
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের একটি ব্যাচের স্নাতক সপ্তম সেমিস্টারের একটি কোর্সের পরীক্ষার ফলাফলে অসংগতির অভিযোগ করেছেন চার শিক্ষার্থী। অপরাধবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন জিয়া রহমানের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ পাওয়ার পর তা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট। অবশ্য এ ঘটনাকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা রাজনীতির প্রতিফলন’ বলছেন অধ্যাপক জিয়া রহমান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সিন্ডিকেটের এক সভায় এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামালকে প্রধান করে গঠিত চার সদস্যের এ তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন সীমা জামান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরী।
তদন্ত কমিটির প্রধান এ এস এম মাকসুদ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চার সদস্যের এ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সিন্ডিকেট। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে ২৫ মে উপাচার্য বরাবর এক লিখিত আবেদনে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুজায়েত উল্লাহ ভূঁইয়া, তাহনান মাহজেবীন অধরা, মেহবীজ বিনতে মতিউর ও সাকিন তানভীর বলেন, গত বছরের ২১ ডিসেম্বর তাঁদের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের সপ্তম সেমিস্টারের ৪১১ নম্বর কোর্সের (স্থানীয় ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ) ফল প্রকাশিত হয়। ওই কোর্সে তাঁরা জিপিএ ৪-এর মধ্যে ২ দশমিক ৭৫ পান, যা তাঁদের অন্যান্য কোর্সে পাওয়া জিপিএর চেয়ে কম। এ ফলাফলের পুনর্মূল্যায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে বিভাগের তৎকালীন চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমানের সঙ্গে কথা বললে তিনি তাঁদের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তাঁদের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামাল ও উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
আবেদনে ওই শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পরামর্শ অনুযায়ী গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের (শিক্ষা) সঙ্গে দেখা করে তাঁদের ফলাফলের অসংগতির বিষয়ে লিখিত আবেদন করেন তাঁরা। সেখানে বলা হয়, সেমিস্টারের সেশনাল নম্বর (মিডটার্ম, অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থিতি প্রভৃতি মিলিয়ে ৫০ নম্বর) চূড়ান্ত পরীক্ষার আগেই প্রকাশ করার নিয়ম থাকলেও অধ্যাপক জিয়া রহমান কখনোই সেশনাল নম্বর প্রকাশ করেননি। এমনকি তিনি মিডটার্ম পরীক্ষা নিয়েছেন চূড়ান্ত পরীক্ষার পরে। ওই আবেদনের মাসখানেক পর ১৯ জানুয়ারি ব্যাচের শ্রেণি প্রতিনিধির মাধ্যমে তাঁদের মিডটার্মের নম্বর জানান অধ্যাপক জিয়া। সেখানে দেখা যায়, তাঁরা চারজনই মিডটার্মে ২০ নম্বরের মধ্যে ২ নম্বর করে পেয়েছেন এবং সেশনাল ৫০ নম্বরের মধ্যে একজন ২৫ ও বাকি তিনজন ২২ নম্বর করে পেয়েছেন। এর কয়েক দিন পর বিভাগ থেকে এ বিষয়ে একটি যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়। এ কমিটি শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করেছে এবং একজনকে বহিষ্কারের হুমকিও দিয়েছে।
৭ জুন অপরাধবিজ্ঞানের ওই চার শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শামসুদ্দিন বাবুল হাইকোর্টে একটি রিট করেন। ১২ জুন দুপুরে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। দুই মাসের মধ্যে এ তদন্তের কাজ নিষ্পত্তি করা এবং প্রভিশনাল (সাময়িক) মূল সার্টিফিকেট দেওয়া স্থগিত রাখতেও বলেন আদালত। পুনরায় ফল প্রকাশিত হলে নতুনভাবে সনদ কার্যক্রম শুরু করতে বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়কে। তবে হাইকোর্টের এ নির্দেশনার কপি এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেনি বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
তদন্ত কমিটি গঠনসহ পুরো বিষয়টিতে ষড়যন্ত্র দেখছেন অধ্যাপক জিয়া রহমান। অভিযোগগুলোর সত্যতা নেই বলেও দাবি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগপন্থী এই শিক্ষক নেতার। তিনি গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা রাজনীতির একটি প্রতিফলন। ২০ নম্বরের একটি মিডটার্ম পরীক্ষায় ২০-২১ জনের মতো শিক্ষার্থী কপি-পেস্ট করেছে। সে জন্য তারা নম্বর কম পেয়েছে। এর মধ্যে চারজন অভিযোগ করছে। কিন্তু তাদের কেউ আমার কাছে এক দিনের জন্যও আসেনি।’