়ার ইনডেক্সড আন্তর্জাতিক জার্নালে। তিনি শুধু গবেষকই নন, বরং একজন স্বীকৃত রিভিউয়ারও। নামকরা জার্নাল অফ আলঝেইমার’স ডিজিজ-সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় পিয়ার রিভিউয়ার হিসেবে তিনি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য নাম।
এ ছাড়া তিনি জার্নাল অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল নিউরোলজির সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য এবং সম্মানজনক বৈজ্ঞানিক সোসাইটি ‘সিগমা এক্সে’ ও আইইইইর গ্র্যাজুয়েট মেম্বার। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা-প্রসেসিং প্রযুক্তিতে তিনি অর্জন করেছেন যুক্তরাজ্য অনুমোদিত একটি পেটেন্ট।
আগামীর পথচলা—
বিশ্বজুড়ে এখন এআই নিয়ন্ত্রণ ও এর নৈতিক ব্যবহার নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সেই বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় একজন বাংলাদেশি হিসেবে কাঞ্চন কুমার বিষ্ণুর অবদান আমাদের জন্য গর্বের। প্রযুক্তির এই জটিল জগতে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি কেবল নিজের ক্যারিয়ারই গড়ছেন না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নামকেও সগৌরবে তুলে ধরছেন।
কাঞ্চন কুমার বিষ্ণু প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই সার্থক হবে, যখন তা মানুষের কল্যাণে আস্থার সঙ্গে ব্যবহৃত হবে।’