
গণিতকে অনেকেই সংখ্যার শুষ্ক খেলা মনে করেন। কিন্তু ইরানের এক অদম্য নারীর কাছে গণিত ছিল এক গভীর অরণ্য, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হারিয়ে গেলেও তাঁর ক্লান্তি আসত না। তিনি মেঝেতে বিশাল কাগজ বিছিয়ে জটিল সব চিত্র আঁকতেন। তাঁর ছোট্ট মেয়ে মজা করে বলত, ‘মা আবার পেইন্টিং করছে!’এই ‘চিত্রশিল্পী’ আর কেউ নন। তিনি গণিতের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল জয়ী ইতিহাসের প্রথম নারী-মরিয়ম মির্জাখানি।
২০১৪ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে (International Congress of Mathematicians) তাঁর নাম ফিল্ডস মেডেল বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই মুহূর্তে গণিতের ইতিহাসে রচিত হয় এক নতুন অধ্যায়। আজ আমরা জানব, কোন যুগান্তকারী গবেষণার জন্য মরিয়ম মির্জাখানি এই অনন্য সম্মান অর্জন করেছিলেন।
মরিয়ম মির্জাখানির গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল তাত্ত্বিক গণিত। তিনি বিশেষভাবে রিমান সারফেস (Riemann Surfaces), হাইপারবোলিক জ্যামিতি (Hyperbolic Geometry) এবং মডুলাই স্পেস (Moduli Spaces) নিয়ে কাজ করেছেন।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আমরা কাগজ বা মেঝের মতো সমতল পৃষ্ঠের জ্যামিতির সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু কোনো পৃষ্ঠ যদি ডোনাটের মতো ছিদ্রযুক্ত কিংবা আরও জটিল আকৃতির হয়, তাহলে সেখানে বিশেষ ধরনের জ্যামিতিক কাঠামো তৈরি করা যায়, যাকে হাইপারবোলিক জ্যামিতি বলা হয়। এমন জটিল রিমান সারফেসের জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই ছিল মির্জাখানির গবেষণার বড় অংশ।
আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়ন (International Mathematical Union-IMU) তাঁর কয়েকটি যুগান্তকারী অবদানের জন্য তাঁকে ফিল্ডস মেডেল প্রদান করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. জিওডেসিক বা ক্ষুদ্রতম পথের রহস্য
বাঁকানো কোনো পৃষ্ঠে দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে ছোট পথকে বলা হয় জিওডেসিক (Geodesic)। মির্জাখানি দেখান, একটি হাইপারবোলিক পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের চেয়ে ছোট এবং নিজেদের কখনো ছেদ করে না—এমন সরল বদ্ধ জিওডেসিক (Simple Closed Geodesics)-এর সংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি পায়। তাঁর এই ফলাফল জ্যামিতির একটি দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
২. মডুলাই স্পেসের আয়তন নির্ণয়
একটি নির্দিষ্ট ধরনের রিমান সারফেস কতভাবে নিজের আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে, সেই সম্ভাব্য সব রূপের সমষ্টিকে বলা হয় মডুলাই স্পেস। এটি এক ধরনের বিমূর্ত গাণিতিক জগৎ। মির্জাখানি এই স্পেসের Weil–Petersson volume নির্ণয়ের জন্য সম্পূর্ণ নতুন গাণিতিক কৌশল উদ্ভাবন করেন। তাঁর এই কাজ আধুনিক জ্যামিতিতে একটি যুগান্তকারী অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩. উইটেনের অনুমানের নতুন জ্যামিতিক প্রমাণ
বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেন (Edward Witten) স্ট্রিং তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক অনুমান (Witten's Conjecture) করেছিলেন। মির্জাখানি তাঁর আবিষ্কৃত কৌশল ব্যবহার করে মডুলাই স্পেসের আয়তনের পুনরাবৃত্তিমূলক (recursive) সূত্র বের করেন। এই ফলাফল থেকে উইটেনের বিখ্যাত অনুমানের একটি নতুন ও চমৎকার জ্যামিতিক প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর এই কাজ জ্যামিতি, টপোলজি ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে গভীর সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে।
মরিয়মের গণিতচর্চার পদ্ধতি ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। তিনি টেবিলে বসে ছোট কাগজে হিসাব করার চেয়ে মেঝেতে বড় বড় সাদা কাগজ বিছিয়ে ছবি আঁকতেন, রেখা টানতেন, গ্রাফ তৈরি করতেন এবং ধাপে ধাপে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘গণিত করার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এটা যেন একটি গভীর বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে নতুন কোনো পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা।’
ফিল্ডস মেডেল পাওয়ার মাত্র তিন বছর পর, ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই মাত্র ৪০ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এই মহান গণিতবিদ মৃত্যুবরণ করেন।
তবে মরিয়ম মির্জাখানি প্রমাণ করে গেছেন, মেধা, কৌতূহল ও অধ্যবসায়ের সামনে লিঙ্গ বা ভৌগোলিক সীমানা কোনো বাধা নয়। গণিতের জগতে নারীদের জন্য তিনি যে পথ তৈরি করে গেছেন, তা আজও বিশ্বের অসংখ্য শিক্ষার্থী ও গবেষককে অনুপ্রাণিত করছে।তাঁর জন্মদিন ১২ মে-কে স্মরণ করে ২০১৯ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নারী গণিত দিবস (International Women in Mathematics Day) পালিত হয়।
মরিয়ম মির্জাখানি আমাদের শিখিয়েছেন, গণিত কেবল কঠিন সমীকরণের সমষ্টি নয়; এটি মনের ক্যানভাসে আঁকা এক অনন্ত শিল্প, যেখানে প্রতিটি নতুন আবিষ্কার এক একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করে।