আঠারো শতকের কথা। প্রুশিয়ার কোনিগসবার্গ শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে প্রেগেল নামের একটা নদী। এই নদী শহরটিকে ভাগ করে দিয়েছে চারটা অংশে। নদীর দুই পাশে দুইটা বড় স্থলভাগ, মাঝখানে একটা দ্বীপ, আর নদীর দুই শাখার মধ্যে আটকে পড়া আরেকটা অংশ। এ চারটা অংশকে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে মোট সাতটি সেতু।
কল্পনা করে নাও, চারটা জায়গাকে A, B, C, D নাম দিলাম। A আর B হলো নদীর দুই পাড়, C হলো মাঝের দ্বীপ, আর D মাঝের সেই আটকে পড়া অংশ। এই চারটার মধ্যে সেতুগুলো এভাবে সাজানো ছিল: A থেকে C–তে দুটি সেতু, B থেকে C-তে দুটি সেতু, A থেকে D-তে একটি সেতু, B থেকে D-তে একটি সেতু, আর C থেকে D-তে একটি সেতু। মোট সাতটি।
শহরের মানুষের মধ্যে তখন একটা মজার প্রশ্ন খুব জনপ্রিয় ছিল। প্রশ্নটা হলো: শহরের যেকোনো একটি জায়গা থেকে হাঁটা শুরু করে প্রতিটি সেতু ঠিক একবার করেই পার হয়ে (কোনো সেতু বাদ না দিয়ে, আবার কোনোটা দুবার পার না হয়ে) আবার হাঁটতে হাঁটতে সেই একই জায়গায় ফিরে আসা যায় কি না।
শোনা যায়, শহরবাসীরা হাঁটতে বেরিয়ে এই পথ খোঁজার চেষ্টা করতেন। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সেতুতে গিয়ে আটকে যেতেন। হয় কোনো একটি সেতু বাদ পড়ে যেত, না হয় কোনো একটা সেতু দুবার পার হতে হতো। কেউ সফল হননি। কিন্তু এমন পথ যে আদৌ সম্ভব নয়, সেটাও কেউ প্রমাণ করতে পারেননি। হয়তো আরেকটু চেষ্টা করলেই পথটি মিলে যাবে, এই আশাও অনেকে ছাড়েননি।
∎ গণিতবিদ যেভাবে সমস্যাটিকে দেখলেন
১৭৩৬ সালে সুইস গণিতবিদ লিওনার্ড অয়লার এই সমস্যার সমাধান দেন। আর সমাধানের পদ্ধতিটাই ছিল আসল চমক। তিনি বুঝলেন, শহরের রাস্তার আকার, সেতুর দৈর্ঘ্য বা দ্বীপের প্রকৃত অবস্থান—এসব কিছুই আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ শুধু একটি জিনিস—কোন জায়গা কোন জায়গার সঙ্গে কয়টা সেতু দিয়ে যুক্ত।
অয়লার প্রতিটি স্থলভাগকে (A, B, C, D) একটা করে বিন্দু দিয়ে বদলে ফেললেন, আর প্রতিটি সেতুকে একটি করে রেখা দিয়ে। পুরো শহরটাই হয়ে গেল চারটি বিন্দু আর তাদের মধ্যে সাতটি রেখার একটা সহজ ছবি। এই ছোট্ট কাজই ছিল গ্রাফ থিওরি নামের গণিতের একটি সম্পূর্ণ নতুন শাখার সূচনা।
∎ আসল কৌশলটা কী ছিল
অয়লার প্রশ্নটিকে অন্যভাবে দেখলেন। ধরো, তুমি হাঁটতে হাঁটতে কোনো একটি স্থলভাগে (ধরো A-তে) পৌঁছালে। সেখানে যদি তোমার হাঁটা শেষ না হয়, তোমাকে অন্য একটি সেতু দিয়ে সেখান থেকে বেরও হতে হবে। অর্থাৎ A-তে ঢোকা আর A থেকে বেরোনো—এই দুটি মিলে একজোড়া সেতু খরচ হলো।
যেহেতু আমরা চাই হাঁটাটা শুরুর জায়গাতেই ফিরে শেষ হোক, তাই প্রতিটি স্থলভাগেই এই ‘ঢোকা-বেরোনো’ ঘটনাটি কয়েকবার ঘটবে প্রতিবার দুটি করে সেতু খরচ করে, এমনকি শুরুর জায়গাতেও। সেখান থেকে প্রথমে বের হতে হয় একটি সেতু দিয়ে, আর শেষে ফিরে আসতে হয় আরেকটি সেতু দিয়ে। তার মানে, প্রতিটি স্থলভাগে যুক্ত সেতুর সংখ্যা অবশ্যই জোড় হতে হবে। একটিও বিজোড় হলে চলবে না। কারণ, সেতুগুলো তো খরচ হয় জোড়ায় জোড়ায়—একটি ঢোকার, একটি বেরোনোর। সংখ্যাটা বিজোড় হলে শেষ সেতুটি সঙ্গী পায় না। ওই সেতু দিয়ে তুমি ঢুকবে ঠিকই, কিন্তু বেরোনোর জন্য নতুন কোনো সেতু আর অবশিষ্ট থাকবে না।
এবার কোনিগসবার্গের চারটি জায়গায় সেতুসংখ্যা (গ্রাফের ভাষায় যাকে বলে ওই বিন্দুর ‘মাত্রা’) গুনে দেখা যাক। A-তে সেতু আছে ৩টি, B-তে ৩টি, C-তে ৫টি, D-তে ৩টি। চারটিই বিজোড়! নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটিই জোড় হওয়ার দরকার ছিল, অথচ একটিও জোড় নয়। তাই এমন কোনো পথ নেই, যা প্রতিটি সেতু ঠিক একবার করে পার করে আবার শুরুর জায়গায় ফিরে আসে। শহরবাসীরা যতই চেষ্টা করতেন না কেন, সফল হতে পারতেন না। এখানে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে—ফিরে আসার শর্তটি বাদ দিলে কেমন হয়? যদি যেখানে খুশি শেষ করা যায়, তাহলে অয়লার দেখালেন, বিজোড় সেতুওয়ালা জায়গা থাকতে পারে বড়জোর দুটি—একটি যাত্রা শুরুর জন্য, আরেকটি শেষ করার জন্য। কোনিগসবার্গে বিজোড় জায়গা চারটি। তাই ফিরে আসা তো দূরের কথা, এই সাত সেতু ঠিক একবার করে পার হওয়াই আদৌ সম্ভব নয়।
অয়লার শুধু বললেন না যে এটা অসম্ভব। তিনি অঙ্ক করে প্রমাণ করে দেখালেন কেন অসম্ভব, আর ঠিক কোন শর্ত পূরণ হলে এমন একটি পথ সম্ভব হতো।
∎ এই আবিষ্কারের প্রভাব
এই সহজ পর্যবেক্ষণ থেকেই জন্ম নিল গ্রাফ থিওরি, যা আজ ইন্টারনেটের নেটওয়ার্ক বোঝা থেকে শুরু করে জিপিএসে সবচেয়ে ছোট রাস্তা খুঁজে বের করা, সামাজিক যোগাযোগের বিশ্লেষণ, এমনকি জিনতত্ত্বেও কাজে লাগে। যে পথ প্রতিটি সংযোগ ঠিক একবার পার করে, তাকে আজ বলা হয় ‘অয়লারীয় পথ’, আর সেই পথ শুরুর জায়গায় ফিরে এলে তাকে বলে ‘অয়লারীয় বর্তনী’—দুটিই অয়লারের নামে।
তাই পরেরবার কোনো ম্যাপ বা রাস্তার জাল দেখলে একটু ভেবো। এর ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর বদলে দিতে পারে গণিতের গোটা একটা অধ্যায়।
সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি