ভারতের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ
ভারতের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ

‘ধুরন্ধর’–ঝড়ে ওলট–পালট, ভারতের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা কোনগুলো

ভারতের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাফল সিনেমার তালিকা কয়েক বছর ধরেই অপরিবর্তিত ছিল। বদল ঘটেছে গত বছর, আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’ মুক্তির পর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তির পর সিনেমাটি ১ হাজার কোটি রুপির বেশি ব্যবসা করে, ফলে বদল এসেছে ভারতের সবচেয়ে বেশি আয় করা শীর্ষ ১০ সিনেমার তালিকাতেও।

‘অ্যানিমেল’

‘অ্যানিমেল’ সিনেমায় রণবীর কাপুর। ছবি: আইএমডিবি

তালিকায় ১০–এ রয়েছে ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া বহুল আলোচিত–সমালোচিত সিনেমাটি। সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার সিনেমাটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন রণবীর কাপুর। এ ছাড়া দেখা গেছে অনিল কাপুর, রাশমিকা মান্দানা, তৃপ্তি দিমরিকে। সিনেমাটি বক্স অফিসে সাফল্য পেলেও নির্মাতার নারীবিদ্বেষী দর্শন সমালোচিত হয়েছে। তবে এই সিনেমায় যে সহিংস অ্যাকশন দেখা গেছে, সেটা ভারত তো বটেই, বাংলাদেশের সিনেমাকেও প্রভাবিত করেছে। অ্যাকশন-থ্রিলার সিনেমাটি একজন বাবার প্রতি ছেলের অন্ধ ভালোবাসা এবং প্রতিশোধের গল্প নিয়ে। রণবিজয় সিং (রণবীর) তার ব্যবসায়ী বাবা বলবীর সিংয়ের (অনিল কাপুর) ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে। বাবার ওপর হামলা হলে সে হিংস্র হয়ে প্রতিশোধ নিতে নেমে পড়ে, যা পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা ও সহিংসতার দিকে মোড় নেয়। ছবিটির আয় ৯১৭ কোটি রুপি।

‘কল্কি ২৮৯৮এডি’

‘কল্কি ২৮৯৮এডি’ সিনেমার পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

১ হাজার কোটি ৪২ লাখ রুপি আয় নিয়ে তালিকায় ৯–এ আছে নাগ অশ্বিনের পৌরাণিক সায়েন্স ফিকশন সিনেমাটি। তারকাবহুল এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন কমল হাসান, অমিতাভ বচ্চন, প্রভাস, দীপিকা পাড়ুকোন, শোভিতা, দিশা পাটানি। মহাভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত দিয়ে কাহিনি শুরু হয়ে (ধরা হয়, সে সময় থেকেই কলি যুগের সূচনা), তারপর ছবি চলে যায় ২৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে। ওই সময়ের রুক্ষ–শুষ্ক শহর কাশী এই ছবির পটভূমি। যেখানে স্বঘোষিত ঈশ্বর রাজা সুপ্রিম ইয়াসকিন (কমল হাসান) একটি অত্যাধুনিক ‘কমপ্লেক্স’-এ থাকেন। এই কমপ্লেক্সে মানুষ এবং রোবটের অত্যাধুনিক মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা। রাজা সুপ্রিম এক নতুন পৃথিবী তৈরি করতে চান, যেখানে বিজ্ঞান এবং পুরাণ মিলেমিশে একাকার। রাজার নির্দেশেই এই শহরের প্রতিটি প্রাণের স্পন্দন ওঠানামা করে। রাজার নিয়মেই সবাই এখানে জীবনধারণ করে। ওই কমপ্লেক্সের গবেষণাগারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুমতির (দীপিকা পাড়ুকোন) গর্ভে সন্তান আসে। এই সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অশ্বত্থমা (অমিতাভ বচ্চন) এবং ভৈরব (প্রভাস) লড়াই করে। এই রকমই এক নাটকীয় টানাপোড়েনে গল্প এগিয়ে যায় ক্লাইম্যাক্সের দিকে, যেখানে বিষ্ণুর দশম অবতার কল্কির আগমনবার্তাই হয়ে ওঠে এই ছবির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

চলতি বছরই সিনেমাটির সিকুয়েলের শুটিং শুরু হওয়ার কথা। তবে পারিশ্রমিক ও কর্মঘণ্টা নিয়ে মতবিরোধের জেরে সিনেমাটি থেকে বাদ পড়েছেন দীপিকা।

‘পাঠান’

‘পাঠান’ সিনেমায় জন ও শাহরুখ। আইএমডিবি

২০২৩ সালে সিদ্ধার্থ আনন্দর ছবিটি দিয়েই চার বছর পর পর্দায় ফিরেছিলেন শাহরুখ খান, আর দুর্দান্ত সাফল্য তাঁর প্রত্যাবর্তনও হয়েছিল স্মরণীয়। যশ রাজ ফিল্মসের স্পাই–ইউনিভার্সের সিনেমাটিতে আরও ছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন, জন আব্রাহাম। মুক্তির পর সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ১ হাজার কোটি ৫০ লাখ রুপি আয় করে। সিক্রেট এজেন্ট পাঠানকে (শাহরুখ খান) নিয়েই সিনেমাটির গল্প। হাজার চোট লাগলেও ফের ঘুরে দাঁড়ায়। হাতকড়া, ছুরি, কাঁচি, গুলি, গ্রেনেড, মিসাইল—কিছুই তাকে হারাতে পারে না। পাঠান যে মিশনেই যায়, কখনো ব্যর্থ হয় না। অন্যদিকে রুবিনা (দীপিকা পাড়ুকোন) শত্রুদেশের গুপ্তচর। দুজনের একটি মিশনে কাছাকাছি আসা, গল্পে একাধিক মোড়, বিশ্বাসঘাতকতা আর বুদ্ধিমান ভিলেনকে (জন আব্রাহাম) নিয়েই অ্যাকশন–থ্রিলার সিনেমাটির গল্প।

‘জওয়ান’

‘জওয়ান’–এ শাহরুখ খান। আইএমডিবি

তালিকার সাতে আছে শাহরুখ খান অভিনীত আরেকটি সিনেমা ‘জওয়ান’। অ্যাট লি পরিচালিত এ সিনেমাও মুক্তি পেয়েছিল ২০২৩ সালে। বক্স অফিসে ছবিটি এ পর্যন্ত আয় করেছে ১ হাজার ১৪৮ কোটি রুপি। ছবির গল্প একজন ‘জওয়ান’-এর। যাঁর জীবন কিছু ভুল সরকারি নিয়মের জন্য নষ্ট হয়ে যায়। এরপর তাঁর ছেলে, সেই সরকারি নিয়মকে কাজে লাগিয়েই কীভাবে সরকারি নিয়মের বদল ঘটায়, সমাজের ভুলগুলোকে শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করে, সেটা নিয়েই এগিয়ে যায় ছবির গল্প। এই ছবি গরিবদের অধিকারের গল্প বলে, কৃষক আত্মহত্যার মতো ঘটনার প্রতিবাদ করে, রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবনতির কথা তুলে ধরে ও ভোটের মাধ্যমে সঠিক নেতা বা নেত্রীকে বেছে নেওয়ার বার্তা দেয়। এই ছবির গল্প খুব একটা চমকপ্রদ না হলেও, যে মোড়কে তা তুলে ধরা হয়েছে, তা অবশ্যই চিত্তাকর্ষক—এমনটাই মত দিয়েছিলেন সমালোচকেরা।

‘কেজিএফ : চ্যাপ্টার ২’

‘কেজিএফ : চ্যাপ্টার ২’–এ যশ। আইএমডিবি

আলোচিত ‘কেজিএফ’–এর দ্বিতীয় কিস্তিটি ২০২২ সালে মুক্তির পর প্রথমটির মতোই ঝড় তুলেছিল। প্রশান্ত নীলের সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন যশ। পর্দায় আরও দেখা গেছে সঞ্জয় দত্ত, রাভিনা ট্যান্ডন, প্রকাশ রাজকে। গরুড়াকে মারার পর কেজিএফ ওরফে কোলার গোল্ড ফিল্ডের অধিকার নিয়ে ফেলেছে রকি (যশ)। এতে ব্যবসার বাকি পার্টনাররা মোটেও খুশি নয়। তাতে অবশ্য কিছু আসে যায় না রকির। সোনার খনির সাম্রাজ্যে তার আধিপত্য বাড়তেই থাকে। নতুন সোনার খনিরও সন্ধান পায় সে। সোনার এই সাম্রাজ্যের অধিকার পেতেই আসে অধীরা (সঞ্জয় দত্ত)। এদিকে রকির সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে মরিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী রমিকা সেনও (রবিনা ট্যান্ডন)। এমন গল্প নিয়ে এগিয়েছে সিনেমাটির গল্প। এটির আয় ১ হাজার ২০০ কোটি রুপি।

‘আরআরআর’

‘আরআরআর’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

তালিকার পাঁচে রয়েছে এসএস রাজামৌলির বহুল আলোচিত ‘আরআরআর’। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ঐতিহাসিক অ্যাকশন ড্রামা সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন এনটিআর জুনিয়র, রাম চরণ, অজয় দেবগন, আলিয়া ভাট, শ্রিয়া স্মরণ। ৫৫০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি বক্স অফিসে ১ হাজার ৩০০ কোটি রুপি আয় করে। এ ছবির গান ‘নাটু নাটু’ জিতেছিল অস্কারও। সিনেমাটির পটভূমি ১৯২০-এর দিল্লি। রামারাজুকে একদিকে যেমন ব্রিটিশ পুলিশ সম্মান করে, তেমনি ভয়ও পায়। আবার সেই রামারাজুকেই নেটিভ হওয়ার জন্য মাঝেমধ্যে হেয়ও করা হয়। অন্যদিকে গোন্ড সম্প্রদায়ের সহজ–সরল ভীমের দুই বাহুতে ভীমের মতোই বল। তবে সে যখন–তখন তা ব্যবহার করে না। শহরে আসে মাল্লীকে লেডি স্কটের হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য।

‘ধুরন্ধর’

‘ধুরন্ধর ২’ সিনেমার ট্রেলারে রণবীর। এক্স থেকে

তালিকার চারে রয়েছে গত বছর ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়া আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’। বক্স অফিস থেকে ছবিটি আয় করেছে ১ হাজার ৩৫০ কোটি রুপি। ছবির গল্প ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার একটি গোপন অপারেশন ঘিরে। একের পর এক সশস্ত্র হামলার পর ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ঠিক করে—সন্ত্রাসের মূল উৎপাটন করতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে এজেন্টকে পাঠাবে। সে পরিকল্পনায় করাচির লিয়ারিতে হাজির হয় হামজা (রণবীর সিং); এরপর কী হয়, তা নিয়েই সিনেমাটির গল্প। এবারের ঈদের সিনেমাটির দ্বিতীয় কিস্তি মুক্তি পাবে। তারকাবহুল এ সিনেমায় রণবীর ছাড়াও আছেন অক্ষয় খান্না, আর মাধবন, সঞ্জয় দত্ত, অর্জুন রামপাল, সারা অর্জুন প্রমুখ।

‘পুষ্পা ২: দ্য রুল’

‘পুষ্পা ২’–এ আল্লু অর্জুন ও রাশমিকা মান্দানা। এক্স থেকে

দক্ষিণি নির্মাতা সুকুমার ‘পুষ্পা’ দিয়ে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিনেমাটির সিকুয়েল মুক্তির পরও সে ধারা অব্যাহত থাকে। এটি বক্স অফিসে আয় করে ১ হাজার ৬৪২ কোটি রুপি। ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন আল্লু অর্জুন, রাশমিকা মান্দানা, ফাহাদ ফাসিল। এই ছবিতে পুষ্পা লাল চন্দনের বিশাল বড় স্মাগলার। চন্দন ব্যবসার সিন্ডিকেটের প্রধানও এই পুষ্পাই। কিন্তু মানুষ যত সফল হলো, ততই বাড়ে তার শত্রুর সংখ্যা। বউয়ের কথা মেনে চলে পুষ্পা। সিনেমার গল্পে বউ যখন পুষ্পাকে বলে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবে, তখন যেন ছবি তুলে নেয়। এদিকে একজন স্মাগলারের সঙ্গে মোটেই ছবি তুলতে রাজি নয় মুখ্যমন্ত্রী। আর তাতেই চটে গিয়ে একবারে মুখ্যমন্ত্রী বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করে পুষ্পা। এর জন্যই ৫ হাজার কোটি টাকার লাল চন্দন বিদেশে পাচার করতে হবে পুষ্পাকে। এ কাজে আদৌ কি সে সফল হবে, কী হবে, আর পুষ্পার সবচেয়ে বড় শত্রু পুলিশ অফিসার ভানওয়ার সিং শেখাওয়াত কী করবে—এটা নিয়েই সিনেমাটির গল্প।

‘বাহুবলী ২: দ্য কনক্লুশন’

‘বাহুবলী-২: দ্য কনক্লুশন’ ছবির পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

অমরেন্দ্র বাহুবলীর মৃত্যুরহস্য এবং তার পুত্র মহেন্দ্র বাহুবলীর প্রতিশোধের গল্প নিয়ে এগিয়েছে সিনেমাটি। ভল্লালদেব ও তার বাবার ষড়যন্ত্রে কাটপ্পার হাতে অমরেন্দ্র বাহুবলীর মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে মহেন্দ্র কর্তৃক মাহিস্মতী রাজ্যে নিজের সিংহাসন পুনরুদ্ধারের মহাকাব্যিক কাহিনি এখানে দেখা হয়েছে। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া এস এস রাজামৌলির ‘বাহুবলী’র সিকুয়েল এটি। মুক্তির পর সাধারণ থেকে সমালোচক—সবার কাছেই ব্যাপক সমাদৃত হয়। তারকাবহুল এ সিনেমায় অভিনয় করেন প্রভাস, রানা দুগ্গাবতী, আনুশকা শেঠি, তামান্না ভাটিয়া, সত্যরাজ ও রম্যা কৃষ্ণন। আয়ের বিচারে ভারতের সর্বকালেরা সেরা সিনেমার তালিকার দুইয়ে আছে এটি। ছবিটির আয় ১ হাজার ৮১০ কোটি রুপি।

‘দঙ্গল’

‘দঙ্গল’ সিনেমার পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

২০১৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল নীতেশ তিওয়ারির সিনেমাটি। তবে ১০ বছরেও আমির খানের সিনেমাটির রেকর্ড ভাঙতে পারেনি অন্য কোনো তারকার সিনেমাটি। ভারত ছাড়াও বিদেশে সিনেমাটি ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। এটির আয় ১ হাজার ৯৬৮ কোটি রুপি। সিনেমাটিতে অভিনয় করেই বলিউডে পরিচিতি পান দুই অভিনেত্রী ফাতিমা সানা শেখ ও সানিয়া মালহোত্রা। সিনেমাটি হরিয়ানার গ্রামীণ পটভূমিতে তৈরি। মহাবীর সিং ফোগাট (আমির খান) নিজে একজন কুস্তিগির হলেও দেশের জন্য সোনা জিততে পারেননি। সেই স্বপ্ন তিনি তাঁর মেয়েদের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। রক্ষণশীল সমাজ ও অভাবকে জয় করে তিনি গীতা ও ববিতাকে কুস্তির ময়দানে নিয়ে আসেন। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি দর্শক–সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

ইন্ডিয়া টুডে, আইএমডিবি, বক্স অফিস মোজো অবলম্বনে