
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি, মানকাটোতে বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি কলেজের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশি অধ্যাপক মোহাম্মদ সওকত-উল আলম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক এই শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ১৯৮৭ সালে। মাত্র আড়াই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ডেটন থেকে পিএইচডি করে এই দেশেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ৩৩ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তিনি।
মোহাম্মদ সওকত-উল আলম মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডিন হিসেবে যোগ দেন ২০২৩ সালে। এখানে যোগদানের আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি - কিংসভিলে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আলাবামায় বিভাগীয় প্রধান ও ওয়ারেন নিকলসন এনডাউড চেয়ার প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পারডু ইউনিভার্সিটি–ফোর্ট ওয়েইন ও ইউনিভার্সিটি অব আলাবামাতেও শিক্ষকতা করেছেন তিনি।
মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক প্রশাসকের জন্য একাডেমিক ফল ছাড়াও কমিউনিকেশন স্কিল, ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্কিল, কনফ্লিক্ট রেজোল্যুশন স্কিল ও লিডারশিপ স্কিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক পদে ভারতীয়দের বেশি দেখা যায়। কারণ, তাঁরা কমিউনিকেশন ও নেটওয়ার্কিং স্কিলে আমাদের চেয়ে এগিয়ে।
মোহাম্মদ সওকত-উল আলমের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়াশোনার পর হাটহাজারী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন ১৯৭৯ সালে। কৃতিত্বের সঙ্গে বিএসসি করার পর বুয়েটেই শিক্ষকতা শুরু করেন এবং এমএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান ১৯৮৭ সালে।
মোহাম্মদ সওকত-উল আলম যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯৯২ সালে পারডু ইউনিভার্সিটি-ফোর্ট ওয়েইনে। এরপর একে একে যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর গবেষণায় আগ্রহের ক্ষেত্রগুলো হলো ইমেজ প্রসেসিং, প্যাটার্ন রিকগনিশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট ও কন্ট্রোল। এখন পর্যন্ত ৫৭০টির বেশি গবেষণা পেপার পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত জার্নালে ও কনফারেন্সে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে ১৫০টির বেশি কি-নোট বক্তৃতা, আমন্ত্রিত প্রবন্ধ, সেমিনার ও টিউটোরিয়াল উপস্থাপন করেছেন।
মোহাম্মদ সওকত-উল আলম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাবেট অ্যাক্রিডিটেশন নেই। অ্যাবেট হলো প্রতিটি একাডেমিক প্রোগ্রামের একটি কার্যকরী মূল্যায়নপ্রক্রিয়া। এই স্বীকৃতি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রোগ্রামে থাকলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসতে সাধারণত জিআরই স্কোর লাগে এবং তাঁরা সহজে আসতে পারেন।
৫৫ জনের বেশি মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থী, ১৬ জন পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক এবং ৮ জন ভিজিটিং স্কলারের গবেষণা তত্ত্বাবধান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিন মোহাম্মদ সওকত-উল আলম। তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যাবেট (ABET) ইভ্যালুয়েটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি গবেষণা, শিক্ষা ও পেশায় অসামান্য অবদানের জন্য অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, ১১টি পেশাদার সোসাইটির নির্বাচিত ফেলো, আইইইই (IEEE)–এর রিজিয়ন ফোর (ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, আইওয়া, মিশিগান, মিনেসোটা, নেব্রাসকা, নর্থ ডেকোটা, সাউথ ডেকোটা, ওয়াইহো এবং উইসকনসিন) থেকে ১৯৯৮ সালে এবং রিজিয়ন থ্রি (আলাবামা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, কেন্টাকি, মিসিসিপি, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, টেনেসি ও ভার্জিনিয়া) থেকে ২০১৩ সালে আউটস্ট্যান্ডিং ইঞ্জিনিয়ার অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৬ সালে আইইইই রিজিয়ন থ্রি জোসেফ এম বাইডেনবাখ আউটস্ট্যান্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং এডুকেটর অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
মোহাম্মদ সওকত-উল আলম প্রথম আলোকে বলেন, যখন আমি যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসি, তখন কোনো শিক্ষার্থীর গবেষণা জার্নাল পেপার প্রয়োজন হলে সেটি কখনো কখনো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি অথবা জার্নাল প্রকাশক থেকে আনতে হতো পোস্ট অফিসের মাধ্যমে। একেকটি রিসার্চ আর্টিকেল বা জার্নাল পেপার আনতে কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেত। আমাদের একেকটা রিসার্চ করতে এখনকার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শ্রম ও সময় দিতে হতো। এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে পড়াশোনা ও গবেষণা অনেক সহজ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করলেও বাংলাদেশকে ভুলে যাননি অধ্যাপক আলম। তিনি বাংলাদেশে যান এবং বাংলাদেশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের নিয়ে প্রায় প্রতিবছর ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি–আইসিসিআইটি (ICCIT) নামে কনফারেন্স আয়োজন করেন। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া আইসিসিআইটি কনফারেন্স বাংলাদেশে আয়োজিত সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ সময় চলমান আইইইই স্পনসরড কনফারেন্স এবং এটি শত শত বাংলাদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে তাঁদের গবেষণা ও উপস্থাপনে প্রকাশনা সহায়তা করেছে, পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে সহকর্মীদের সঙ্গে নেটওয়ার্কিং, যোগাযোগের সুযোগ এবং অনেক শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন দাতব্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাবেট অ্যাক্রিডিটেশনের জন্য জোরালোভাবে কাজ করা উচিত। তাহলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা সহজ হবে। এ ছাড়া আর্থিক সীমাবদ্ধতার জন্য ভারতের মতো বাংলাদেশেও যদি ব্যাংকগুলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা লোন দেয়, তাহলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে আসা সহজ হবে।
যদিও মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক বাংলাদেশি অধ্যাপক আছেন, কিন্তু প্রশাসনিক পদে খুব বেশি বাংলাদেশিকে দেখা যায় না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলম বলেন, আমেরিকায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের দক্ষতা এবং যোগাযোগ দক্ষতা শেখানো হয়, যা বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম শেখানো হয় অথবা শেখানো হয় না। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক প্রশাসকের জন্য একাডেমিক রেজাল্ট ছাড়াও কমিউনিকেশন স্কিল, ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্কিল, কনফ্লিক্ট রেজোল্যুশন স্কিল ও লিডারশিপ স্কিল খুবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক পদে ভারতীয়দের বেশি দেখা যায়। কারণ, তারা কমিউনিকেশন ও নেটওয়ার্কিং স্কিলে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কম থাকার কারণ হিসেবে অধ্যাপক মোহাম্মদ সওকত-উল আলম বলেন, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাবেট (ABET) অ্যাক্রিডিটেশন নেই। অ্যাবেট হলো প্রতিটি একাডেমিক প্রোগ্রামের একটি কার্যকরী মূল্যায়নপ্রক্রিয়া। এই স্বীকৃতি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রোগ্রামে থাকলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসতে সাধারণত জিআরই (GRE) স্কোর লাগে এবং তাঁরা সহজে আসতে পারেন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাবেট অ্যাক্রিডিটেশনের জন্য জোরালোভাবে কাজ করা উচিত। তাহলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা সহজ হবে। এ ছাড়া আর্থিক সীমাবদ্ধতার জন্য ভারতের মতো বাংলাদেশেও যদি ব্যাংকগুলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা লোন দেওয়া শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে আসা সহজ হবে।