>

১০ বছর পর আবার পরিচালনায় ফিরলেন নন্দিতা দাস। ২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর পরিচালিত ছবি ফিরাক ভীষণ প্রশংসিত হয়েছে। এবার মুক্তি পেতে চলেছে নন্দিতার পরিচালিত ছবি মান্টো। উর্দু ভাষার প্রগতিশীল লেখক সাদাত হোসেন মান্টোর জীবন এবং দেশভাগকে ঘিরে এই ছবি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মান্টো অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে। শুধু পরিচালনা নয়, এ ছবি দুটির জন্য কলমও তুলে নিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। পরিচালনার ক্ষেত্রেও এবার নতুন জানালা খুলে দিলেন নন্দিতা। এবারের আড্ডায় বলিউডের দাপুটে অভিনেত্রী, পরিচালক, লেখক নন্দিতা দাসের মুখোমুখি প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্য। গত ৩১ আগস্ট ভায়াকম ১৮-র অফিসে বসে এক অন্য মেজাজে ধরা দিলেন তিনি। মান্টো ছবিটি মুক্তি পাবে ২১ সেপ্টেম্বর।
প্রশ্ন: ‘ফিরাক’-এর ১০ বছর পর ‘মান্টো’। এত দীর্ঘ বিরতি কেন?
নন্দিতা দাস: আসলে আমি অন্য অনেক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলাম। ‘ফিরাক’-এর পর চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটিতে তিন বছর চেয়ারপারসন ছিলাম। ব্যস্ত ছিলাম বিটুইন দ্য লাইনস নামের একটা নাটক নিয়েও। নাটকটির অভিনেত্রী, লেখক আর পরিচালক আমি। নাটকের শো হয়েছে ৫০ বারের ওপর। ২০১০ সালে আমি মা হয়েছি। আমার ছেলে হয়। বুঝতেই পারছেন, মা হওয়ার পর একজন কর্মী মায়ের জীবনে অনেক পরিবর্তন আসে। এরপর বিশ্বের অন্যতম সেরা ইউনিভার্সিটি ‘এল’ থেকে ফেলোশিপ করি। একটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে নিয়মিত কলাম লিখেছি। তারপর মান্টোর কাজ শুরু হয়ে গেল। ২০১২ থেকে মান্টোর কাজ শুরু করেছি। গবেষণা করতে আর লিখতেই চার বছর লেগে গেল। তার ওপর উর্দু ভাষা নিয়ে প্রচুর কাজ করতে হয়েছে। এভাবে নানা কাজে ব্যস্ত ছিলাম।
প্রশ্ন: জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসেন মান্টোকে নিয়ে ছবি বানানোর চিন্তাভাবনা এল কীভাবে?
নন্দিতা: প্রথমত মান্টোর পাকিস্তানি নাগরিকত্ব হলেও তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতে। আর ভারতেই তিনি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন। দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান। কলেজে থাকতে মান্টোকে নিয়ে পড়েছি। মানে তাঁর লেখা ছোট গল্প পড়েছি। কিন্তু মান্টো সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। ২০১২-তে যখন মান্টোর শতবর্ষ পালন করা হয়, তখন আমি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। অসংখ্য মানুষ তাঁকে নিয়ে বহু কিছু লেখেন। ইংরেজিতে মান্টোর লেখা রচনার বই তখনই প্রথম পড়ি। মান্টোর লেখা পড়ে আমি দারুণ উদ্বুদ্ধ হই। আমাদের দেশে এখনো লিঙ্গ, ধর্ম, প্রদেশ, দেশ সবকিছুর পরিচয় নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়। মান্টো মানবতার পরিচয়কে সবচেয়ে বড় করে দেখতেন। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় হলো মানবতা। মান্টোর লেখা গল্প ছয়বার আদালতে উঠেছে। কারণ দাবি তোলা হয়েছিল, তাঁর লেখা গল্প অশ্লীল। তিনি যৌনকর্মীদের পক্ষে লিখেছিলেন। আজ তাঁরই লেখা গল্প নিয়ে আমরা শতবর্ষ পালন করছি। মান্টো ছিলেন নির্ভীক একজন লেখক। আমার মনে হয়েছিল তাঁর জীবনের কাহিনি সবার জানা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: আপনার পরিচালিত দুটি ছবি ‘ফিরাক’ আর ‘মান্টো’তে কাস্টিং ভীষণই বৈচিত্র্যময়। শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনি কতটা যুক্ত ছিলেন?
নন্দিতা: আমি নিজে অভিনেত্রী বলে কাস্টিংয়ের গুরুত্ব বুঝি। আমার জন্য কাস্টিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টিংয়ের প্রথম শর্ত হলো অভিনেতাকে যেন পর্দায় সেই চরিত্রের মতো দেখায়। আর অভিনেতা হিসেবেও তাঁকে অবশ্যই ভালো হতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো ভালো মানুষ হওয়া, যাতে তাঁর সঙ্গে কাজ করতে আনন্দ পাই। আমি নিজে প্রচুর কাস্টিং করেছি। আর আমার কাস্টিং ডিরেক্টর হানি ত্রিহানও আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। নওয়াজ, রসিকা, চন্দন রায় স্যান্যাল, পরেশ রাওয়াল, ঋষি কাপুর, জাভেদ আখতার, অশোক কুমার, গুরুদাস মানদের আমি নিজে নির্বাচন করেছি। এই ছবিতে কাস্টিং খুবই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে হানি ছাড়া এই কাজটি করা কঠিন ছিল।
প্রশ্ন: নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি আপনার পরিচালিত দুটি ছবিতেই আছেন। আর নওয়াজই আপনার ছবিতে ‘মান্টো’র ভূমিকায়। প্রথম থেকেই কি নওয়াজের কথা মাথায় ছিল?
নন্দিতা: আমি নওয়াজকে ফিরাক ছবিটি থেকে চিনি। বলা যায়, ফিরাকই ওর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় ছবি। ২০০৮-এর এই ছবিতে নওয়াজ প্রথম কোনো বড় চরিত্রে অভিনয় করে। ‘মান্টো’কে নিয়ে যখন থেকে লেখা শুরু করি, তখন থেকেই ওর কথা আমার মাথায় ছিল। প্রথমত নওয়াজের চোখ দুটি খুবই শক্তিশালী। এই চোখ দিয়ে ও জীবনের সব রং ফুটিয়ে তুলতে পারে। আমি এমন চোখ চেয়েছিলাম যে চোখে একদিকে সাহস আছে, আবার কোথাও একটু ভয় আছে। এই বৈপরীত্য দেখানো সহজ ছিল না। নওয়াজের চোখে আমি এসব পেয়েছিলাম। আমি এমন অভিনেতার সন্ধানে ছিলাম, যিনি অভিনয়ের সব পর্যায় দেখাতে পারেন। নওয়াজ সে ধরনের অভিনেতা।
প্রশ্ন: আপনার ছবিতে মান্টো কীভাবে ধরা দেবেন? তাঁর জীবন তো নানা রঙে রঞ্জিত।
নন্দিতা: একদম ঠিক বলেছেন। মান্টো সম্পর্কে অনেকে কিছুই জানেন না। আবার অনেকে হয়তো একটু একটু জানেন। কেউ কেউ আবার প্রচুর কিছু জানেন। আমি এ ছবিটা সবার জন্যই বানিয়েছি। মান্টোর জীবনের একটি দিক আমি তুলে ধরিনি। কৃষণ চন্দর, রাজেন্দর সিং বেদীর মতো প্রগতিশীল লেখকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। চলচ্চিত্র-দুনিয়ার সঙ্গে মান্টোর সম্পর্কটিও দেখানো হয়েছে। কারণ তিনি চিত্রনাট্য লিখতেন। অশোক কুমার, নার্গিসের মা জদ্দন বাঈ, এঁদের সঙ্গে মান্টোর কী সম্পর্ক ছিল, স্ত্রীর সঙ্গে মান্টোর কেমন সম্পর্ক ছিল—এসব আনা হয়েছে। আপনি যখন কারও সম্পর্কে জানতে চান, তখন আশপাশের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দিয়ে তাঁকে জানা যায়। তবে আমি মান্টোর কোনো বায়োপিক বা তথ্যচিত্র বানাইনি। তাঁর জীবনের চার বছরের একটি অংশকে তুলে ধরেছি। মান্টোর জীবনের সঙ্গে সঙ্গে দেশভাগের আগের ও পরের ছবিও তুলে ধরা হয়েছে। আর এই সময়টা আমাদের দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমার ছবি মান্টো সেই সময়ের সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করেছে।
প্রশ্ন: আপনার জীবনে ‘মান্টো’ কে?
নন্দিতা: এই প্রশ্নটা করে ভালো করেছেন। কারণ, এ ধরনের একজন মানুষকে আমি খুব সামনে থেকে দেখেছি। তিনি হলেন আমার বাবা। আমার বাবা একজন চিত্রকর। বাবার মধ্যে আমি ‘মান্টো’কে পেয়েছি। আমি যখন মান্টোর কাহিনি পড়ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমার বাবার কাহিনি পড়ছি। মান্টো নিজে প্রগতিশীল লেখক হয়েও সে ধরনের কোনো সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। আমার বাবাও ঠিক তা-ই। বাবা কখনো আর্ট মার্কেটের সঙ্গে যুক্ত হননি। আমার বাবাও মান্টোর মতো কখনো অর্থের পেছনে ছোটেননি। তাঁরা দুজনই প্রচারবিমুখ ছিলেন। দুজনের মধ্যে আরেকটা মিল হলো, তাঁরা দুজনই স্পষ্ট বক্তা। এ কারণেই অনেকেই তাঁদের ভুল বুঝতেন। বাবা মান্টোর মতোই তাঁর শিল্প দিয়ে সত্যকে তুলে ধরতেন।
প্রশ্ন: আপনার মা লেখক, বাবা নামজাদা চিত্রকর। মায়ের মতো আপনিও হাতে কলম তুলে নিয়েছেন। বাবার মতো ক্যানভাসে তুলির আঁচড় কি টেনেছেন কখনো?
নন্দিতা: আমি পেইন্টিং খুব একটা করিনি। ছোটবেলায় সবাই বলতেন যে যতীন দাসের মেয়ে নিশ্চয় চিত্রশিল্পী হবে। আসলে আমাকে ছোট থেকেই অনেক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। আর আমায় এই দিকটা সে রকম আকর্ষণ করেনি।
প্রশ্ন: ছবিটি করতে গিয়ে নিশ্চয়ই প্রচুর গবেষণা করতে হয়েছে?
নন্দিতা: শুরুতেই বললাম না, আমি চার বছর ধরে মান্টোর ওপর গবেষণা করেছি। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের নিয়েও গবেষণা করতে হয়েছে। এ ছবির সবগুলো প্রধান চরিত্রের বাস্তব অস্তিত্ব ছিল। আর আমার ছবির ৯০ শতাংশ সংলাপই মান্টোর লেখা। তবে মানুষের কাছে এই সংলাপগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি একটু সহজ করে লিখেছি।
প্রশ্ন: একজন চিত্রনির্মাতা হিসেবে এ ধরনের ছবি করা বাণিজ্যিকভাবে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
নন্দিতা: আমি ২২ বছর ধরে কাজ করছি। আগেও আমাদের দেখা হয়েছে। তাই আমাকে আপনি ভালো করেই চেনেন। আমাকে হামেশাই এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আমার লক্ষ্য হলো এই ধরনের কাহিনি সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁকে সফল হয়ে উঠতে দেওয়া। আমি বাণিজ্যিক দিককে মোটেও অস্বীকার করছি না। আপনারা বাণিজ্যিক ছবি, আর্ট ফিল্ম, উৎসবের ছবি বলে ছবির গায়ে একটা লেবেল লাগিয়ে দেন। ৫০ কোটির সিনেমা যেমন ব্যবসা করতে চায়, তেমনি ৫০ লাখ টাকার ছবিও চায় তার টাকা তুলে আনতে। আমি ছবি বানিয়েছি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে। ২০১৮-তে বসে আপনি যদি মান্টোর কাহিনির সঙ্গে মিশে যান, সেটাই হবে আমার সফলতা।
প্রশ্ন: আপনি বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের খুব কাছের মানুষ। বাংলা ছবিতে আবার অভিনয় করার কথা কিছু ভাবছেন না?
নন্দিতা: আমি ভাষার ভিত্তিতে কখনো ছবি করি না। আমার কাছে যদি ছবির গল্প, পরিচালক বা চরিত্র পছন্দ হয়, তাহলে নিশ্চয়ই ছবি করব। তামিল ছবিতেও আমি কাজ করেছি। তামিলের মতো কঠিন ভাষা, আমি তো একদমই জানতাম না। তবে বাংলায় কাজ করা আমার জন্য অনেক সহজ। বাংলা ভাষায় কাজও করেছি। বাংলায় ভালো ছবির ধারাবাহিকতা আজও বজায় আছে। এখন কৌশিক গাংগুলী, সৃজিত, সুমনের মতো অনেক ভালো ভালো পরিচালক বাংলায় কাজ করছেন। মাঝখানে কলকাতা থেকে ছবি করার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু তখন হাতে সময় ছিল না। এখন আমি কিছুটা ফ্রি, ভালো কোনো ছবির প্রস্তাব পেলে নিশ্চয়ই করব।
প্রশ্ন: ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো পরিচালককে কতটা মিস করেন?
নন্দিতা: ঋতুদাকে নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। বললে সারা দিন লাগবে। আমরা একদিন বসে শুধুই ঋতুদার কথা বলব।
প্রশ্ন: একজন চিত্রনির্মাতা ও অভিনেতার জন্য নেটওয়ার্কিং এখন কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
নন্দিতা: আমার এ ধরনের নেটওয়ার্কিং একদমই আসে না। জীবনে অনেক আকর্ষণীয় মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। কখনো কখনো মনে হয়, ওই মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারলে ভালো হতো। ২০০৫-এ টানা ১০ দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমি সালমা হায়েক, হাবিয়ের বারদেন, জন বু—এঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। এখন দেখছি নেটওয়ার্কিং খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আপনি যদি নিজের কাজের জায়গায় সৎ থাকেন, তাহলে এসবের খুব প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কোনো পিআর এবং প্রচারণা ছাড়া ২২ বছর ধরে তো এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি। আমি তো সাক্ষাৎকার দিতেও পছন্দ করি না। আমি মনে করি নিজেকে নিয়ে বেশি কিছু বলা মনের জন্য ভালো নয়।
প্রশ্ন: নন্দিতা দাসকে আবার কবে পর্দায় দেখতে পাব?
নন্দিতা: আমার কাছে অনেক ভালো ভালো চিত্রনাট্য আসছে। তবে এখন আমি সামান্য অবসর নেব। নিজের যে সফর, সেটা নিয়ে একটা বই লিখতে শুরু করব।