
ইউটিউবে মাত্র সপ্তাহখানেক আগে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের সানাই শুনতে শুনতে এক জায়গায় কান খাঁড়া হয়ে যায়। তিনি একটি মেয়েকে দেখিয়ে বলছিলেন, এই তাঁর বেটি। জীবনের শেষ দিকে অনেক বড় বড় ওস্তাদের সঙ্গেও যেখানে মঞ্চে বসতে নারাজ ছিলেন, সেখানে সুরের সম্পর্কে জড়িয়ে মেয়েটি হয়ে গেল বেটি। শুধু তাই নয়, মেয়ের সঙ্গে করেছেন মঞ্চ পরিবেশনাও। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের এই দত্তক কন্যার নাম সোমা ঘোষ। বেনারসের শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। বাপ-বেটির সম্পর্ক নিয়ে কথা হলো সোমা ঘোষের সঙ্গে।
সফর বাংলাদেশ
বেনারস হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল সদস্য সোমা ঘোষ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শাস্ত্রীয়সংগীত নিয়ে কাজ করছেন দেশে-বিদেশে। সংগীত নিয়ে কথা বলতেই প্রথমে উঠে এল বাবা বিসমিল্লাহ খানের কথা। ও হ্যাঁ। বলে রাখা ভালো, বিদুষী সোমা ঘোষের পূর্বসূরিদের আবাস বাংলাদেশের শেরপুরে। দেশভাগের সময় চলে গেছেন ভারতে। তাই বাংলাদেশের নদী-মাঠঘাট দেখতে মনটা বেশ উসখুস করছিল। স্বামী শুভঙ্কর ঘোষ চলচ্চিত্র বানান। ঢাকায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বামীর সঙ্গে এসেছিলেন সোমা।
বাবার সঙ্গে পরিচয়
বিসমিল্লাহ খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা তৈরি হয় সুর দিয়ে। বললেন, ‘আমার গুরু মা বাগেশ্বরী দেবীর প্রিয় বাদক ছিলেন বিসমিল্লাহ খান। আমি বেনারসে বড় হয়েছি। কিন্তু কখনো তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়নি। গুরু মা মারা যাওয়ার পর তাঁর প্রিয় বাদককে আমি যখন ডেকে আনি বিসমিল্লাহ খান জানতেন না যে আমি গান করি। কোনো পরিচয় নেই। জানেন না আমি কে? শুধু বুঝতে পেরেছেন যে, আমি একজন অর্গানাইজার। উনি যখন এলেন, আমি তখন মঞ্চে গান করছিলাম। দুই-তিন মিনিট গেয়েছি। একটা বেনারসি ঠুমরি। তখন উনি বললেন, “কে গাইছে এটা?” পাশ থেকে কেউ একজন বলল যে, “যে আপনাকে ডেকেছে তিনি গাইছে।” তিনি বললেন, “আমার হুইলচেয়ার রাখো। আমি শুনব।” তিনি হুইলচেয়ারে বসে এসেছিলেন। গান শোনার পর বলেন, “ও যা গাইছে আমি তো এটাই বাজাই।” ওনার কাছে এলে আমার সঙ্গে যুগলবন্দী করার কথা বলেন। উনি এক বছর আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন বিলায়েত খাঁ ও রবিশঙ্কর ছাড়া কারও সঙ্গে ডুয়েট করবেন না। কারণ টেম্পারামেন্ট ম্যাচ করে না। কিন্তু আমাকে শোনার পর বললেন, “তোমার সঙ্গে আমি যুগলবন্দী করব।” আমার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছে। মাত্র তিনি তখন ভারতরত্ন পেয়েছেন।’
বাবা-মেয়ের সম্পর্ক
সোমা ভেবেছিলেন বিসমিল্লাহ খান মজা করছেন। কারণ তখনো তিনি পদ্মশ্রী পুরস্কারও পাননি। আর তাঁর সঙ্গে কিনা যুগলবন্দী গাইবেন। কিন্তু ছয় মাস পর তাঁর সঙ্গে কলকাতায় দেখা। তিনি কিছুই চিনতে পারেন না। অথচ সোমাকে দেখেই চিনে ফেলেন। বললেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে মজা করিনি। তুমি কি ভেবেছ তোমার সঙ্গে মজা করেছি? তোমার সঙ্গে যুগলবন্দী করতে হবে। আর এ খবর পৃথিবীর কোণে কোণে চলে যাবে। এটা করতে হবে। তুমি প্রস্তুতি নাও।’ তিনি বলছিলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে হৃদয় থেকে বাজাচ্ছি। আমাদের মধ্যে রিশতা (সম্পর্ক) ওপরওয়ালা বানিয়ে দিয়েছে।’
শেষ যুগলবন্দী
খান সাহেবের আফসোস ছিল পার্লামেন্টে তাঁর সানাই বাজেনি। সেটাও পুরো হয়েছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল। কালামের আমন্ত্রণে যুগলবন্দী করেন বাবা-মেয়ে। সেটিই ছিল শেষ যুগলবন্দী। সোমা বলেন, ‘তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। বিসমিল্লাহ খান ৩০ লাখ টাকা চেয়েছিলেন পরিবেশনার জন্য। কালাম সাহেব বলছিলেন, “আমি ফকির মানুষ আমি কোথা থেকে দেব।” আমি খান সাহেবকে প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে ফোন করি। বলি, “বাবা আপনাকে আসতে হবে। দিল্লিতে হুকুমত আপনাকে ডাকছে।” উনি কি জবাব দিলেন জানেন? বললেন, “হুকুমতের জন্য আমি আসব না। তুমি গাইছ কি? তাহলে আমি আসব।” একটা টাকার কথা বললেন না। মাত্র ১ লাখ টাকা দিয়েছি তাঁকে। এটাই ছিল জীবনের শেষ কনসার্ট। সেদিন ওনার সানাই বাজছিল না। কালাম সাহেব নার্ভাস হয়ে যাচ্ছেন। বাবা ফুঁক দিচ্ছেন শব্দ বেরোচ্ছে না। তখন আমি মাইক খুলে তাঁর মুখের কাছে দিলাম। উনি গান গেয়ে আমার সঙ্গে ডুয়েট করলেন। মুখেই যেন সানাই বাজল।’
২০০১ সালে প্রথম দেখা হয় বিসমিল্লাহ খানের সঙ্গে। প্রথম যুগলবন্দী ২০০২ সালে। তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্তি হলো ২০১৬ সালে। ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় মেয়ের ওপর দায়িত্ব দিয়েছে ১০০ বছর উদ্যাপনের। দেশে-বিদেশে বিসমিল্লাহ খান সাহেবকে নিয়ে অনুষ্ঠান হবে। ইচ্ছা আছে বাংলাদেশের ঢাকাতে করারও। এই ইচ্ছা দিয়েই শেষ হয় বাবা-মেয়ের সুরের বাঁধনের কথা। তবে একটা কথা বেশ মনে গেঁথে গেল। সোমা ঘোষ বলছিলেন, ‘এই যে দেশে দেশে এত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, এগুলো হচ্ছে সুর নেই বলে। তারা বেসুরো। সংগীত থাকলে ঝগড়া থাকে না।’