গণিতের জগতে এমন কিছু গল্প আছে, যা শুনলে মনে হয় সিনেমার কাহিনি। এমনই একটা গল্প নিয়ে আজ কথা বলব—একটা ট্যাক্সি নম্বর কীভাবে গণিতের ইতিহাসে অমর হয়ে গেল।
সময়টা ১৯১৯ সালের দিকে। ভারতীয় গণিতবিদ শ্রীনিবাস রামানুজন তখন ইংল্যান্ডে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ জি এইচ হার্ডি তাঁকে দেখতে গেলেন।
হার্ডি সব সময় গাণিতিক চিন্তায় ডুবে থাকতেন, রোগী দেখতে গিয়েও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
হাসপাতালে ঢুকে হার্ডি একটু হতাশার সুরে বললেন, ‘আমি যে ট্যাক্সিতে করে এলাম, তার নম্বরটা ছিল ১৭২৯। সংখ্যাটা বেশ পানসে মনে হলো, কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পেলাম না। আশা করি, এটা কোনো খারাপ লক্ষণ নয়।’
রামানুজন এই কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘না হার্ডি, সংখ্যাটা মোটেও পানসে নয়। এটা আসলে একটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় সংখ্যা। এটাই সবচেয়ে ছোট সংখ্যা, যাকে দুভাবে দুইটা ধনাত্মক ঘনসংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়।’
তখনই রামানুজন বলে দিলেন:
1729 = 1³ + 12³ = 1 + 1728
1729 = 9³ + 10³ = 729 + 1000
অর্থাৎ ১৭২৯-কে দুভাবে দুটি ঘনসংখ্যার যোগফল হিসেবে লেখা যায়—একবার ১ আর ১২-এর ঘনফলের যোগফল হিসেবে, আবার ৯ আর ১০-এর ঘনফলের যোগফল হিসেবে। আর এমন ছোট সংখ্যার মধ্যে ১৭২৯-ই প্রথম, যার এই বিশেষ ধর্ম আছে।
এই বিখ্যাত ঘটনার সূত্র ধরেই এ ধরনের সংখ্যাগুলো ‘ট্যাক্সিক্যাব সংখ্যা’ (Taxicab Number) নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
১৭২৯-কে বলা হয় ‘হার্ডি-রামানুজন সংখ্যা’, আর একে চিহ্নিত করা হয় Ta(2) হিসেবে। অর্থাৎ এটাই সবচেয়ে ছোট সংখ্যা, যাকে দুভাবে দুটি ধনাত্মক ঘনসংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়।
কেন এই গল্পটা এত গুরুত্বপূর্ণ
এই ছোট্ট ঘটনাটা আমাদের অনেক কিছু শেখায়। প্রথমত, এটা দেখায় রামানুজনের গাণিতিক প্রতিভা কতটা অসাধারণ ছিল—তিনি কোনো ক্যালকুলেটর বা কাগজ-কলম ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে এই সম্পর্ক বলে দিতে পেরেছিলেন। সংখ্যার প্রতি তাঁর এই গভীর অনুভূতি ও সহজাত বোঝাপড়া তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ বানিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এই গল্প আমাদের শেখায় যে গণিতে ‘সাধারণ’ বলে কিছু নেই। প্রতিটা সংখ্যার নিজস্ব একটা গল্প, একটা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে—শুধু সেটা খুঁজে বের করার চোখ থাকা দরকার। যেই সংখ্যাটাকে হার্ডি ‘পানসে’ মনে করেছিলেন, সেটাই আজ গণিতের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত সংখ্যাগুলোর একটি।
তোমরাও চেষ্টা করে দেখতে পারো
এ ধরনের আরও সংখ্যা খুঁজে বের করা একটা মজার চ্যালেঞ্জ হতে পারে। যেমন, পরবর্তী ট্যাক্সিক্যাব সংখ্যা Ta(3) হলো ৮৭,৫৩৯,৩১৯—যাকে তিনটি ভিন্ন উপায়ে দুটি ঘনসংখ্যার যোগফল হিসেবে লেখা যায়! তোমরা চাইলে ছোট পরিসরে (২০০০ পর্যন্ত সংখ্যা নিয়ে) নিজেরাই খুঁজে দেখতে পারো, আর কোনো সংখ্যা আছে কি না, যাকে দুভাবে দুটি ঘনসংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়।
রামানুজনের এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণিত শুধু সূত্র
মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটা সংখ্যার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার একটা যাত্রা। আর সেই বন্ধুত্ব যত গভীর হয়, সংখ্যারা তত বেশি নিজেদের গোপন সৌন্দর্য মেলে ধরে।
১৭২৯ কি সত্যিই প্রথম
১ থেকে ১২ পর্যন্ত যেকোনো দুটি ভিন্ন ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা বেছে নিয়ে তাদের ঘনের যোগফল বিবেচনা করো। সব যোগফল আলাদা আলাদা হিসাব না করেও এমন একটি কৌশল বের করো, যাতে যাচাই করা যায়—১৭২৯-এর চেয়ে ছোট কোনো সংখ্যা কি ভিন্ন দুভাবে দুটি ধনাত্মক ঘনের যোগফল হিসেবে পাওয়া যায়?