সিনেমার দৃশ্যে রাজ কাপুর। আইএমডিবি
সিনেমার দৃশ্যে রাজ কাপুর। আইএমডিবি

২৭ বছরেই ২ হাজার কোটি টাকার সিনেমা! বলিউডের সবচেয়ে সফল তারকা–সন্তান কে

আজকের দিনে বলিউডে তারকা–সন্তান নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। রণবীর কাপুর, সালমান খান, আমির খান কিংবা দক্ষিণ ভারতের আল্লু অর্জুন, প্রভাস—তারকা পরিবার থেকে উঠে এসে বিপুল সাফল্য পেয়েছেন, এমন অভিনেতার তালিকাও দীর্ঘ। কিন্তু ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন একজন তারকা–সন্তান ছিলেন, যিনি মাত্র ২০-এর কোটাতেই সাফল্যের এমন নজির গড়েছিলেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়। তিনি রাজ কাপুর।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে তাঁর অভিনয় ও পরিচালনায় তৈরি ‘আওয়ারা’ শুধু ভারতেই নয়, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের নানা দেশে ভারতীয় সিনেমার নতুন বাজার তৈরি করেছিল। মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ধরলে সিনেমাটির আয় আজকের হিসাবে প্রায় দুই হাজার কোটি রুপির সমান বলে উল্লেখ করা হয়।

অভিনয়ের রক্তেই শুরু
রাজ কাপুরের বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর ছিলেন হিন্দুস্তানি চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯২০-এর দশকে লাহোরে নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। পরে বোম্বেতে এসে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন তিনি। খুব দ্রুতই ভারতীয় সিনেমার অন্যতম পরিচিত অভিনেতায় পরিণত হন পৃথ্বীরাজ।

সেই পরিবারের সন্তান রাজ কাপুরের সিনেমার সঙ্গে পরিচয়ও খুব অল্প বয়সে। ১৯৩৫ সালে শিশু অভিনেতা হিসেবে তিনি অভিনয় করেন ‘ইনকিলাব’ সিনেমায়। তবে নায়ক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় অনেক পরে। ১৯৪৬ সালে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান, আর ১৯৪৭ সালের ‘নীলকমল’ তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়।
কিন্তু রাজ কাপুরের ভাগ্য সত্যিকার অর্থে বদলে যায় ১৯৪৯ সালে।

সেই বছর তাঁর দুটি সিনেমা—‘আন্দাজ’ ও ‘বারসাত’ তাঁকে তারকাখ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়। বিশেষ করে ‘বারসাত’ সে সময়ের বক্স অফিসের সব হিসাব বদলে দেয়। প্রায় দুই কোটি রুপি আয় করে এটি তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমাগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

মাত্র ২৫ বছর বয়সেই রাজ কাপুর তখন হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতাদের একজন। দিলীপ কুমার ও দেব আনন্দের সঙ্গে পরবর্তী কয়েক দশক ভারতীয় সিনেমার যে ত্রয়ী দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন, রাজ কাপুর ছিলেন তার অন্যতম সদস্য।

সিনেমার দৃশ্যে রাজ কাপুর। আইএমডিবি

২৭ বছর বয়সে ইতিহাস ‘আওয়ারা’র
১৯৫১ সালে আসে রাজ কাপুরের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাগুলোর একটি—‘আওয়ারা’। সিনেমাটিতে তিনি শুধু অভিনয়ই করেননি, পরিচালনাও করেছিলেন।

সামাজিক বৈষম্য, শ্রেণিবিভাজন ও মানুষের জীবনে পরিবেশের প্রভাব—এমন নানা বিষয় নিয়ে তৈরি সিনেমাটি ছিল সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে। কিন্তু ‘আওয়ারা’র সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল এর আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা।

ভারতের পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নে সিনেমাটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। সেখানে রাজ কাপুর হয়ে ওঠেন অসাধারণ জনপ্রিয় এক নাম। ‘আওয়ারা হুঁ’ গানটি ভারতীয় উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে সোভিয়েত অঞ্চলের মানুষের কাছেও পরিচিত হয়ে যায়।
সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ১৫ কোটির বেশি রুপি আয় করেছিল বলে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ের মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তুলনা করলে সেই অঙ্ক প্রায় দুই হাজার কোটি রুপির সমপরিমাণ হতে পারে।

‘আওয়ারা’ প্রায় ৯ বছর ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্রগুলোর একটি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল।

সিনেমার দৃশ্যে রাজ কাপুর। আইএমডিবি

কান চলচ্চিত্র উৎসবেও রাজ কাপুর
বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন রাজ কাপুর। ‘আওয়ারা’ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেয়।
এর কয়েক বছর পর তাঁর প্রযোজনার ‘বুট পলিশ’ চলচ্চিত্রটিও কানে প্রশংসিত হয় এবং পাম দ’র প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

রাজ কাপুরের আরেক আলোচিত সিনেমা ‘জাগতে রাহো’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও সম্মান অর্জন করে। ১৯৫৬ সালে চলচ্চিত্রটি কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ক্রিস্টাল গ্লোব পুরস্কার জেতে।

শুধু অভিনেতা নন, ছিলেন সিনেমার নির্মাতা
রাজ কাপুরকে অন্য অনেক সফল তারকা–সন্তান থেকে আলাদা করে তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়। তিনি ছিলেন অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক—তিন ভূমিকাতেই সফল।
অভিনেতা হিসেবে রাজ কাপুর কাজ করেছেন প্রায় ৬৩টি সিনেমায়। এর মধ্যে বহু সিনেমাই বক্স অফিসে সফল হয়েছিল। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের কয়েকটি সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।

পরিচালক হিসেবেও তাঁর সাফল্যের হার ছিল ঈর্ষণীয়। ১০টি সিনেমা পরিচালনা করে এর বেশির ভাগই বাণিজ্যিকভাবে সফল করেছিলেন তিনি।

‘সঙ্গম’ দিয়ে ভারতীয় সিনেমায় বিদেশে শুটিংয়ের নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়ার কৃতিত্বও তাঁর নামে লেখা হয়। অন্যদিকে ‘মেরা নাম জোকার’ ছিল তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর একটি।

রাজ কাপুরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল নতুন মুখ তুলে আনা। তাঁর হাত ধরেই হিন্দি সিনেমায় সুযোগ পেয়েছেন বা বিশেষভাবে পরিচিতি পেয়েছেন অনেক শিল্পী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নিম্মি, তাঁর ছেলে ঋষি কাপুর, ডিম্পল কাপাডিয়া ও জিনাত আমনের মতো তারকা।

রাশিয়ায় ভারতীয় সিনেমার দরজা খুলে দিয়েছিলেন
আজ ভারতীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বক্স অফিস আয় এখন বড় আলোচনার বিষয়। কিন্তু ভারতীয় সিনেমার বিদেশি বাজার তৈরির প্রাথমিক ইতিহাসে রাজ কাপুরের নাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

‘আওয়ারা’ ও ‘জাগতে রাহো’র মতো সিনেমার মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিশাল দর্শক তৈরি হয়েছিল। রাজ কাপুরের জনপ্রিয়তার সুবাদে তাঁর পরবর্তী সিনেমাগুলোও সেখানে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে দেখা হতো।
এভাবেই ভারতীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক দর্শক তৈরির ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে