
শিক্ষা খাতে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বর্তমান শিক্ষার মান দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করাই কঠিন, আন্তর্জাতিক মানের তো ধারেকাছেও নেই। প্রয়োজনীয় অগ্রগতির জন্য যে পরিমাণ বাজেট দরকার, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনো সবচেয়ে কমগুলোর একটি। তবে ইতিবাচক দিক হলো, নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের অঙ্গীকার করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সব স্তরে সামগ্রিকভাবে সংস্কারের মাধ্যমে মানোন্নয়নের জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে অন্তত জিডিপির আড়াই শতাংশ, তিন বছরের মধ্যে ৫ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ৬ শতাংশে বরাদ্দ উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি শিক্ষা খাতের বাজেটকে কেবল ব্যয় বরাদ্দ হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
আজ বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গণসাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত ‘শিক্ষার বাজেট: বাজেটের শিক্ষা’ শীর্ষক প্রাক্-বাজেট আলোচনা সভায় বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। সভায় গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে শিক্ষা খাতে বর্তমান বাজেট পরিস্থিতি তুলে ধরা হয় এবং বরাদ্দ বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়।
শিক্ষা খাতে বাজেটের প্রসঙ্গ টেনে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষা অগ্রাধিকারে ছিল না। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতের বাজেটকে কেবল বরাদ্দ হিসেবে দেখা যাবে না, বিনিয়োগ হিসেবে দেখবে হবে।
আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) বলেন, ‘আগামী বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—এগুলো প্রাধান্য পাবে। আবারও বলি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।’
‘আগামী বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—এগুলো প্রাধান্য পাবে। আবারও বলি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।’জোনায়েদ সাকি, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
বাংলাদেশের শিক্ষার মান পিছিয়ে থাকার কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সবাই স্বীকার করেন...এটা দিয়ে বাংলাদেশের চাহিদাই পূরণ করা যাবে না। আন্তর্জাতিক মানের তো ধারেকাছেও নেই।
প্রাথমিক শিক্ষাকে ধাপে ধাপে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হবে বলে জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, ৪ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা করতে চান। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রাথমিক গ্রেড বাড়িয়ে অষ্টম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই।...এটা করব ধাপে ধাপে।’
বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং তা অবৈতনিক।
প্রাথমিকের শিক্ষাক্রমের ওপর বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দুই আঙ্গিকে কারিকুলামকে (শিক্ষাক্রম) সাজাব। একটি হচ্ছে খেলতে খেলতে শেখা। আরেকটি হলো গল্প বলার মাধ্যমে শেখা।’ কোচিং ও গাইড বই নিয়ন্ত্রণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাবিষয়ক পরামর্শক কমিটির প্রধান অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, সামগ্রিক শিক্ষা খাত নিয়ে পরিকল্পনা করা দরকার। শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষকদের বেতন না বাড়ালেই নয়।
শিক্ষা খাতে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের শিক্ষা উপদেষ্টা মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া।
‘আমরা দুই আঙ্গিকে কারিকুলামকে সাজাব। একটি হচ্ছে খেলতে খেলতে শেখা। আরেকটি হলো গল্প বলার মাধ্যমে শেখা।’ববি হাজ্জাজ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী
২১ ধরনের দাবি—
অনুষ্ঠানে শিক্ষা খাতের বাজেটসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া স্মারকলিপিতে থাকা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোসহ নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন গণসাক্ষরতা অভিযানের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আবদুর রউফ। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতের জন্য ‘এডুকেশন সেস (সারচার্জ) ’ চালু করা, উপবৃত্তি বাড়িয়ে প্রাথমিক শিক্ষার্থীপ্রতি মাসে ন্যূনতম ৫০০ টাকা, নিম্নমাধ্যমিকে (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) মাসে ৭০০ টাকা এবং মাধ্যমিক ও তার ওপরের শ্রেণিতে তা মাসে ১ হাজার টাকা করার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ, নোট বই, গাইড বই, কোচিং–বাণিজ্যসহ সব ধরনের অশুভ তৎপরতা মোকাবিলা ও বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির জন্য যথাযথ বিনিয়োগ করা, কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়াসহ ২১ ধরনের দাবি জানানো হয়।