
দক্ষিণি সিনেমায় গ্ল্যামার, মেকআপ আর তারকাখ্যাতির ঝলমলে ভিড়ের মধ্যে তিনি যেন একেবারেই আলাদা। ভারী মেকআপ নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত প্রদর্শনীও নয়—নিজের স্বাভাবিক উপস্থিতি আর অভিনয়দক্ষতাই তাঁকে এনে দিয়েছে কোটি দর্শকের ভালোবাসা। তিনি সাই পল্লবী। আজ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ার।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থেকে অভিনয়ে
১৯৯২ সালের ৯ মে ভারতের তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুর জেলার কোটাগিরিতে জন্ম সাই পল্লবীর। পুরো নাম সাই পল্লবী সেন্থামারাই কান্নান। তাঁর পরিবার মূলত বাদাগা সম্প্রদায়ের। বাবা সেন্থামারাই কান্নান একজন কাস্টমস কর্মকর্তা এবং মা রাধা কান্নান গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে কখনোই ভাবেননি যে অভিনয়কে পেশা বানাবেন।
স্কুলজীবনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ করতেন তিনি। পরে জনপ্রিয় নাচের রিয়েলিটি শোতেও অংশ নেন। কিন্তু পরিবার চেয়েছিল মেয়েকে চিকিৎসক বানাতে। সেই ইচ্ছা পূরণেই জর্জিয়ার তিবলিসি স্টেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন সাই পল্লবী। সেখানে মেডিসিনে পড়াশোনা শেষও করেন। যদিও চিকিৎসক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করা হয়নি তাঁর।
এক গানেই রাতারাতি তারকা
সাই পল্লবীর ভাগ্য বদলে যায় ২০১৫ সালে। মালয়ালম পরিচালক আল আলফন্স পুথ্রেন তাঁর ‘প্রেমাম’ সিনেমায় ‘মালার’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন। সিনেমাটিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল খুব স্বাভাবিক, অনাড়ম্বর। আর সেখানেই দর্শক খুঁজে পান নতুন এক নায়িকাকে।
বিশেষ করে ‘মালারে’ গানটি মুক্তির পর দক্ষিণ ভারতে যেন সাই পল্লবী-ঝড় শুরু হয়। কোঁকড়ানো চুল, মুখভর্তি ব্রণ, একেবারে স্বাভাবিক চেহারা—বলিউড বা দক্ষিণি সিনেমার প্রচলিত নায়িকাদের ছাঁচ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ভিন্নতাই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
‘প্রেমাম’ শুধু ব্যবসাসফল হয়নি, সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় দক্ষিণি চলচ্চিত্রেও পরিণত হয়। আর প্রথম সিনেমাতেই সাই পল্লবী জিতে নেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।
সৌন্দর্যবিষয়ক পণ্যের বিজ্ঞাপন নিয়েও আলোচনায় এসেছিলেন সাই পল্লবী। ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ফর্সা হওয়ার ক্রিমের বিজ্ঞাপনের জন্য কয়েক কোটি রুপির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ, হিসেবে সাই পল্লবী বলেছিলেন, মানুষকে গায়ের রং নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগানোর পক্ষে নন তিনি। এই অবস্থান তাঁকে অন্যদের থেকে আরও আলাদা করেছে।
নাচে অনন্য, অভিনয়ে শক্তিশালী
সাই পল্লবীর সবচেয়ে বড় শক্তির একটি তাঁর নাচ। দক্ষিণি সিনেমায় নাচের জন্য আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। অনেকেই তাঁকে বর্তমান সময়ের সেরা নারী পারফরমারদের একজন মনে করেন।
‘রাউডি বেবি’ গানটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক। ধানুশের সঙ্গে তাঁর দুর্দান্ত নাচ কোটি কোটি দর্শককে মুগ্ধ করে। ইউটিউবে গানটি দক্ষিণি সিনেমার অন্যতম বেশি দেখা গানের তালিকায় জায়গা করে নেয়।
তবে শুধু নাচ নয়, অভিনয়েও তিনি নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন। ‘ফিদা’, ‘লাভ স্টোরি’, ‘শ্যাম সিংহ রয়’ বা ‘গাগি’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে সমালোচকদের কাছেও।
বিশেষ করে ‘গার্গি’ সিনেমায় এক সাধারণ মেয়ের সংগ্রামের গল্পে তাঁর অভিনয় নতুন করে প্রমাণ করে, তিনি শুধু বাণিজ্যিক নায়িকা নন—শক্তিশালী অভিনেত্রীও।
‘নো কিসিং পলিসি’ নিয়ে আলোচনায়
সাই পল্লবীকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি তাঁর ‘নো কিসিং পলিসি’। দক্ষিণি ইন্ডাস্ট্রিতে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য বা চুমুর দৃশ্য এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও সাই পল্লবী বরাবরই এসব দৃশ্য থেকে দূরে থেকেছেন।
শোনা যায়, ক্যারিয়ারের শুরুতেই তিনি নির্মাতাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি পর্দায় চুমুর দৃশ্যে অভিনয় করবেন না। শুধু তা–ই নয়, অতিরিক্ত গ্ল্যামারাস পোশাক বা অপ্রয়োজনীয় রোমান্টিক দৃশ্য নিয়েও তাঁর আপত্তি রয়েছে।
এ অবস্থানের কারণে কয়েকটি বড় বাজেটের সিনেমার সুযোগও নাকি হাতছাড়া হয়েছে তাঁর।
প্রসাধনী বিজ্ঞাপন ফিরিয়ে দেওয়া
সৌন্দর্যবিষয়ক পণ্যের বিজ্ঞাপন নিয়েও আলোচনায় এসেছিলেন সাই পল্লবী। ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ফর্সা হওয়ার ক্রিমের বিজ্ঞাপনের জন্য কয়েক কোটি রুপির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
কারণ, হিসেবে সাই পল্লবী বলেছিলেন, মানুষকে গায়ের রং নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগানোর পক্ষে নন তিনি। এই অবস্থান তাঁকে অন্যদের থেকে আরও আলাদা করেছে।
সাই পল্লবী এমন একজন অভিনেত্রী, যিনি রুপালি পর্দায় অভিনয়ের সময় প্রসাধন নেন না। প্রসাধন ব্যবহার করতে মোটেও পছন্দ করেন না। তিনি বাস্তবে যেমন, পর্দায়ও তেমনভাবেই হাজির হতে চান।
ব্যক্তিজীবন নিয়ে রহস্য
অন্যান্য তারকাদের মতো ব্যক্তিজীবন নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না সাই পল্লবী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তুলনামূলক কম সক্রিয় তিনি।
বিভিন্ন সময়ে তাঁর প্রেম নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও কখনোই প্রকাশ্যে সম্পর্কের কথা স্বীকার করেননি। বরং সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, পরিবার ও কাজ—এই দুই বিষয়কেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
তাঁর ছোট বোন পূজা কান্নানও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত।
কোটি টাকার সম্পদ
দক্ষিণি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী হওয়ায় সাই পল্লবীর পারিশ্রমিকও এখন বেশ বড় অঙ্কের। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি সিনেমার জন্য তিনি কয়েক কোটি রুপি পারিশ্রমিক নেন। বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন ব্র্যান্ড সহযোগিতা মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণও কয়েক শ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে ধারণা করা হয়। যদিও তিনি বিলাসী জীবনযাপনের চেয়ে সাধারণ জীবনই বেশি পছন্দ করেন।
বলিউডে অভিষেক
সম্প্রতি ‘এক দিন’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয়েছে সাই পল্লবীর। ছবিটিতে আমির খানের ছেলে জুনাইদ খানের সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন তিনি। তবে সিনেমার প্রচারে তাঁর হিন্দি নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সম্প্রতি হিন্দি বলতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রলের মুখে পড়েছেন সাই পল্লবী। আর সেই বিতর্কের মধ্যেই অভিনেত্রী নিজেই জানালেন, হয়তো ‘এক দিন’ সিনেমাটির জন্য তিনি ‘সঠিক পছন্দ’ ছিলেন না। তাঁর এই স্বীকারোক্তি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনে।
গত মাসে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘এক দিন কি মেহফিল’ নামে একটি বিশেষ সংগীতসন্ধ্যা। সিনেমা ‘এক দিন’-এর প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছবির অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতারা। সেখানে দর্শকদের সামনে কথা বলতে গিয়ে হিন্দিতে বারবার আটকে যান সাই পল্লবী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সেই ভিডিও। অনেকে তাঁর হিন্দি উচ্চারণ নিয়ে কটাক্ষ করেন।
সমালোচনার তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হন সাই পল্লবী নিজেই। সম্প্রতি আমির খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আমির খান টকিজ’-এর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক ভিডিওতে অভিনেতা জুনাইদের সঙ্গে কথা বলেন সাই পল্লবী। সেখানে তিনি জানান, ছবিটির প্রিমিয়ারে আমির খানের সঙ্গে তাঁর একটি খোলামেলা আলোচনা হয়েছিল।
সেই আলাপের প্রসঙ্গ টেনে সাই পল্লবী বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এই কাজ করার জন্য আমি উপযুক্ত ছিলাম। আমার মনে হয়, আমাকে ভুলভাবে কাস্ট করা হয়েছে। হয়তো এমন কাউকে নেওয়া উচিত ছিল, যার মধ্যে একটু বেশি ফ্ল্যামবয়েন্স আছে।’
তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কারণ, সাধারণত বড় অভিনেতারা নিজেদের সিনেমা নিয়ে প্রকাশ্যে এমন আত্মসমালোচনা খুব কমই করেন।
তবে সাই পল্লবী পরিষ্কার করেছেন, ছবিটি করার সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন একেবারে ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে।
সাই বলেন, ‘কোনো ছবির বাজেট বা আকার আমাকে আকৃষ্ট করে না। তখন আমার জীবনে আমি অনেক ভারী ও আবেগঘন সিনেমা করছিলাম। আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যা একটু হালকা ধরনের হবে। এমন কিছু, যার শুটিং শেষে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হবে না।’
সেই সময় ছবির চিত্রনাট্য হাতে পেয়েই তাঁর মনে হয়েছিল, সিনেমাটি অনেকটা ‘বিফোর সানরাইজ’-এর আবহ বহন করবে। আর সে কারণেই তিনি কাজটি করতে আগ্রহী হন।
সাই পল্লবীর ভাষায়, ‘আমি “বিফোর সানরাইজ” খুব পছন্দ করি। তাই ভেবেছিলাম, এই সিনেমাটিও হয়তো সেই ধরনের হবে।’ তবে তাঁর সহশিল্পী জুনাইদ খান অভিনেত্রীর সন্দেহ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এই চরিত্রের জন্য সাই পল্লবীই উপযুক্ত ছিলেন।
‘এক দিন’ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন সুনীল পান্ডে। এটি মূলত ২০১৬ সালের থাই চলচ্চিত্র ‘ওয়ান ডে’-এর রিমেক। গল্পে দেখা যায়, এক তরুণ নিজের সহকর্মীর প্রেমে পড়ে, কিন্তু কখনো মনের কথা বলতে পারে না। পরে এক দিনের জন্য তার সেই ইচ্ছা সত্যি হওয়ার সুযোগ আসে।
ছবিটি নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। অনেকেই মনে করেছেন, সাই পল্লবী নিজের চরিত্রে আন্তরিক ছিলেন, কিন্তু তাঁকে আরও শক্তিশালীভাবে ব্যবহার করা যেত।
দুই স্বপ্নের চরিত্রের অপেক্ষায়
অভিনেত্রী জানিয়েছেন, সব সময়ই নিত্যনতুন চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরার অপেক্ষায় থাকেন। তবে তাঁর চোখজুড়ে আছে দুটি ঐতিহাসিক চরিত্রের স্বপ্ন। পল্লবী বলেন, ‘আমি মাঝেমধ্যে নিজেকে নানা ধরনের চরিত্রে কল্পনা করি। কোনো ছবি দেখার সময় মনে হয়, ইশ্, এই চরিত্রটা আমি যদি করতে পারতাম।’ নিজের অভিনীত প্রিয় চরিত্রের প্রসঙ্গ টেনে এই দক্ষিণি রূপসী বলেন, ‘তামিল ছবি “শ্যাম সিংঘ রায়”-এ অভিনয় করার পর দারুণ অনুভূতি হয়েছিল। আমি চেয়েছিলাম ঐতিহাসিক কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে। এই ছবির মাধ্যমে সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। সব সময় নতুন নতুন চরিত্রের সন্ধানে থাকি।’
বলিউড ছবি দেখতে ভালোবাসেন সাই পল্লবী। বিশেষ করে দীপিকা পাড়ুকোনের ছবি তিনি পছন্দ করেন। এই দক্ষিণি অভিনেত্রী বলেন, ‘দীপিকা আমাকে খুবই অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর প্রায় সব চরিত্র আমার ভীষণ প্রিয়। আগামী দিনে দীপিকার “রানি পদ্মাবতী”, “মাস্তানি”র মতো চরিত্রে অভিনয় করতে চাই।’
সামনে সাই পল্লবীকে দেখা যাবে নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’ সিনেমায়। এতে সীতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে