
হ্যামলেট। পিতৃহত্যার প্রতিশোধের নেশায় মত্ত ডেনিশ যুবরাজ। হন্তারক চাচাকে হত্যার সুযোগ পেয়েও যখন সে হত্যা করে না তখন আসে কিছু দার্শনিক জিজ্ঞাসা। কোন কারণে হ্যামলেট তার চাচা ক্লডিয়াসকে হত্যা করে না। ক্লডিয়াস প্রার্থনারত ছিল বলে? নাকি তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, সেও তো তার পিতাকে খুন করতে চেয়েছিল তাই ক্লডিয়াসের ভেতর নিজেরই ছায়া দেখতে পেয়ে হত্যা থেকে নিবৃত্ত হয়? এসব প্রশ্নের দৃশ্যমান উত্তর নিয়েই এম কে সেন্টারের সহযোগিতায় শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট মঞ্চে এনেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা।
শেক্সপিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ বিয়োগান্তক নাটক হ্যামলেট। আবেদনের সামান্য একটুও হানি না ঘটিয়ে নাটকটি মাত্র দেড় ঘণ্টায় নামিয়ে আনার কাজটি চমৎকার হয়েছে। সঙ্গে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্পষ্ট বাচনশৈলী মুখ ও অঙ্গভঙ্গি এবং চরিত্রে নিমজ্জিত হয়ে অভিনয়, অভিনীত প্রত্যেকটি দৃশ্যকে করে তুলেছে অর্থবহ ও উপভোগ্য। হ্যামলেটের চরিত্রটির কথাই ধরা যাক। এই চরিত্রের বহুমাত্রিকতার চুলচেরা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ছাড়া ওই চরিত্রে অভিনয় অসম্ভব। সিগমুন্ড ফ্রয়েড হ্যামলেট চরিত্রকে ইডিপাসের সঙ্গে তুলনা করেন, কারণ মাতা গারট্রুডের প্রতি হ্যামলেটের বাসনা ছিল তাই তিনি পিতাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। তাহলে কেন হ্যামলেট তাঁর পিতৃহত্যার প্রতিশোধ এত দীর্ঘায়িত করলেন? ক্লডিয়াসের প্রতি তাঁর মায়ের বাসনাকে অনুভব করে কি? মায়ের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে সে বাসনার পরিসমাপ্তি ঘটে বলেই কি অন্তদৃশ্যে তিনি ক্লডিয়াসকে হত্যা করেন?
এসব মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নের ব্যাখ্যা করেই কেবল এই চরিত্রে অভিনয় সম্ভব। আপাত উন্মাদ হ্যামলেটের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানোর উদাহরণও নাটকটিতে আছে। হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে হ্যামলেটের ইংল্যান্ড-যাত্রার সফরসঙ্গী দুই বন্ধু রোজেনক্রান্টস ও গিন্ডেনস্টার্নের ভাগ্যে হত্যার সমন ঝুলিয়ে দিয়ে জীবিত ফিরে আসা সেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। হ্যামলেট চরিত্রে অভিনয় করেছেন চারজন অভিনেতা। চারজনই সমান দক্ষতায় ও উচ্চতায় অভিনয় করেছেন হ্যামলেট চরিত্রে। ক্লডিয়াস, ওফেলিয়া, হোরেশিও, গারট্রুড চরিত্রের পালাবদলে পাল্টে যাওয়া অভিনয় শিল্পীরাও সমানতালে অভিনয় করেছেন হ্যামলেটের সঙ্গে। গোরখোদকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাভেদ রহমান, তাঁর অভিনয় অনেক দিন মনে থাকবে, লেগে থাকবে চোখে। নাটক ও তার চরিত্রগুলোর অন্তর্গত বহুমাত্রিক অর্থ খুঁজে বের করার কাজ যাকে ড্রামাতুর্গ বলা হয়েছে, শাহমান মৈশান অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সেটি করেছেন। কবি শামসুর রাহমান অনূদিত গীতল সংলাপগুলোও বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে নাটকে। চারদিকে দর্শক বসিয়ে মঞ্চের মাঝখানে অভিনয় এর আগে হলেও হ্যামলেট নাটকের সেট অত্যন্ত উপযোগী মনে হয়েছে। মঞ্চ পরিকল্পকেরা শুধু চারদিকে দর্শকই বসাননি, তিনদিকে তিনটা সিঁড়ি ব্যবহার করে এবং একদিক উন্মুক্ত প্রস্থানপথ রেখে মঞ্চের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে স্তর তৈির করেছেন অনেকগুলো, ফলে রাজসিক নাটকের রাজসিক কোরিওগ্রাফ করা গেছে নিশ্চিন্তে। আলোর প্রয়োগও করা গেছে যথাযথভাবে।
হ্যামলেট নাটকের পোশাক পরিকল্পনা সবচেয়ে দুরূহ বলে মনে হলেও এই নাটকে রাজকীয় ধরন বজায় রেখে খুব সাদামাটাভাবে রাজাকে রাজা প্রজাকে প্রজা বানিয়েছেন পোশাক পরিকল্পনাকারীরা। ওয়াহিদা মল্লিক জলির মেধা এর পেছনে ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
এসব আয়োজনকে একত্রিত করে হ্যামলেট প্রযোজনাকে মঞ্চে দাঁড় করিয়েছেন যে যাজ্ঞিক তিনি আশিক রহমান লিওন। অভিনয়শিল্পীদের কাছ থেকে অভিনয় আদায় করে নেওয়ার যে নৈপুণ্য তিনি দেখিয়েছেন কারিগরি দিকটাও তিনি একই নৈপুণ্যে ব্যবহার করেছেন। নাটকে ‘দুর্বলতার অপর নাম নারী’ সংলাপটি বিশ শতকের নারীবাদী বিশ্লেষণে নারীর জন্য অবমাননাকর হলেও সমগ্র হ্যামলেট নাটকটিই দাঁড়িয়ে থাকে ওই একটি সংলাপের ওপর। ফলে নির্দেশকের এ বিষয়ে ভাবার কোনো অবকাশ ছিল না। সব মিলিয়ে শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের একটি সফল প্রযোজনা।