সত্তরের দশকে চুটিয়ে বিটিভিতে নাটক করতাম। প্রয়াত আবদুল্লাহ আল মামুন তখন বিটিভিতে নাট্য প্রযোজক ছিলেন। এই দশকের শেষ দিকে হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন। তত দিনে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস নন্দিত নরকে বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তখন ওনার গল্প-কাহিনি নিয়ে বিটিভিতে অনেকেই নাটক রচনা ও প্রযোজনা করতেন। একদিন মামুন ভাইয়ের রামপুরায় বিটিভি কার্যালয়ে বসে ছিলাম। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিটিভিতে পাঠানো একটি ফ্যাক্সে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর পূর্বানুমতি ছাড়া তাঁর রচিত কোনো গল্প নিয়ে টিভি নাটক রচনা বা প্রযোজনা না করতে অনুরোধ করেন।পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে আমাদের থিয়েটার নাট্যদল দুই ভাগ হয়ে যায়। আমরা থিয়েটার (আরামবাগ) নামে নতুন নাটক মঞ্চায়ন শুরু করলাম। মীর মশাররফ হোসেনের জমিদার দর্পণ ও মমতাজউদ্দীন আহমদের ক্ষত-বিক্ষত মঞ্চস্থ করলাম। ইতিমধ্যে জানতে পারলাম, হুমায়ূন আহমেদ পিএইচডি করে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। হঠাৎ আমার মাথায় একটা ফন্দি এল। দলের কাউকে না বলে নিজ সিদ্ধান্তেই হুমায়ূন আহমেদের সদ্য ভাড়া করা আজিমপুর কবরস্থানের কাছে একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে এক সকালে উপস্থিত হলাম। দুই কার্টন বেনসন হেজেস সিগারেট, কয়েকটি খাতা, এক ডজন বলপয়েন্ট নিয়ে দেখা করলাম। সদ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছেন, ঘরদোর গোছানো হয়নি। সোফাও কেনা হয়নি। পরিচয় দিলাম—মোড়ায় বসতে দিলেন। সিগারেট, খাতা-কলম দিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য বললাম। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। আমার কার্যকলাপ ও কথাবার্তা শেষে ১০-১৫ দিন পর দেখা করতে বললেন। যথাসময়ে নাটকের পাণ্ডুলিপি আমাকে হস্তান্তর করলেন। নাটকটির নাম মহাপুরুষ। মহা আনন্দে মহড়া শুরু করলাম। মাঝেমধ্যে প্রযোজনার সুবিধায় নাটকটির পাণ্ডুলিপি পরিমার্জন, পরিবর্ধন করে দিতেন। কয়েক দিন মহড়াও দেখলেন। সভাপতি নাট্যকার মমতাজউদ্দীন আহমদ নাটকটির দু-একটি সংলাপ সামান্য এদিক-ওদিক করায় প্রচণ্ড বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। সদ্য যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদারি নাটক দেখে এসেছেন। এখানে মহিলা সমিতির মতো একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাবর্জিত মিলনায়তনে বিনা পয়সায় আমাদের কর্মকাণ্ড দেখে চমৎকৃত ও বিস্মিত হতেন। সমবেদনা জানাতেন।সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ সালে মহাপুরুষ নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়নের রজনীতে একটি ছোট্ট আয়োজনে মঞ্চে উপবিষ্ট ড. আবদুল্লাহ আলমুতী শরফুদ্দীন। চারুশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, রনবী, মুক্তধারার প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহা, নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ, দলের সভাপতি মমতাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং মহাপুরুষ নাটকের প্রযোজনা অধিকর্তা হিসেবে আমিও ছিলাম।অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছু আগে হুমায়ূন আহমেদ হন্তদন্ত হয়ে হাতে একগাদা বই নিয়ে মহিলা সমিতির সামনে রিকশা থেকে নামলেন। বইগুলো হচ্ছে মহাপুরুষ নাটক। তাঁর লেখা প্রথম মঞ্চনাটক অভিনীত হচ্ছে—এই তৃপ্তিতে উনি প্রতিটি বই স্বাক্ষর করে নাটকের কলাকুশলীদের উপহার দেন। আমি বইয়ের মলাট ওল্টাতে গেলেই বলে উঠলেন, ‘বাংলাবাজার থেকে মাত্রই বইগুলো বাঁধিয়ে এনেছি।’ এখনো অতটা শুকোয়নি। যাই হোক, পরে বই খুলে অবাক দৃষ্টিতে দেখি, মহাপুরুষ নাটকটি আমাকে উৎসর্গ করেছেন এবং মুখবন্ধে আমি নাটকটি তাঁর কাছ থেকে কীভাবে বানালাম, তারও বর্ণনা দিয়েছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যেও এই নেপথ্য-কাহিনির কথা বললেন।হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন যশস্বী লেখক তাঁর রচিত প্রথম মঞ্চনাটক আমাকে উৎসর্গ করেছেন, এটা স্মরণ করলে আজও শিহরিত হই। তবিবুল ইসলাম: নাট্যব্যক্তিত্ব