
নাটকের মানুষ আতিকুল হক চৌধুরী চলে গেলেন ১৭ জুন। এই লেখার মাধ্যমে তাঁর প্রতি ‘আনন্দ’-এর শ্রদ্ধাঞ্জলি
তাঁকে প্রথম দেখি বিটিভিতে। এক সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে। সাক্ষাৎকারের বিষয় ছিল ‘তাঁর টিভি নাটক পরিচালনা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান’। এই আরণ্যক ক্যাম্পাসে অনেক পরিযায়ী পাখির কোলাহলে তিনি মুগ্ধ। শব্দ দিয়ে হিমমাখানো মন্দাক্রান্তা ছন্দের হিরন্ময় ক্যাম্পাসের দৃশ্যায়ন করেছিলেন, তাতে আমি মোহগ্রস্ত। তাঁর রচনা ও পরিচালনায় নাটক বাবার কলম কোথায়, মাঝ সমুদ্রের জাহাজ, দূরবীন দিয়ে দেখুন, জলাশয় কতদূর—কখনো কখনো মনে হয়েছে এ যেন দৃশ্যকাব্য। কবিতার মতো নাটকের সংলাপ।
সময়ের ডানায় চড়ে পড়াশোনার জন্য একদিন আমার ঠিকানা হয়ে যায় সেই পরিযায়ী পাখির তিরি তিরি বাতাসের ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই ক্যাম্পাসেই ছিমছাম পরিপাটি এই মানুষকে প্রথম সরাসরি দেখি। তাঁকে দেখলে ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েরা থমকে দাঁড়ায়, ফিসফাস করে কথা বলে। সেই মানুষটিকে দেখি ভাঁজ করে পা ফেলেন, হিসাব করে এদিক-ওদিক তাকান। মানুষটির নাম আতিকুল হক চৌধুরী। নাটক ও নাট্যতত্ত্বে পড়ান। ক্যাম্পাসে তাঁর দেমাগি চলাফেরা আমাকে আরও উসকে দেয়। জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের সহযোদ্ধারা তো জানতই, সতীর্থরাই শুধু না, ক্যাম্পাসের অনেকেই জানে আমার প্রতিজ্ঞা ছিল ভবিষ্যতে টেলিভিশন প্রযোজক হওয়া। এজন্য সহপাঠীরা কত যে বিদ্রূপের তির ছুড়েছে অন্ধ তিরন্দাজের মতো, তা আজ হিসাবের খাতায় মোটেই জমা নেই।
ইউনিভার্সিটি জীবন শেষে একুশে টেলিভিশনে যোগ দিই প্রযোজক হিসাবে। এক ঘোরগ্রস্ত মানুষের সিঁড়ি ডিঙানো। তারপর চড়াই-উতরাই। জীবনের গল্প মোচড় নিতে থাকে সময়ের বাঁকে বাঁকে।
দ্বিতীয় ‘একুশে’তে তাঁর সঙ্গে দেখা। কথা বলা। তত দিনে তিনি বয়সের ভারে দেমাগহীন হয়ে আসা একজন মানুষ। মনে রাখতে পারেন না অনেক কিছুই। তবু হার না মানার চেষ্টা।
একুশে টিভিতে বাংলা তারিখ জানানোর প্রাত্যহিকতা, ফোনো লাইভস্টুডিও কনসার্ট—এ রকম নানা আয়োজন আমার প্রতি তাঁর মুগ্ধতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। এরপর আরও কত বিস্ময়! তারপর দেশ টিভি। ব্যস্ততা দিন-রাত। দিন যায় রাত গড়ায়। সময়ের ব্যবধানে বেশ কিছুদিন দেখা নেই। হঠাৎ একদিন পত্রিকায় সংবাদ—অসুস্থ তিনি। তাঁকে দেখতে গেলাম বাসায়। সন্ধ্যাবাতি জ্বালানোর পর যে রকম নিরুত্তাপ সময় নেমে আসে, সে রকম নিস্তেজ সন্ধ্যায় গেলাম তাঁকে দেখতে। দেখেই চিনতে পারলেন। অনেক কথা বললেও তা যেন ছিল স্মৃতির পেছনে অক্ষম চাবুক মারা। সেদিন তিনি আমায় শোনালেন আমারই গল্প: কবে কোন দিন গায়ে চাদর জড়িয়ে অফিসের ডেস্কে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার এলোমেলো অবাধ্য চুল গড়াগড়ি খাচ্ছিল শূন্যে—হা হয়ে অবাক হচ্ছিলাম! আরও বললেন, সুস্থ হলে নাটক লিখবেন, নাটক বানাবেন, তাতে মূল চরিত্রের গায়ে চাদর থাকবে—এলোমেলো অবাধ্য চুল, বোহেমিয়ান চরিত্র। আমাকে দিয়ে অভিনয় করাবেন। তাঁর কথা শুনে হাসলাম, তাঁকে সান্ত্বনা দিলাম—নিশ্চয়ই ভালো হয়ে ফিরে আসবেন, নাটক লিখবেন নাটক পরিচালনা করবেন।
মানুষের জীবনটাই এ রকম। কখনো কখনো নিজেকেই নাটকের অভিনেতা হয়ে চলে যেতে হয় না-ফেরার দেশে...