একসময় পাটনার একটি হোটেলে কর্মীদের জন্য নির্ধারিত পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকতেন পঙ্কজ ত্রিপাঠি। রান্নাঘরে কাজ করতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বহু বছর পর সেই হোটেলেই ফিরেছিলেন অতিথি হয়ে। এবার তাঁর জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল প্রধান ফটক। স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন হোটেলের মহাব্যবস্থাপক। মুহূর্তটি আবেগপ্রবণ করেছিল অভিনেতাকে। তাঁর মনে হয়েছিল, কঠোর পরিশ্রম করলে জীবনে সত্যিই অনেক অসম্ভব সম্ভব হয়।
পাটনার হোটেলের সেই কর্মী এখন হিন্দি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। বড় পর্দা থেকে ওটিটি—সবখানেই তাঁর সাবলীল উপস্থিতি। কোনো ছবিতে ছোট্ট চরিত্রে এলেও আলাদা করে মনে থাকেন। আজ ৫ সেপ্টেম্বর পঙ্কজ ত্রিপাঠির জন্মদিন। ৫০ বছরে পা দিলেন ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’, ‘নিউটন’, ‘মাসান’, ‘মিমি’, ‘স্ত্রী’ ও ‘মির্জাপুর’-এর এই অভিনেতা। জন্মদিনের ঠিক আগের দিন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তাঁর আলোচিত সিনেমা ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’।
ট্রাক্টর এলে হয়তো অভিনেতা হতেন না
পঙ্কজ ত্রিপাঠির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। স্বপ্নটি অভিনয় নিয়ে ছিল না, ছিল একটি ট্রাক্টর ঘিরে। কৃষক পরিবারের সন্তান পঙ্কজ তখন ভেবেছিলেন, বাবা একদিন বাড়িতে একটি ট্রাক্টর কিনে আনবেন। তিনি পড়াশোনা শেষ করে সেটি দিয়ে খেতখামারের কাজ করবেন। গ্রামের চেনা পরিবেশেই কেটে যাবে তাঁর জীবন।
কিন্তু ট্রাক্টর কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না পরিবারটির। অনেক চেষ্টা করেও ছেলের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি বাবা। পঙ্কজের তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল। কে জানত, না পাওয়া সেই ট্রাক্টরই একদিন তাঁকে হিন্দি সিনেমার পথে নিয়ে যাবে!
খেতখামারের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বাবা ছেলেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বললেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, পঙ্কজ চিকিৎসক হবেন। নিজের উপার্জনে একদিন ট্রাক্টর কিনে অপূর্ণ স্বপ্নও পূরণ করবেন। বাবার কথা মেনে বিহারের গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম ছেড়ে পাটনায় পাড়ি জমান পঙ্কজ। উদ্দেশ্য ছিল, পড়াশোনা করে চিকিৎসক হওয়া।
কিন্তু পাটনায় এসে জীবনের হিসাবই বদলে গেল। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলনে যুক্ত হলেন। একসময় থিয়েটারের সঙ্গেও পরিচয় হলো। মঞ্চ, মহড়া ও অভিনয়ের জগৎ তাঁকে এমনভাবে টানল যে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেল। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক হতে পারেননি, অভিনেতা হয়েছেন। পরে এক অনুষ্ঠানে মজা করে বলেছিলেন, ‘ডক্টর’ হতে এসে তিনি ‘অ্যাক্টর’ হয়ে গেছেন।
যে ট্রাক্টর না পাওয়ায় একসময় কষ্ট পেয়েছিলেন, বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সেটিকেই আশীর্বাদ বলে মনে হয়েছে পঙ্কজের। তাঁর উপলব্ধি, সব অপূর্ণতা শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ডেকে আনে না; কোনো কোনো না-পাওয়া মানুষকে তার আসল গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেয়।
বাবা যদি সেদিন ট্রাক্টরটি কিনতে পারতেন, তাহলে হয়তো পঙ্কজ গ্রামেই থেকে যেতেন। খেতখামারে মন দিতেন, পাটনায় যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। থিয়েটারের সঙ্গে পরিচয় ঘটত কি না, সেটিও অনিশ্চিত। আর হিন্দি সিনেমা হয়তো পেত না ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’-এর সুলতান কুরেশি, ‘মির্জাপুর’-এর কালিন ভাইয়া কিংবা ‘স্ত্রী’র রুদ্রকে। যে ট্রাক্টরটি না পাওয়াকে একসময় ব্যর্থতা মনে হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর সামনে খুলে দিয়েছিল সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় দরজা।
দিনে হোটেল, রাতে থিয়েটার
পাটনায় পড়াশোনার সময়ই অভিনয়ের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয় পঙ্কজ ত্রিপাঠির। নাটকের মহড়া আর মঞ্চে অভিনয়ের টানে স্নাতকের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দেন তিনি। কিন্তু শুধু থিয়েটার করে জীবন চালানো সম্ভব ছিল না। তাই হোটেল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দুই বছরের একটি কোর্স করেন। প্রশিক্ষণ শেষে পাটনার একটি হোটেলে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে চাকরি নেন।
চাকরির সময়সূচিও ঠিক করতেন থিয়েটারের মহড়ার সঙ্গে মিলিয়ে। কখনো দিনের বেলা হোটেলের রান্নাঘরে কাজ করে সন্ধ্যার পর চলে যেতেন নাটকের দলে। আবার দিনে মহড়া থাকলে রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত রান্নাঘর পরিষ্কারের দায়িত্ব নিতেন। টানা রাত কাজ করার পরও থিয়েটারে যেতে তাঁর ক্লান্তি লাগত না। তবে চাকরির চেয়ে অভিনয়েই বেশি মন পড়ে থাকায় হোটেলের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের বকুনিও শুনতে হতো। তাঁরা বলতেন, কাজে তাঁর মন নেই, এভাবে তাঁকে দিয়ে হবে না। কথাগুলো ভুল ছিল না—পঙ্কজের মন পড়ে থাকত মঞ্চেই।
চাকরি ও থিয়েটার—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে প্রায় দুই বছর কাটানোর পর পঙ্কজ বুঝতে পারেন, অভিনয়কেই পেশা করতে চান। সেই লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিতে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় ভর্তির খোঁজ নেন। তখন জানতে পারেন, সেখানে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক। তাঁর হোটেল ব্যবস্থাপনার সনদটি স্নাতক সমমানের ছিল না; অন্যদিকে অভিনয়ের টানে আগের পড়াশোনাও অসমাপ্ত রেখেছিলেন।
অভিনয় শেখার পথ খুলতেই আবার শিক্ষাজীবনে ফেরেন পঙ্কজ। তিন বছর সময় নিয়ে স্নাতক শেষ করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেও প্রথমবার ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় সুযোগ পাননি। পরের বছর আবার আবেদন করেন, সেবারও প্রত্যাখ্যাত হন। দুই দফা ব্যর্থতার পরও হাল ছাড়েননি। নিজেকে আরও প্রস্তুত করে তৃতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং অবশেষে সুযোগ পান ভারতের মর্যাদাপূর্ণ এই নাট্যবিদ্যালয়ে।
ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় প্রশিক্ষণ পঙ্কজের অভিনয়ভাবনা ও প্রস্তুতির ধরন বদলে দেয়। সেখানে পড়াশোনা শেষ করেন ২০০৪ সালে। একই বছর স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠিকে সঙ্গে নিয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সঙ্গে ছিল না চলচ্চিত্রজগতের কোনো পরিচিতি কিংবা প্রভাবশালী কারও আশ্বাস—সম্বল ছিল থিয়েটারের অভিজ্ঞতা, অভিনয়ের প্রশিক্ষণ আর বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।
কতবার আর ‘নট ফিট’ বলবে
মুম্বাইয়ে এসে পঙ্কজের জন্য কেউ অপেক্ষা করছিলেন না। তখন ই-মেইলে ছবি পাঠিয়ে অডিশন দেওয়ার সুযোগও ছিল না। নিজের ছবি ছাপিয়ে এক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় থেকে আরেকটিতে ঘুরতেন। কোথাও তাঁর ছবি দেখা হতো না, কোথাও ভেতরেই ঢুকতে দেওয়া হতো না।
বিজ্ঞাপনচিত্রের অডিশনে একসঙ্গে শতাধিক শিল্পী দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেখান থেকে একজন বা দুজনকে ডেকে নিয়ে বাকিদের বলা হতো, ‘নট ফিট’। কথাটি এতবার শুনেছিলেন যে একসময় বাড়ি ফিরতেও ভয় লাগত তাঁর। রসিকতা করে পঙ্কজ বলেছিলেন, তাঁর মনে হতো বাড়িতে ফিরলে স্ত্রীও হয়তো দরজা খুলে বলে দেবেন, ‘নট ফিট’।
তবে প্রত্যাখ্যান তাঁকে থামাতে পারেনি। নিজেকেই প্রশ্ন করতেন, একজন মানুষকে আর কতবার প্রত্যাখ্যান করা যায়? কোনো একদিন তো তাঁর চেষ্টা ও একাগ্রতা কারও চোখে পড়বেই।
শুরুতে ছোটখাটো চরিত্র মিলত। টেলিভিশন প্রযোজনায় বারবার পুলিশের চরিত্রে ডাক পেতেন। চরিত্র যত ছোটই হোক, নিষ্ঠা নিয়ে অভিনয় করতেন। একসময় ভেবেছিলেন, নিজের জন্য পুলিশের একটি পোশাকই বানিয়ে রাখবেন। ডাক এলেই সেটি নিয়ে হাজির হবেন।
অবশেষে অনুরাগ কাশ্যপের নজরে পড়েন। ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’-এ সুলতান কুরেশির চরিত্র বদলে দেয় তাঁর ক্যারিয়ার। এরপর ‘মাসান’, ‘নিউটন’, ‘বরেলি কি বরফি’, ‘ফুকরে’, ‘লুডো’, ‘মিমি’, ‘ওএমজি ২’, ‘স্ত্রী’সহ একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ‘মির্জাপুর’-এর কালিন ভাইয়া তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে আরও বিস্তৃত দর্শকের কাছে।
পঙ্কজের ভাষায়, ‘মির্জাপুর’-এর আগে তিনি কেবল অভিনয়শিল্পী তালিকার একজন ছিলেন। সিরিজটি জনপ্রিয় হওয়ার পর তাঁকে ‘স্টার কাস্ট’ বলা শুরু হয়।
নিজের ছবি দেখেন না
দর্শক তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হলেও পঙ্কজ নিজের কাজ নিয়ে সহজে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। নিজের অভিনীত সিনেমা বা সিরিজ খুব একটা দেখেন না। দেখতে বসলেই ভুলত্রুটি খুঁজতে শুরু করেন। অন্যের প্রশংসায় দ্রুত উচ্ছ্বসিত হন না, আবার সমালোচনায়ও ভেঙে পড়েন না।
নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক হিসেবে স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠির কথাও বলেন তিনি। অভিনয়ের ভুলত্রুটি নিয়ে মৃদুলা সরাসরি মতামত দেন।
শট দেওয়ার পর মনিটরেও নিজের অভিনয় দেখেন না পঙ্কজ। পরিচালক সন্তুষ্ট হলেই সেটিকে যথেষ্ট মনে করেন। পরিচালকের চোখ দেখেই বুঝে নেন শটটি ঠিক হয়েছে কি না। এমনকি মেকআপের পর আয়নায় নিজের চেহারা দেখার প্রয়োজনও বোধ করেন না।
পঙ্কজের বিশ্বাস, অভিনেতাকে চরিত্রের জন্য পড়াশোনা ও ভাবনাচিন্তা করতে হয়। তবে ক্যামেরা চালু হওয়ার পর পরিচালকের ওপর আস্থা রাখা জরুরি।
রুদ্র নয় অটল
একসময় পঙ্কজ এত বেশি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে একটি চরিত্র থেকে বের হয়ে আরেকটি চরিত্রে ঢুকতে সমস্যায় পড়তেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর জীবনীভিত্তিক ‘ম্যায় অটল হুঁ’র শুটিং শেষে সরাসরি ‘স্ত্রী ২’-এর সেটে গিয়েছিলেন।
প্রথম শটের পর পরিচালক অমর কৌশিক তাঁকে জানান, পর্দায় তাঁকে ‘স্ত্রী’র রুদ্র নয়, অটল বিহারি বাজপেয়ীর মতো লাগছে। পঙ্কজ বুঝতে পারেন, আগের চরিত্রটি তখনো তাঁর ভেতর থেকে যায়নি। হোটেলে ফিরে কয়েক দিন বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার শুটিংয়ে ফেরেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই পঙ্কজের উপলব্ধি, একটি চরিত্র শেষ করার পর নতুন চরিত্রে যাওয়ার আগে একজন অভিনেতার অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিনের বিরতি প্রয়োজন।
যে থিয়েটার তাঁকে মানুষ করেছে
সিনেমা ও ওটিটির ব্যস্ততায় দীর্ঘদিন মঞ্চে অভিনয় করা হয়নি পঙ্কজের। গীতিনাট্য ‘লা-ইলাজ’ দিয়ে ১৫ বছর পর মঞ্চে ফিরেছেন তিনি। নাটকটি প্রযোজনা করেছেন তাঁর স্ত্রী মৃদুলা। অভিনয়ে অভিষেক হয়েছে তাঁদের মেয়ে আশি ত্রিপাঠিরও। কিছু দিন আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন মেয়ের পথ সহজ করে দিতে চান না। তাঁর মতে, ‘পঙ্কজ ত্রিপাঠির মেয়ে’ পরিচয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, আশিকে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হবে। অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ নাকি লেখালেখি—মেয়ে কোন পথে যাবে, সেই সিদ্ধান্তও তার নিজের।
‘লা-ইলাজ’-এর সঙ্গে যুক্ত অভিনয়শিল্পীদের বড় অংশ ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার প্রাক্তনী। তাঁদের অনেকেই মুম্বাইয়ে নিজের জায়গা তৈরির লড়াই করছেন। নাটকের মাধ্যমে তাঁরা যেন নিয়মিত কাজ ও পারিশ্রমিক পান, সেই সুযোগ তৈরি করতে চেয়েছেন পঙ্কজ ও মৃদুলা।
পঙ্কজের কাছে থিয়েটার শুধু অভিনয়ের জায়গা নয়। তিনি মনে করেন, থিয়েটার তাঁকে অভিনেতা করার পাশাপাশি আরও ভালো মানুষ হতে শিখিয়েছে।
হোটেলের রান্নাঘর, গভীর রাতের মহড়া, ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পরপর প্রত্যাখ্যান, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বন্ধ দরজা—সব পেরিয়ে আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন পঙ্কজ। অথচ এখনো নিজেকে তারকা বলতে নারাজ। তিনি অভিনেতা, নাকি তারকা—সেই সিদ্ধান্ত দর্শকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন।