জিনিয়া তাসনিমের সুইডেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গেল তাঁর দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। সুইডেন থেকে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সেবা দেয় অর্থের বিনিময়ে। সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবার এ জন্য অর্থ খরচ করবে না। ফলে জিনিয়া তাসনিমের আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হয়।
জিনিয়া তাসনিমের স্বপ্নভঙ্গের এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনাই হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নই ভেঙে দিচ্ছে না, বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে।
প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় করে সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করলেও পুরো প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ক্ষুব্ধ এখন জিনিয়া তাসনিম।
জিনিয়া তাসনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সুইডেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভেরিফিকেশন ফি’ তাঁর বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথে কাঁটা হয়ে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুন্সী শামস উদ্দিন আহমেদ বলছেন, ভেরিফিকেশন ফি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ক্ষেত্রে ভুল কিছু করেনি। তবে ঘটনাটি জানার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেছেন, ফি নেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখবেন তাঁরা।
জিনিয়া তাসনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। একাডেমিক ঘাটতি না থাকলেও ঢাবির প্রশাসনিক জটিলতা, নথিপত্র তুলতে দেরি এবং হঠাৎ ‘ভেরিফিকেশন ফি’ চাওয়া তাঁর বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথে কাঁটা হয়ে এসেছে বলে জানান তিনি।
জিনিয়া তাসনিম আজ শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ২০২০ সালের পর থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করা শুরু করেন। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করলেও ভিসা জটিলতার কারণে পরে ইউরোপে, বিশেষ করে সুইডেনে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি সুইডেনের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি বিষয়ে আবেদন করেন এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর সাক্ষাৎকারও দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার অভিযোগও তোলেন জিনিয়া তাসনিম। তিনি বলেন, জরুরি ফি দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে ট্রান্সক্রিপ্ট পাননি। কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে।
জিনিয়া তাসনিম বলেন, ‘কিন্তু ফল প্রকাশের আগের দিন পোর্টালে গিয়ে দেখি, আমাকে সবগুলো বিষয়ে আনকোয়ালিফায়েড (অযোগ্য) দেখানো হয়েছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, আমার ব্যাচেলর ডিগ্রিতে ন্যূনতম ক্রেডিট ১৮০ ইসিটিএস নেই। অথচ আমার সিলেবাসের হিসাব অনুযায়ী ইসিটিএস ছিল ২৪০, যা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। বিষয়টি জানিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ই–মেইল করি, কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি।’
উল্লেখযোগ্য অর্থ খরচ হওয়ার পরও শুধু এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রক্রিয়ার কারণে আমি সুযোগ হারিয়েছি।জিনিয়া তাসনিম, শিক্ষার্থী
জিনিয়া তাসনিম আরও বলেন, ‘পরবর্তীতে ফল প্রকাশের দিন বিকেলে একটি ই–মেইল পাই। যেখানে জানানো হয়, আমার জমা দেওয়া ডকুমেন্ট যাচাই করতে তারা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ই–মেইল করেছিল, কিন্তু সেই ই–মেইলের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেরিফিকেশনের জন্য টাকা চাওয়া হয়েছে। ফলে ভেরিফিকেশন না হওয়ায় আমার আবেদন বাতিল হয়ে যায়।’
জিনিয়া বলেন, ‘আমি পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার টাকা আবেদন ফি, ৪-৫ হাজার টাকা কাগজপত্র কুরিয়ারের মাধ্যামে পাঠানোর খরচ এবং ট্রান্সক্রিপ্ট ও অন্যান্য কাজে আরও কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করেছি। উল্লেখযোগ্য অর্থ খরচ হওয়ার পরও শুধু এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রক্রিয়ার কারণে আমি সুযোগ হারিয়েছি।’
জিনিয়ার এই ঘটনা জানার পর বিদেশি পড়াশোনা করে আসা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করছেন। তাঁরা উদাহরণ দিয়ে বলছেন, ক্রেডেনশিয়াল যাচাইয়ের জন্য বিদেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ফি নেয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যখন বিদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারও সনদ যাচাইয়ের সুপারিশ আসে, তখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী তা পরিশোধ করে দেন। তবে জিনিয়া বলেন, বিষয়টি তিনি জানতেন না এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জানায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার অভিযোগও তোলেন জিনিয়া তাসনিম। রেজিস্ট্রার বিল্ডিং বা প্রশাসনিক ভবনে ভোগান্তি পোহানোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ট্রান্সক্রিপ্ট সংগ্রহের সময় রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে আমাকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। জরুরি ফি দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে ট্রান্সক্রিপ্ট পাইনি। আমাকে নিজেই কাগজপত্র খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হয়েছি। একাধিকবার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গিয়েও কাজ সম্পন্ন করতে পারিনি।’
জিনিয়ার অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুন্সী শামস উদ্দিন আহমেদ আজ শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভেরিফিকেশন ফি এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী নেওয়া হয়। আমাদের ওয়েবসাইটে ভেরিফিকেশন ফি, ট্রান্সক্রিপ্ট ফি—সবকিছুই উল্লেখ আছে। শিক্ষার্থীরাও সাধারণত বিষয়টি সম্পর্কে জানে।’
জিনিয়ার বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন জানিয়ে মুন্সী শামস উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আগামীকাল অফিসে এসে দেখতে পারব যে আমাদের কাছে চিঠিটা কীভাবে দেওয়া হয়েছে সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।’
আমরা দেখব এসব ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে আছে কি না এবং সেগুলোর ক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিকীকরণের সুযোগ রয়েছে কি না।সায়মা হক বিদিশা, সহ-উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা প্রথম আলোকে জানান, বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। তিনি রেজিস্ট্রারকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছেন। তবে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিতভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘আগামীকাল কর্মদিবসে রেজিস্ট্রারের সঙ্গে বসে পুরো বিষয়টির ব্যাকগ্রাউন্ড, সংশ্লিষ্ট ফি ও ই–মেইলের প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। আমরা দেখব, এসব ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে আছে কি না এবং সেগুলোর ক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিকীকরণের সুযোগ রয়েছে কি না,’ বলেন সায়মা হক বিদিশা।