>নাটকে এখন হরহামেশাই ব্যবহার হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু তা কি পুরোপুরি আঞ্চলিকতা বহন করছে, নাকি শুধুই দর্শকের কাছে হাসির কারণ হয়ে উঠছে এই গোঁজামিলের চেষ্টা? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আমাদের এই প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করা হয়েছে।

বছর চারেক আগের ঘটনা। মেড ইন চিটাগাং নামে একটি নাটক নির্মাণ করলেন তরুণ পরিচালক ইমরাউল রাফাত। নাটকটি পুরোদস্তুর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় হওয়ার কারণে নির্মাণের পর খানিকটা সংশয়ে পড়ে যান তিনি। এই ভাষা সবাই বুঝবে? দর্শক কীভাবে নেবেন? সমাধানও তাড়াতাড়িই হলো। পাত্রপাত্রীর সংলাপের বেলায় ‘সাব-টাইটেল’ হিসেবে ব্যবহার করা হলো প্রমিত বাংলা।
প্রশ্ন হলো তাহলে আঞ্চলিক ভাষায় নাটক বা চলচ্চিত্র হবে না? নাকি হলে সাব-টাইটেল যুক্ত হবে? এত সব প্রশ্ন পেছনে রেখে বাস্তবতার গল্প আলাদা। এখন হরহামেশাই টিভি পর্দায় দেখা মিলছে আঞ্চলিক ভাষার নাটক। ময়মনসিংহ, পাবনা, পুরান ঢাকা, কুষ্টিয়া, বরিশাল, নোয়াখালীসহ কিছু অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে নাটকে। এই চর্চা অবশ্য নতুন নয়। বিটিভিসহ সব টিভি চ্যানেলেই আঞ্চলিক ভাষার দাপট আছে। কিন্তু আঞ্চলিকতার নাম করে তা কতটা আঞ্চলিক হচ্ছে, তাই এখন প্রশ্ন। আঞ্চলিক ভাষার নাটকের নাট্যকার, পরিচালক, অভিনয়শিল্পী থেকে সংশ্লিষ্ট সবাই স্বীকার করলেন, যা হচ্ছে তা আসলে ‘চেষ্টা’মাত্র। অধিকাংশ নাটকে সত্যিকারের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার নেই।
এখন যা হচ্ছে
২০০১ সালের ঘটনা। একুশে টিভিতে প্রচার হতো বিষকাঁটা নামে একটি ধারাবাহিক। যাঁরা নাটকটি দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয় মনে আছে সেই নাটকে ‘বরিশাইল্যা আক্কাস’ নামে একটি চরিত্র ছিল। এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বরিশালের অভিনেতা মীর সাব্বির। তাঁর ভাষায়, ওই চরিত্রই ছিল তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সেই মীর সাব্বির এখন পরিচালনা করছেন নোয়াখালী ও বরিশাল অঞ্চলের ভাষা নিয়ে ধারাবাহিক নাটক নোয়াশাল। তিনি স্বীকার করলেন, শতভাগ ওই অঞ্চলের ভাষার প্রয়োগ করা হচ্ছে না এই নাটকে। তবে চেষ্টাটুকু হয়। কারণ, ভাষার চেয়ে এই নাটকে গুরুত্ব দেওয়া হয় সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন আর পারিবারিক আবহকে।
গত কয়েক বছর ধরে আরমান ভাই ও সিকান্দার বক্স নামের দুটি সিরিজ নাটক নির্মাণ করে আলোচনায় এসেছেন নির্মাতা সাগর জাহান। এর মধ্যে আরমান ভাই পুরান ঢাকা আর সিকান্দার বক্স ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছেন। কেন? সাগর জাহান বললেন, ‘আমরা চরিত্রগুলো একটু আলাদা করতে চেয়েছি। আর এই দুই অঞ্চলের ভাষাই শ্রুতিমধুর।’ তিনি আরও বললেন, ‘পুরোপুরি আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করা যায়নি। কারণ, একটা অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করতে যে পরিমাণ সময় ও গবেষণার প্রয়োজন, সেটা আমাদের ছিল না। তবে শুটিংয়ের সময় ওই অঞ্চলের কেউ থাকতেন। সমস্যায় পড়লে তাঁর কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েছি।’
কয়েক বছর ধরে পাবনা ও কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে নাটক নির্মাণ করছেন সালাহউদ্দিন লাভলু। এর মধ্যে নাট্যকার বৃন্দাবন দাস শ দুয়েক নাটক লিখেছেন পাবনার আঞ্চলিক ভাষায়। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, ওই অঞ্চলেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাই প্রমিত ভাষার চেয়ে পাবনার আঞ্চলিক ভাষায় লেখা তাঁর জন্য সহজ।
অভিনয়ের বেলায়ও চেষ্টা করেন পাবনার অভিনয়শিল্পী নিতে। এই প্রবণতা আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে যাঁরা নাটক নির্মাণ করেন, তাঁদের সবার মধ্যেই আছে। সুবিধা হলো, তাতে আর মহড়া করতে হয় না। এ কারণেই বৃন্দাবন দাসের বেশির ভাগ নাটকে দেখা যায় চঞ্চল চৌধুরীকে। তিনি বললেন, ‘পাবনা বা কুষ্টিয়ার ভাষার সংলাপে আমার কোনো সমস্যা হয় না। তবে আমি মনে করি, যে ভাষার ওপর দখল নেই, সে ভাষার নাটকে অভিনয় করা উচিত নয়। এটাও ঠিক, একজন অভিনয়শিল্পী চাইলে অনেক ভাষাই জানতে পারেন এবং অভিনয় করতে পারেন।’
সালাহউদ্দিন লাভলু বললেন, ‘আমি রঙের মানুষ ধারাবাহিক দিয়ে আঞ্চলিক ভাষার নাটক নির্মাণ শুরু করেছি। ওই নাটকটি দর্শক বেশ পছন্দ করেছিলেন। তারপর অসংখ্য নাটক নির্মাণ করেছি আঞ্চলিক ভাষায়। সব সময় চেষ্টা করি যে অঞ্চলের ভাষা, সেই অঞ্চলের অভিনয়শিল্পী নিতে। এটা হয়তো অনেক সময় পাওয়াও যায় না। কিন্তু আমরা আলাদা করে মহড়া করি। তাই বলা যায়, শতভাগ আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা না গেলেও ৭৫ ভাগ সঠিক হয়।’
সংলাপ থেকে মিম
মিম (Meme) মূলত ইন্টারনেটে প্রচলিত ছবিভিত্তিক বার্তা। জনপ্রিয় তারকাদের ছবি ও খুব অল্প বাক্য দিয়ে তৈরি এই বার্তাগুলো হয় হাস্যরসাত্মক। একটা সময় কোনো সংলাপ থাকত মানুষের মুখে মুখে। সেটা আঞ্চলিকই হোক আর প্রমিত। এখন সম্ভবত ‘দিন বদলাইছে’। পছন্দের সংলাপ মিম হয়ে আসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যেমন মোশাররফ করিমের ‘আবেগে কাইন্দালছি’, ‘হেতেরে কেউ পানিতে চুবাস না কেরে’, ‘কিছু কমু না’। হাসি মুখের চঞ্চলের ছবিতে ‘ফাইন লাগচে’সহ নানা ধরনের মিম। এর অধিকাংশই আঞ্চলিক ভাষায় হাস্যরসাত্মক ব্যবহার। হাস্যরসই তরুণদের কাছে এর প্রধান আকর্ষণ। এসব ব্যবহার করা হচ্ছে ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টের মন্তব্য করতে। বলা যায় তরুণদের মন্তব্যের আরেক ভাষা হয়ে উঠছে আঞ্চলিক ভাষার মিম।
যা হওয়া উচিত
আঞ্চলিক ভাষায় করা নাটকে বোধগম্যতা থাকতে হয়। আঞ্চলিকতার ঘ্রাণ থাকবে ঠিকই, বোঝা যাবে কোন অঞ্চলের সংলাপ, কিন্তু তা অন্যের জন্য যেন অবোধ্য থেকে না যায়। এ ব্যাপারে নাট্যজন আতাউর রহমান মনে করেন, আঞ্চলিক ভাষায় নাটক লেখা ও নির্মাণ সহজ ব্যাপার নয়। আগে জানতে হয়, না হলে ব্যাপারটি গোঁজামিল হয়ে যায়। যা এখনকার আঞ্চলিক ভাষার নাটকে বিদ্যমান। বললেন, ‘ভাষা একটি সাধনার বিষয়। তা ব্যবহারের সময় দোটানা, অনুপ্রাস, কণ্ঠস্বর ও প্রক্ষেপণ বুঝতে হবে। না হলে একটা জগাখিচুড়ি বিষয় দাঁড়াবে। যেটা না করাই ভালো। প্রয়োজনে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত আঞ্চলিক ভাষার অভিধান বইটি থেকে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। এই বইয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের ১ লাখ ৬৬ হাজার ২৪৬টি আঞ্চলিক শব্দ রয়েছে।’