কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা

যেনতেনভাবে চলা ২৪৬ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বন্ধ, তালিকায় আরও ১১২

যেনতেনভাবে চলা দেশের ২৪৬টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করেছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। এর মধ্যে ১৩৭টি ডিপ্লোমা পর্যায়ের এবং ১০৯টি এইচএসসি (বিএমটি—বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া আরও ১১২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করাসহ এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে টানা তিন বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়নি। সবগুলোই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষ করে ডিপ্লোমা পর্যায়ের ১৩৭টি এবং এইচএসসি (বিএমটি) পর্যায়ের ১০৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের আরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এর আগে একই ধরনের অভিযোগে ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা ৬২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না বা শিক্ষা কার্যক্রম নেই। এর মধ্যে ৪৪৩টি প্রতিষ্ঠানে এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ১৭৮ টিতে দাখিল (ভোকেশনাল) পাঠদানের অনুমোদন রয়েছে।

এ বিষয়ে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আজ বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব অনেক প্রতিষ্ঠান দিয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান জবাব দেয়নি। এখন এগুলোর তালিকা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদন বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী, ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া দেশের ৩ হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১ টিতে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি।

তালিকায় আরও ১১২ প্রতিষ্ঠান—

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ডিপ্লোমা পর্যায়ের ৮৬টি এবং এইচএসসি (বিএমটি) পর্যায়ের ২৬টি প্রতিষ্ঠানে ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কেন এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ১ অক্টোবরের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এসব প্রতিষ্ঠানেও টানা তিন বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়নি।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদনের শর্তে বলা আছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে পরপর তিন বছর শিক্ষার্থী ভর্তি না হলে তার পাঠদানের অনুমোদন বাতিল করা হবে। এ ছাড়া ডিপ্লোমা পর্যায়ের বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, পাঠদান ও স্বীকৃতি দেওয়া-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফলাফল, অবকাঠামো, শিক্ষক-কর্মচারী, নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা কমিটি, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, লাইব্রেরিসহ পাঠদানের অনুমোদনের সময় আরোপিত অন্যান্য শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সরকারের অনুমোদন নিয়ে বোর্ড পাঠদানের অনুমতি বাতিল করতে পারে।

কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া ডিপ্লোমা পর্যায়ের ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের একটি রংপুর সদরের মহাদেবপুর এলাকার বিসিই মোড়ের মেট্রোপলিটন প্রাইভেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে পরিচালক নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তিন শিক্ষাবর্ষ ধরে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। তবে এর আগে ভর্তি হওয়া কিছু শিক্ষার্থী এখনো রয়েছে। তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এখনো তাঁরা কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ পাননি।

বর্তমানে দেশে এইচএসসি (বিএমটি) পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ টি। আর ডিপ্লোমা পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া হয় এমন প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৬০০ টি।

কারিগরিতে আসন অনেক, শিক্ষার্থী কম

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশে মোট ১২ হাজার ৯৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হয়। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বর্তমানে চার বছর মেয়াদি ১০ ধরনের ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ৩২টি ট্রেডে এ কোর্স পরিচালিত হলেও সব প্রতিষ্ঠানে সব ট্রেড নেই। দেশে বর্তমানে ৫৬টি সরকারি ও ৬১২টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এসব কোর্স পরিচালিত হয়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকে। বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে আসন রয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তি হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪ জন। অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ভোকেশনাল শিক্ষা চালু থাকলেও সেখানেও আসন পূরণ হচ্ছে না।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় মোট আসন ১৯ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তি হয়েছে প্রায় পৌনে ১০ লাখ শিক্ষার্থী।

পরিকল্পনাহীন অনুমোদনের অভিযোগ—

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, পরিকল্পনা ছাড়া বিপুলসংখ্যক বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে একদিকে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহ হারাচ্ছে। তাঁরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলা হলেও মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ কম। শিক্ষার্থীর চাহিদা, কর্মবাজার ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনা করে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম নেই, সেগুলোর বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।