গণিত ভাইয়ার কাছে চিঠি
গণিত ভাইয়ার কাছে চিঠি

মাছি থেকে গণিতের বিপ্লব: রেনে দেকার্তে ও কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক জ্যামিতি

অনেক সময় কোনো কাজ করার সময় কানের কাছে এসে বিরক্তিকর শব্দ করতে থাকে মাছি। সেই সময় মনে প্রশ্ন জাগে, ‘এই মাছি কোনো কাজে আসে?’ মাছিকে আমরা কত গালিই না দিই! তোমরা কি জানো, প্রচলিত গল্প অনুযায়ী এমনই এক বিরক্তিকর মাছি থেকে গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার ধারণা এসেছিল? হ্যাঁ, এমন এক মাছি দেখেই রেনে দেকার্তের মাথায় আসে ‘স্থানাঙ্ক জ্যামিতি’র ধারণা।
প্রচলিত একটি গল্প আছে—কোনো এক সকালে অসুস্থ রেনে দেকার্তে বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। শুয়ে শুয়ে তিনি ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি সিলিংয়ে একটি মাছি দেখতে পান। মাছিটি দেখে দেকার্তের মনে একটি প্রশ্ন জাগে—‘সিলিংয়ের ঠিক কোন স্থানে মাছিটি অবস্থান করছে, তা কীভাবে অন্য কাউকে নির্দিষ্টভাবে বোঝানো সম্ভব?’

বিছানায় শুয়ে শুয়েই দেকার্তে মাছিটির প্রতিটি মুভমেন্ট বা নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। তিনি খেয়াল করলেন, ঘরটির সিলিং একটি সমতল ক্ষেত্র। সিলিংটির একটি নির্দিষ্ট কোণকে মূলবিন্দু হিসেবে ধরে নিয়ে সেখান থেকে দুটি পরস্পর লম্ব দেয়াল বা রেখা বরাবর দূরত্ব মেপে মাছিটির অবস্থান নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব।

দেকার্তে ভাবলেন, একটি দেয়াল থেকে মাছিটির দূরত্ব এবং পাশের দেয়াল থেকে তার দূরত্ব যদি হিসাব করা যায়, তবে মাত্র এক জোড়া সংখ্যার ​​​(​​x, y​)​​​​ সাহায্যে মাছিটির অবস্থান একেবারে সুনির্দিষ্ট করে প্রকাশ করা যাবে। এই সংখ্যাজোড়াকেই পরবর্তী সময় আমরা বলি স্থানাঙ্ক।

এই চিন্তার সূত্র ধরেই জন্ম নেয় গণিতের অন্যতম প্রভাবশালী শাখা ‘কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক জ্যামিতি’। ফরাসি দার্শনিক ও গণিতবিদ রেনে দেকার্তের নামানুসারেই এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয় ‘কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা’।

∎ দুই জগতের এক মিলনসূত্র: দেকার্তে ও আধুনিক গণিতের সূচনা

দেকার্তের এই একটি ছোট চিন্তাভাবনা গণিত ও বিজ্ঞানের জগৎকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। এর আগে গণিতের দুটি প্রধান শাখা—বীজগণিত ও জ্যামিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জগৎ।

জ্যামিতির মূল আলোচ্য বিষয় ছিল বিভিন্ন আকৃতি, ত্রিভুজ, বৃত্ত ও স্থান নিয়ে।

বীজগণিতের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল সংখ্যা, সমীকরণ ও অজানা রাশির হিসাব নিয়ে। দেকার্তে এই দুটি ভিন্ন জগৎকে একসূত্রে বেঁধে দিলেন। তিনি দেখালেন, জ্যামিতিক যেকোনো বিন্দুকে এক জোড়া সংখ্যা দিয়ে এবং যেকোনো জ্যামিতিক রেখা বা বক্ররেখাকে বীজগণিতীয় সমীকরণ (​x​ ও ​y​-এর সম্পর্ক) দিয়ে প্রকাশ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি সরলরেখা কেবল একটি আঁকা দাগ নয়; বরং তা ​y = mx + c​ রূপের একটি বীজগণিতীয় সমীকরণ।

∎ স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার মৌলিক ধারণা

দেকার্তের আবিষ্কৃত এই ব্যবস্থার প্রধান উপাদানগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

মূলবিন্দু (Origin): দুটি পরস্পর লম্বরেখা যে বিন্দুতে ছেদ করে, তাকে মূলবিন্দু বলা হয়। একে সাধারণত ​​O​(​​0,0​)​​​​ দিয়ে নির্দেশ করা হয়।

অক্ষরেখা (Axis):

​X​-অক্ষ (Horizontal Axis): অনুভূমিক রেখা, যা ডানে ধনাত্মক এবং বাঁয়ে ঋণাত্মক।

​Y​-অক্ষ (Vertical Axis): উল্লম্ব রেখা, যা ওপরে ধনাত্মক এবং নিচে ঋণাত্মক।

ভুজ ও কোটি (Abscissa and Ordinate):

ভুজ (​x​): ​Y​-অক্ষ থেকে বিন্দুর চিহ্নসহ দূরত্ব (ডানে হলে ধনাত্মক, বাঁয়ে হলে ঋণাত্মক)।

কোটি (​y​): ​X​-অক্ষ থেকে বিন্দুর চিহ্নসহ দূরত্ব (ওপরে হলে ধনাত্মক, নিচে হলে ঋণাত্মক)।

চতুর্ভাগ (Quadrants): দুটি অক্ষ সমতলকে চারটি ভাগে ভাগ করে—প্রথম ​​​(​​+, + ​)​​​​, দ্বিতীয় ​​​(​​–, + ​)​​​​, তৃতীয় ​​​(​​–, – ​)​​​​ এবং চতুর্থ ​​​(​​+, – ​)​​​​ চতুর্ভাগ।

∎ স্থানাঙ্ক জ্যামিতির বিকাশ

ফরাসি দার্শনিক ও বিজ্ঞানী রেনে দেকার্তে ১৫৯৬ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিছানায় বিশ্রাম নিয়ে প্রচুর সময় কাটাতেন, যা তাঁকে গভীর চিন্তার সুযোগ দিত।

১৬৩৭ সালে দেকার্তে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Discours de la méthode-এর পরিশিষ্ট হিসেবে La Géométrie প্রকাশ করেন। এখানেই প্রথম বীজগণিত ও জ্যামিতির মেলবন্ধন অর্থাৎ স্থানাঙ্ক জ্যামিতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

∎ একটি মাছির ঐতিহাসিক অবদান

আজ আমরা যেসব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করি—আমাদের স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করা থেকে শুরু করে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো—সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে দেকার্তের সেই স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা। স্মার্টফোনের স্ক্রিনের প্রতিটি পিক্সেলের একটি নির্দিষ্ট ​​​(​​x, y​)​​​​ স্থানাঙ্ক রয়েছে। এমনকি আমরা যখন গুগল ম্যাপে কোনো স্থান খুঁজে বের করি, তখন মূলত অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নামে ​​​(​​x, y​)​​​​-এর মতো এক জোড়া স্থানাঙ্কই ব্যবহার করা হয়।

একটি বিরক্তিকর মাছি সিলিংয়ে ওড়াউড়ি না করলে হয়তো দেকার্তে এই অদ্ভুত সুন্দর আইডিয়াটি পেতেন না কিংবা গণিতবিদদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হতো। গল্পটা সত্যি হোক বা না হোক, বলাই যায়—কানের কাছে বিরক্তিকর ভনভন করা সেই এক মাছিই গণিতের ইতিহাসে সূচনা করেছিল এক নতুন দিগন্তের!

সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি