
মুক্তির শুরুতেই বক্স অফিসে ঝড় তোলা ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’—সংক্ষেপে ‘ধুরন্ধর ২’। প্রথম চার দিনে রেকর্ড ভাঙা আয়, প্রেক্ষাগৃহে হাউসফুল শো—সব মিলিয়ে ছবিটি যেন একতরফা দাপট দেখাচ্ছিল। তবে সপ্তাহ গড়াতেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। আয় এখনো শক্ত অবস্থানে থাকলেও দৈনিক সংগ্রহে স্পষ্ট পতন দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে একাধিক বিতর্ক—প্রোপাগান্ডার অভিযোগ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, এমনকি নিষিদ্ধের দাবিতে মামলা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই বিতর্কই কি দর্শকের একাংশকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে?
শুরুতেই বিস্ফোরণ, তারপর নিম্নগতি
মুক্তির আগেই প্রিভিউ শো থেকে ৪৩ কোটি রুপি আয় করে আলোচনায় আসে ‘ধুরন্ধর ২’। প্রথম দিনেই ১০২ কোটি ৫৫ লাখ রুপি আয় করে ছবিটি, যা রণবীর সিংয়ের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ওপেনিং।
দ্বিতীয় দিন কিছুটা কমে ৮০ কোটি ৭২ লাখ হলেও তৃতীয় দিনেই আবার লাফিয়ে ওঠে ১১৩ কোটি। চতুর্থ দিনেও (রোববার) আয় দাঁড়ায় ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ রুপিতে, যা ছবিটির সর্বোচ্চ দৈনিক সংগ্রহ।
কিন্তু সপ্তাহের শুরুতেই ছবির আয়ে আসে স্বাভাবিক ‘উইকডে ড্রপ’।
পঞ্চম দিন: ৬৫ কোটি রুপি
ষষ্ঠ দিন: ৫৬ কোটি ৬০ লাখ রুপি
সপ্তম দিন: ৪৭ কোটি ৭০ লাখ রুপি
এই ধারাবাহিক পতনই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ট্রেড বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় ওপেনিংয়ের পর এমন পতন পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়, তবে বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করতে পারে।
৭ দিনে কোথায় দাঁড়াল আয়
স্যাকনিল্কের তথ্যানুযায়ী, মুক্তির সাত দিনে ভারতে ‘ধুরন্ধর ২’-এর মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৬২৫ কোটি ১৮ লাখ রুপি।
বিদেশেও ছবিটি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে—ওভারসিজ মার্কেটে আয় ২৬০ কোটির বেশি। সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী আয় ১০০০ কোটি রুপি ছাড়িয়ে গেছে মাত্র এক সপ্তাহেই।
এই অর্জনের মাধ্যমে—দ্রুততম সময়ে ১০০০ কোটি ক্লাবে প্রবেশের তালিকায় ‘পুষ্পা ২’-এর সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে ১০০০ কোটির ক্লাবে প্রবেশ করা পঞ্চম হিন্দি ছবি এবং দশম ভারতীয় ছবি হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘ধুরন্ধর ২’
ছবিটি মুক্তির পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। একাধিক দর্শক ও সমালোচকের অভিযোগ—
ছবিটি ভারতের ক্ষমতাসীনদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চেয়েছে।
কিছু দৃশ্যে রাজনৈতিক বার্তা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে
এ ছাড়া তামিলনাড়ুতে একটি গোষ্ঠী ছবিটি নিষিদ্ধের দাবিতে আদালতে মামলা করেছে।
শিখ ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশও অভিযোগ তুলেছে, ছবির নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্য তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে।
এসব বিতর্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দর্শকের একটি অংশ ছবিটি বয়কটের আহ্বান জানায়। যদিও অন্য একটি অংশ ঠিক উল্টোভাবে এই বিতর্ককেই ছবির প্রচারণা হিসেবে দেখছে।
‘নেগেটিভ বাজ’ নাকি ‘পাবলিসিটি বুস্ট’
ভারতীয় সিনেমা–বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বড় বাজেটের ছবির ক্ষেত্রে বিতর্ক অনেক সময় ‘ডাবল-এজড সোর্ড’ হিসেবে কাজ করে। প্রথম ধাপে এটি কৌতূহল তৈরি করে—দর্শক জানতে চায়, আসলে ছবিতে এমন কী আছে যে এত আলোচনা। ফলে মুক্তির প্রথম কয়েক দিনে টিকিট বিক্রি বাড়ে, ওপেনিং শক্তিশালী হয়। ‘ধুরন্ধর ২’-এর ক্ষেত্রেও সেটিই দেখা গেছে—প্রিভিউ শো ও প্রথম চার দিনে বিপুল দর্শকসমাগম মূলত প্রচারণা, তারকা-আকর্ষণ এবং বিতর্কজনিত কৌতূহলের ফল। তবে দ্বিতীয় ধাপে ছবির ভাগ্য নির্ধারণ করে দর্শকের মুখে মুখে প্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব রিভিউ, টুইটার ট্রেন্ড—সব মিলিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ‘ধুরন্ধর ২’-এর ক্ষেত্রে এখন সেই প্রতিক্রিয়া মিশ্র। একাংশ দর্শক ছবির অ্যাকশন, স্কেল ও নির্মাণশৈলী প্রশংসা করলেও, অন্য একটি অংশ বলছে—দ্বিতীয়ার্ধ তুলনামূলক দুর্বল, গল্পের গতি শ্লথ হয়ে যায় এবং কিছু দৃশ্যে রাজনৈতিক বার্তা অতিরিক্ত সরাসরি হয়ে গেছে।
এ ছাড়া মাল্টিপ্লেক্স দর্শক ও একক প্রেক্ষাগৃহের দর্শকের প্রতিক্রিয়াতেও পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। শহুরে মাল্টিপ্লেক্সে যেখানে কনটেন্ট নিয়ে সমালোচনা বেশি, সেখানে সাধারণ দর্শক এখনো ছবিটির অ্যাকশন ও স্টার পাওয়ারে সাড়া দিচ্ছে। ফলে মোট আয় বড় থাকলেও দৈনিক সংগ্রহে ধীরে ধীরে পতন দেখা যাচ্ছে।
বাণিজ্যিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রথম সপ্তাহে ‘প্রচার-নির্ভর দর্শক উপস্থিতি’ থাকলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে টিকে থাকতে হলে ‘কনটেন্টনির্ভর স্থায়িত্ব’ প্রয়োজন হয়। ‘ধুরন্ধর ২’-এর ক্ষেত্রে বিতর্ক প্রাথমিকভাবে দর্শক টেনেছে, কিন্তু এখন একই বিতর্কই একটি অংশকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই মিশ্র প্রতিক্রিয়ার প্রভাবই দৈনিক আয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা সামনে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
প্রতিযোগিতায় একতরফা লড়াই
একই সময়ে মুক্তি পাওয়া পবন কল্যাণের ‘উস্তাদ ভগত সিং’ বক্স অফিসে কার্যত টিকতেই পারছে না। মুক্তির শুরুতেই ছবিটি প্রত্যাশা তৈরি করলেও ওপেনিংয়ের পর সেই গতি ধরে রাখতে পারেনি। সপ্তম দিনে ছবিটির আয় নেমে এসেছে মাত্র ১ কোটি ১৪ লাখ রুপিতে। ফলে সাত দিনে মোট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৬৫ কোটি ৭৪ লাখ রুপি, যা বড় বাজেটের একটি তারকানির্ভর ছবির জন্য হতাশাজনক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ‘ধুরন্ধর ২’-এর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় পড়েই ছবিটি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। একদিকে যেখানে ‘ধুরন্ধর ২’ প্রথম সপ্তাহেই ৬০০ কোটির বেশি আয় করে বক্স অফিসে দাপট দেখাচ্ছে, সেখানে ‘উস্তাদ ভগত সিং’ সেই তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। মাল্টিপ্লেক্সের অধিকাংশ স্ক্রিন ‘ধুরন্ধর ২’ দখল করে নেওয়ায় ‘উস্তাদ ভগত সিং’ পর্যাপ্ত শো পাচ্ছে না, যা আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এ ছাড়া দর্শকপ্রবণতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। ‘ধুরন্ধর ২’-এর অ্যাকশন, স্কেল ও প্রচারণার জোরে দর্শকের আগ্রহ যেখানে বেশি, সেখানে ‘উস্তাদ ভগত সিং’ তেমন আলোচনায় আসতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি নিয়ে তেমন ইতিবাচক সাড়া না থাকাও এর দুর্বল পারফরম্যান্সের একটি কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বক্স অফিসের এই লড়াই এখন একতরফাই—সংখ্যার বিচারে যেমন, তেমনি দর্শক টানার ক্ষেত্রেও। ফলে আপাতত বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য ‘ধুরন্ধর ২’-এরই।
সামনে কী
দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে ‘ধুরন্ধর ২’। এখন বড় প্রশ্ন—আয় কি আরও কমবে? নাকি সপ্তাহান্তে আবার বাড়বে? সাধারণত বড় ছবির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সপ্তাহের উইকেন্ডে আবার কিছুটা উত্থান দেখা যায়। তবে চলমান বিতর্ক ও দর্শকের প্রতিক্রিয়া এই গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, আয় কিছুটা কমলেও ‘ধুরন্ধর ২’ এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু প্রোপাগান্ডা বিতর্ক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া—এই দুইয়ের প্রভাব সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে সামনে নতুন করে বেকায়দায় পড়তে পারে আলোচিত এ সিনেমাটি।