
২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া আশুতোষ গোয়াড়িকরের ‘লগান’ শুধু একটি সিনেমা নয়, ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ক্রিকেট, দেশপ্রেম, প্রেম আর সংগ্রামের এক অনন্য মিশেলে নির্মিত ছবিটি আজও দর্শকদের আবেগের জায়গা দখল করে আছে। ছবির ক্লাইম্যাক্সে চম্পানের দরিদ্র কৃষকেরা অসম্ভবকে সম্ভব করে ব্রিটিশদের হারিয়ে দেয়। সেই দৃশ্য দেখে সিনেমা হলে দর্শকদের হাততালি, শিস আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। কিন্তু অনেকেই জানেন না, ‘লাগান’-এর শুটিং চলাকালে সত্যিই একদিন ভারতীয় ও ব্রিটিশ অভিনেতাদের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ হয়েছিল। আর সেই ম্যাচে সিনেমার গল্পের সম্পূর্ণ উল্টো ফল হয়েছিল—অনায়াসেই জিতে গিয়েছিল ব্রিটিশ দল। ২০০১ সালের ১৫ জুন মুক্তি পায় ‘লগান’। সিনেমাটির মুক্তির ২৫ বছর উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক অজানা সেই গল্প।
সিনেমাটির প্রথম কাট ছিল সাড়ে সাত ঘণ্টার! পরে দীর্ঘ সম্পাদনার মাধ্যমে সেটিকে কমিয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে আনা হয়। ভুবনের চরিত্রে স্ত্রীর দুল পরেছিলেন আমির। নিজের লুককে আরও গ্রামীণ ও বাস্তবসম্মত করতে তাঁর তৎকালীন স্ত্রী রীনা দত্তের কানের দুল ব্যবহার করেছিলেন তিনি। ছবিটির গল্পে ব্রিটিশ শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি থাকায় এতে বিপুলসংখ্যক ব্রিটিশ অভিনেতাকে নেওয়া হয়েছিল। মুক্তির সময় পর্যন্ত এটি ছিল ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক ছবিতে সবচেয়ে বেশি ব্রিটিশ অভিনেতার অভিনয়ের রেকর্ড। ছবির অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘চলে চলো’ প্রথমে অন্য নামে লেখা হয়েছিল। গানের প্রাথমিক লাইন ছিল ‘নাশা নাশা’। কিন্তু গীতিকার জাভেদ আখতার আপত্তি জানিয়ে বলেন, খরাপীড়িত গ্রামের মানুষ নেশা নিয়ে গান গাইবে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। পরে গানটির নতুন রূপ তৈরি হয়।‘লগান’-এর পুরো শুটিং হয়েছিল একটানা একটি শিডিউলে, মাঝখানে কোনো বিরতি ছাড়াই। সে সময় অনেকেই আমির খানকে এই সিদ্ধান্তের জন্য পাগল বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই কৌশলই ছবির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পর্দার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেমে এসেছিল বাস্তবে
‘দ্য স্পিরিট অব লাগান’ বইয়ে ছবির প্রোডাকশন কর্মকর্তা সত্যজিৎ ভাতকল লিখেছেন, ছবির শুটিংয়ের সময় ভারতীয় ও ব্রিটিশ অভিনেতাদের মধ্যে একধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছিল।
সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়। ছবির গল্প অনুযায়ী ব্রিটিশদের হারতেই হবে। অথচ ব্রিটিশ অভিনেতাদের অনেকেই বাস্তব জীবনে দক্ষ ক্রিকেটার ছিলেন। কেউ কেউ ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন, আবার কেউ কাউন্টি পর্যায়েও খেলেছেন। ফলে তাঁদের কাছে সিনেমার পরাজয়টা খুব একটা সুখকর ছিল না।
শুটিংয়ের ফাঁকে তাঁরা বারবার একটি ‘রিয়েল ক্রিকেট ম্যাচ’-এর দাবি জানাতেন। কিন্তু গুজরাটের প্রচণ্ড গরমে টানা শুটিংয়ের কারণে প্রযোজনা দল বারবার সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে দেয়।
অবশেষে আয়োজন হলো ‘গ্রাজ ম্যাচ’
২০০০ সালের ২৬ মার্চ বহু প্রতীক্ষিত সেই ম্যাচের আয়োজন করা হয়।
ভারতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন আমির খান। তাঁর দলে ছিলেন অভিনেতা, টেকনিশিয়ান, লাইটম্যান এবং আর্ট বিভাগের সদস্যরা। অন্যদিকে ব্রিটিশ দলে ছিলেন ছবিতে ইংরেজ ক্রিকেটারদের চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীরা।
মজার ব্যাপার হলো, ব্রিটিশ দলের কয়েকজন খেলোয়াড় অসুস্থ ও আহত থাকায় তাঁদের খেলোয়াড়সংখ্যা কম পড়ে যায়। ফলে ভারতীয় দল থেকেই ধার দেওয়া হয় কাচরা চরিত্রের অভিনেতা আদিত্য লখিয়াকে। এতে ভারতীয় দলের সদস্যরা মজা করে তাঁকে ‘ট্রেইটর’ বা বিশ্বাসঘাতক বলে ডাকতে শুরু করেন।
মাঠের পরিবেশ ছিল যেন ভারত-ইংল্যান্ডের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। টস, ধারাভাষ্য, স্কোরবোর্ড—সবকিছুরই আয়োজন ছিল।
বাস্তবের মাঠে ভেঙে গেল চম্পানের স্বপ্ন
কিন্তু ম্যাচ শুরু হওয়ার পর বোঝা গেল বাস্তব আর সিনেমা এক নয়। ভারতীয় দলের বেশির ভাগ সদস্যই ছিলেন অপেশাদার ক্রিকেটার। অন্যদিকে ব্রিটিশ দলের অনেকেই নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। ফলে ম্যাচের ফলও ছিল একতরফা।
ব্রিটিশরা সহজেই জয় তুলে নেয়। সিনেমায় যাদের পরাজিত হতে হয়েছিল, বাস্তবে তারাই জয়ের হাসি হাসল।
তবে হারলেও ভারতীয় দল ক্রীড়াসুলভ মনোভাব দেখিয়েছিল। ম্যাচ শেষে তারা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানায়। সাত মাসের দীর্ঘ শুটিংয়ের মধ্যে এই ম্যাচই দুই দলের শিল্পীদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
ক্রিকেটের বাইরে আরেক প্রতিযোগিতা
শুধু ক্রিকেট নয়, ‘লগান’ ইউনিটে আরেকটি খেলাও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল—টেবিল টেনিস। ব্রিটিশ অভিনেতা ব্যারি হার্টের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল দুই সপ্তাহব্যাপী একটি টুর্নামেন্ট। সেখানে ১৬টি ডাবলস দল অংশ নেয়। প্রতিটি দলে একজন ভারতীয় ও একজন ব্রিটিশ সদস্য ছিলেন।
ফাইনালে মুখোমুখি হন আদিত্য লাখিয়া ও ক্রিস ইংল্যান্ড জুটি এবং আমির খান ও তাঁর ব্রিটিশ সঙ্গী শার্লট। গুজরাটের সাবেক রাজ্যস্তরের টেবিল টেনিস খেলোয়াড় আদিত্য লাখিয়ার অভিজ্ঞতায় শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতে নেয় তাঁর দল।
ছবিটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, বরং ৭৪তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়। ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ও ‘সালাম বম্বে!’র পর এটি ছিল অস্কারে মনোনয়ন পাওয়া ভারতের তৃতীয় চলচ্চিত্র। চম্পানের প্রতিটি কুঁড়েঘরে ছিল এসি! ছবির কাল্পনিক গ্রাম চম্পানের পুরো সেট গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলের মরুভূমিতে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। বাইরে থেকে শতভাগ গ্রামীণ ও ঐতিহাসিক মনে হলেও, শুটিং সহজ করতে প্রায় প্রতিটি কুঁড়েঘরে ছিল এয়ারকন্ডিশনার ও টয়লেট। অর্থাৎ বাস্তবতার সঙ্গে আরামেরও সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন নির্মাতারা। প্রযোজক হিসেবে রীনা দত্তের অভিষেক। ‘লগান’ ছিল আমির খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম চলচ্চিত্র। নির্বাহী প্রযোজকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁর তৎকালীন স্ত্রী রীনা দত্তকে। মজার ব্যাপার হলো, তখন তাঁর কোনো প্রযোজনার অভিজ্ঞতা ছিল না। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি আদিত্য চোপড়া ও সুভাষ ঘাইয়ের মতো অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। আমির খানও ছাড় পাননি। শুটিং ইউনিটে সময়ানুবর্তিতা ছিল অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা নিয়ম। দ্বিতীয় দিন আমির খান নিজেই পাঁচ মিনিট দেরি করেছিলেন। ফলাফল? ইউনিটের বাস তাঁকে রেখে চলে যায়। তারকা হয়েও বিশেষ সুবিধা পাননি তিনি।ভুবন চরিত্রে অভিনয় করা আমির খানের সবচেয়ে বড় আফসোস ছিল তাঁর ক্লিন-শেভড লুক। তাঁর মতে, দীর্ঘ খরা ও দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী একজন গ্রামের যুবকের নিয়মিত দাড়ি কামানোর কথা নয়। বিভিন্ন দাড়িওয়ালা লুক পরীক্ষা করা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো তাঁকে মানায়নি বলে বাদ দেওয়া হয়।
তখনকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবিগুলোর একটি
‘লগান’ ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হিন্দি ছবিগুলোর একটি। প্রায় ২৫ কোটি রুপির বাজেটে নির্মিত ছবিটি ছিল আমির খানের প্রযোজক হিসেবে প্রথম বড় উদ্যোগ।
ছবিতে অর্জুন চরিত্রে অভিনয় করা আখিলেন্দ্র মিশ্র পরে স্মৃতিচারণা করে বলেন, শুটিং সেটে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন ছিল। বিভিন্ন দেশের খাবার, ফলের রস, স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা—সবকিছুই ছিল নজরকাড়া।
এমনকি ইউনিটের সদস্যদের শুধু বোতলজাত পানি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে কেউ কেউ নাকি সেই পানি দিয়েই চুল ধুতেন।
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক মাইলফলক
পরিচালক আশুতোষ গোয়াড়িকরের ‘লগান’ শুধু বক্স অফিসেই সফল হয়নি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ছবিটি অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়, যা ভারতীয় সিনেমার জন্য একটি বড় অর্জন।
আজ মুক্তির ২৫ বছর পরও ‘ঘনন ঘনন’, ‘মিতওয়া’, ‘ও রে ছোরি’ কিংবা ‘রাধা কাইসে না জলে’ গানগুলো দর্শকের মনে একই রকম আবেদন জাগায়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আইএমডিবি অবলম্বনে