দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা নানি—ভক্তদের কাছে যিনি ‘ন্যাচারাল স্টার’ নামে পরিচিত—আজ তাঁর জন্মদিন। গত দেড় দশকে তেলেগু সিনেমায় যে কজন অভিনেতা ধারাবাহিক অভিনয় ও বক্স অফিস সাফল্যের মাধ্যমে নিজস্ব এক ঘরানা তৈরি করেছেন, নানি তাঁদের অন্যতম। ঝকঝকে অ্যাকশন-হিরোর ইমেজ নয়, বরং সাধারণ মানুষের গল্প, সহজ-সরল প্রেম আর বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়—এই ছিল তাঁর শক্তি। সেই শক্তিকেই পুঁজি করে তিনি আজ প্যান-ইন্ডিয়া পরিচিত মুখ।
সহকারী পরিচালক থেকে অভিনেতা
১৯৮৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন নানি (আসল নাম নবীন বাবু ঘান্তা)। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি টান। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে তিনি সরাসরি নায়ক হয়ে ওঠেননি। বরং শুরু করেছিলেন সহকারী পরিচালক হিসেবে। চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের দরজা তাঁর জন্য খোলা ছিল না। তারকাসন্তান নন, প্রভাবশালী পরিবারেরও নন। শুরুটা হয়েছিল ক্ল্যাপ বয় ও সহকারী পরিচালক হিসেবে। একসময় রেডিও জকি হিসেবেও ‘নন-স্টপ নানি’ নামে একটি শো সঞ্চালনা করতেন। তেলেগু ছবির সেটে কাজ করতে করতেই ক্যামেরার পেছনের ভাষা শিখেছেন, বুঝেছেন গল্প বলার কৌশল।
২০০৮ সালে পরিচালক মোহন কৃষ্ণ ইন্দ্রাগান্তির নজরে আসেন তিনি। প্রথম ছবি ‘আস্থা ছাম্মা’—রোমান্টিক-কমেডি ঘরানার এই ছবি বক্স অফিসে সফল হয় এবং নতুন মুখ নানিকে দর্শকের সামনে পরিচিত করে তোলে।
ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি
শুরুর সাফল্যের পরই বড় বাজেট বা অ্যাকশন-ঘরানার দিকে ঝুঁকেননি নানি। বরং বেছে নিয়েছেন গল্পনির্ভর ছবি। শুরুর কয়েক বছর ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। ‘রাইড’, ‘স্নেহিতুদা’, ‘ভীমিলি কাবাড্ডি জাত্তু’—একটির পর একটি ছবিতে কাজ করলেও বড় ব্রেক আসছিল না। ‘আলা মোদালাইন্দি’ তাঁকে তরুণ প্রজন্মের প্রিয় মুখে পরিণত করে। এরপরই আসে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ওঠা ছবি ‘ইগা’—পরিচালক এস এস রাজামৌলির কল্পবিজ্ঞানধর্মী এই ছবিতে নানির চরিত্রটি অল্প সময়ের হলেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকের মনে দাগ কাটে। ছবিটি হিন্দিতে ‘মাক্ষি’ নামে মুক্তি পায় এবং সর্বভারতীয় দর্শকের নজরে আসে নানি নামটি।
‘ন্যাচারাল স্টার’-এর ইমেজ
নানির অভিনয়ের প্রধান শক্তি তাঁর স্বাভাবিকতা। অতিরঞ্জন নয়, সংলাপের মিতব্যয়ী ব্যবহার, চোখের অভিব্যক্তিতে আবেগ—এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে ‘ন্যাচারাল স্টার’ উপাধি এনে দিয়েছে। ‘ভালে ভালে মাগাদিভয়’, ‘নিন্নু কোরি’, ‘এমসিএ’—একটির পর একটি ছবি তাঁকে ঘরের ছেলের মতো গ্রহণ করেছে দর্শক। ২০১৫ থেকে ২০১৭—এই সময়টায় তেলেগু রোমান্টিক কমেডির প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল নানির।
তবে ক্যারিয়ারে সব সময় সাফল্য আসেনি। কয়েকটি ছবি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। সেই সময় সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল—নানি কি একই ধরনের চরিত্রে আটকে যাচ্ছেন? এই সমালোচনাই তাঁকে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উৎসাহিত করে।
অন্ধকার, সহিংসতা আর নতুন নানি
২০১৯ সালে ‘জার্সি’-তে ৩৬ বছর বয়সী ব্যর্থ ক্রিকেটারের চরিত্রে অভিনয় করেন নানি। আবেগঘন, মেপে দেওয়া অভিনয়—সমালোচকদের মতে, এটি তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা কাজগুলোর একটি। এরপর একে একে তিনি ভেঙেছেন নিজের ইমেজ। ‘ভি’-তে সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে অভিনয় করেন।
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দশোরা’-তে একেবারেই ভিন্ন রূপে দেখা যায় তাঁকে। গ্রামীণ পটভূমিতে সহিংস, রুক্ষ চরিত্র—নানির এই বদল দর্শক-সমালোচক দু’পক্ষের কাছেই প্রশংসিত হয়। ছবিটি প্যান-ইন্ডিয়া পর্যায়ে সাফল্য পায়।
এরপর ‘হাই নান্না’-তে আবারও কোমল আবেগঘন চরিত্রে ফিরে আসেন। এই দুই বিপরীত ধারার সাফল্য প্রমাণ করে, তিনি শুধু ‘রোমান্টিক বয়’ নন; চরিত্রের গভীরতায় নিজেকে ভাঙতে-গড়তে পারেন।
প্রযোজক নানি
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও কাজ করছেন নানি। নতুন পরিচালকদের সুযোগ দেওয়া, গল্পভিত্তিক ছবিতে বিনিয়োগ—এই সাহসিকতা তাঁকে শিল্পী হিসেবে আরও পরিণত করেছে। দক্ষিণের মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির ভিড়ে তিনি কনটেন্ট–নির্ভর সিনেমার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ২০১৮ সালে নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘ওয়াল পোস্টার সিনেমা’ গড়ে তোলেন। তাঁর প্রযোজিত ‘অ্যাওয়ে!’ ভারতের জাতীয় পুরস্কার জেতে। পরে ‘হিট’ ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে একের পর এক আলোচিত সিনেমা উপহার দিয়েছেন।
ব্যক্তিজীবন ও স্থিরতা
ব্যক্তিজীবনে নানি বরাবরই সংযত। স্ত্রী অঞ্জনা ও এক সন্তানকে নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার। বিতর্ক এড়িয়ে চলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমিত উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তিনি তারকাখ্যাতির ঝলকানি থেকে খানিক দূরেই থাকতে চান। এই স্থিরতাই হয়তো তাঁকে দীর্ঘ দৌড়ে এগিয়ে রাখছে। কারণ, তিনি জানেন—তারকাখ্যাতি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা টিকে থাকে বিশ্বাসযোগ্যতায়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে