আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন

আলোচনা ছিল কথাসাহিত্য নিয়ে

বাংলা একাডেমির আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎ​সবে ‘এ সময়ের কথাসাহিত্য’ বিষয়ে বলছেন নবনীতা দেব সেন। পাশে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, সৈয়দ শামসুল হক l ছবি: প্রথম আলো
বাংলা একাডেমির আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎ​সবে ‘এ সময়ের কথাসাহিত্য’ বিষয়ে বলছেন নবনীতা দেব সেন। পাশে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, সৈয়দ শামসুল হক l ছবি: প্রথম আলো

বাংলা একাডেমির ৬০ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে একুশে বইমেলার সঙ্গে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে এ সম্মেলন শুরু হয়। আজ ও আগামীকালও এ সম্মেলন চলবে।
দিনব্যাপী পাঁচটি অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘এ সময়ের কথাসাহিত্য’। প্রথম অধিবেশনে সম্মেলনের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। এ সময় তিনি বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষয়ে সাহিত্যিকদের শব্দের ক্ষমতা প্রয়োগে গুরুত্ব দেন।
এ অধিবেশনে আলোচনায় আরও অংশ নেন সাহিত্যিক দিলীপ সিংহ, জ্যোতি প্রকাশ দত্ত ও নবনীতা দেব সেন। দিলীপ সিংহ বিহারের মানুষ। বিহারের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাষার জন্য লড়াই করে বিজয় পেয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিহারে ‘ধর্মীয় নিষ্ঠায়’ উদ্যাপন করা হয়।
সমসাময়িক সাহিত্য প্রসঙ্গে আশাবাদ প্রকাশ করে জ্যোতি প্রকাশ দত্ত বলেন, আমাদের বর্তমান লেখকেরা রাজনীতি সচেতন, একই সঙ্গে তাঁদের লেখা শিল্পগুণসম্পন্নও। তবে নবনীতা দেব সেন অতটা আশাবাদী নন। তাঁর মতে, সাহিত্যে আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে এখন প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁরাই, যাঁরা ইংরেজিতে লেখেন। অথচ তাঁদের চেয়ে ভালো লেখেন এমন সাহিত্যিকদের লেখা পৌঁছাচ্ছে না কেবল তাঁরা বাংলায় লেখেন বলে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অবশ্য নবনীতার সঙ্গে দ্বিমত করে বলেন, বাঙালি অনেকে আছেন যাঁরা বিদেশে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। তাই বলে তাঁরা বাংলা সাহিত্যকে ধারণ করতে পারবে না, এমনটা নয়। দ্বিতীয় অধিবেশনে সমসাময়িক কথাসাহিত্য নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করার সময় তিনি এ কথা বলেন। মুখে মুখে গল্প বলার যে ঐতিহ্য ছিল বাঙালি সমাজে, তার একটা প্রভাবও তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে দেখতে পান।
তৃতীয় অধিবেশনে সাহিত্যবিষয়ক আলাপচারিতার সূত্রপাত হয় মৌখিক ঐতিহ্যের কথা দিয়েই। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এ সময় বইয়ের মুদ্রণ ও ইন্টারনেট সংস্করণের প্রসঙ্গও টানেন। সৈয়দ শামসুল হক বলেন, সাহিত্যিকের কাজ লিখে যাওয়া। সেটা কোন মাধ্যমে পাঠকের কাছে যাচ্ছে, সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এ আলাপে অংশ নিয়ে বলেন, সাহিত্যিক চান পাঠকের কাছে তাঁর লেখা পৌঁছাক। একটু হলেও সাড়া জাগাক।
আজ সমসাময়িক কবিতা ও আগামীকাল সমসাময়িক নাটক নিয়ে সকাল ১০টা থেকে দিনব্যাপী আলোচনা হবে। এ সম্মেলনে ১২টি দেশের সাহিত্যিকেরা অংশ নিয়েছেন।
চতুর্থ অধিবেশনে নিজেদের ছোটগল্প ও উপন্যাস নিয়ে মঞ্জু ইসলাম ও কাজী আনিস আহমেদ আলাপচারিতায় মাতেন নিয়াজ জামানের সঙ্গে। এ বাঙালি লেখকদ্বয় ইংরেজিতে লেখেন। তাঁরা প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। আলাপচারিতার শেষ দিকে নিয়াজ জামান বাংলা একাডেমির প্রতি আহ্বান জানান একুশে বইমেলাকে বিদেশি প্রকাশকদের জন্য উন্মুক্ত করতে। মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের অনুরোধে সৈয়দ শামসুল হক এর জবাবে বলেন, এ বইমেলা বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করার পক্ষে নন তিনি। এ বইমেলার সঙ্গে আমাদের ইতিহাস ও আবেগ জড়িয়ে আছে। বিদেশি প্রকাশকদের জন্য ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা রয়েছে। সেটিকে বরং আরও সুন্দর ও নিয়মিত করা যেতে পারে।
পঞ্চম অধিবেশনে ছিল বিভিন্ন সাহিত্যিকের নিজেদের রচনা পাঠ। এ পর্বের সভাপতি ছিলেন প্রাবন্ধিক উদয় নারায়ণ সিংহ। অংশগ্রহণ করেন কবি শ্রীজাত, কথাসাহিত্যিক পূরবী বসু, আনোয়ারা সৈয়দ হক, আনিসুল হক, জাকির তালুকদার ও ইমানুল হক।
সম্মেলনের আজকের দিনটি কেবল কবিতার জন্য। সকাল ১০টায় ‘এ সময়ের কবিতা’ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা। এরপর দিনব্যাপী হবে কবিতা পাঠ ও কবিতা নিয়ে আলোচনা। আর আগামীকালের দিনমান আয়োজন ‘সমসাময়িক নাটক’ নিয়ে। এ সম্মেলনে ১২টি দেশের প্রায় ৫০ জন কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাহিত্য সমালোচক অংশগ্রহণ করছেন।