
বলিউডে তাঁকে একসময় বলা হতো ‘ভেনাস’। অনেকে তুলনা করতেন হলিউডের মেরিলিন মনরোর সঙ্গে। কিন্তু তুলনা দিয়ে মধুবালাকে মাপার দরকার নেই। পুরোনো সময়ে চলচ্চিত্র বিষয় নিবন্ধে লেখা সমালোচকদের মতে, তাঁর সৌন্দর্য ছিল দীপ্ত, অথচ অভিনয়ে ছিল সংযম ব্যক্তিত্বে ছিল দৃঢ়তা, অন্তরে অদ্ভুত কোমলতা। রুপালি পর্দায় তিনি ছিলেন আলোর উৎসব, আর ব্যক্তিজীবনে দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক বেদনাময় নাম।
মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে তিনি যা রেখে গেছেন—তা কেবল চলচ্চিত্র নয়, এক অন্য রকম মানবিক কাহিনি। জন্ম ফেব্রুয়ারিতে, বিদায়ও ফেব্রুয়ারিতেই। পারিবারিক নাম মমতাজ জাহান দেহলভী। কিন্তু সময় তাঁকে চিনেছে এক নামেই—মধুবালা। আজ তাঁকে স্মরণ করছি জন্মদিন উপলক্ষে।
বসন্তের আলোচনা বা ভালোবাসা দিবসের নানান গল্পের ফাঁকে আজ সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসছে মধুবালার নামটি। চল্লিশ থেকে ষাটের দশক কাঁপানো সেই নায়িকার সৌন্দর্য নিয়ে কিংবদন্তি আছে, কিন্তু তাঁকে কেবল ‘বিউটি আইকন’ বললে কম বলা হয়। সাদাকালো থেকে রঙিন তিনি যেন চিরকালের ‘আনারকলি’। তারকাদের ঝলমলে জীবনের আড়ালে যে ব্যক্তিগত সংগ্রাম থাকে, মধুবালার জীবন তার এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। প্রেম, অভিমান, পারিবারিক টানাপোড়েন, দীর্ঘ অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন বাস্তবের এক ট্র্যাজিক উপাখ্যান। তবু এই ট্র্যাজেডির মধ্যেই ছিল দীপ্তি—পর্দায় নিবেদন, শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা, আর শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। আজ সেই গল্পটাই জানব।
দরিদ্র শৈশব থেকে রুপালি পর্দা
১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লির এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম মমতাজ জাহান দেহলভীর। বাবা আতাউল্লাহ খান পেশোয়ারের পাঠান—পরিবারের রুটি-রোজগারের ভরসা ছিল একটি তামাক কোম্পানির চাকরি। সেই চাকরি হারানোর পর ভাগ্যের খোঁজে পরিবারকে নিয়ে তিনি চলে আসেন বোম্বে (আজকের মুম্বাই)। কিন্তু নতুন শহরেও স্বস্তি ছিল না। ছোট্ট ঘরে ঠাসাঠাসি করে থাকা, অর্থকষ্ট, অসহায়তা—সব মিলিয়ে শৈশবটাই ছিল টানাপোড়েনের। এর ওপর খুব অল্প বয়সেই হারান কয়েকজন ভাইবোনকে।
১৯৪৪ সালের বোম্বে ডকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় তাঁদের বস্তির ছোট্ট ঘরটিও নষ্ট হয়ে যায়—একমুহূর্তে আবারও শূন্য হাতে দাঁড়াতে হয় পরিবারকে।
এই সংকটেই জীবিকার প্রয়োজনকে সামনে রেখে শিশুকালেই কাজের পথে নামতে হয় মমতাজকে। অভিনয় তখন তাঁর কাছে শখ নয়, পরিবারের বাঁচার অবলম্বন। মাত্র ৯ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। শুটিং সেটের দীর্ঘ সময়, যাতায়াতের ধকল—সবই সামলাতেন ছোট শরীরে, কিন্তু আশ্চর্য এক শৃঙ্খলা নিয়ে। খুব দ্রুতই পরিচালক-প্রযোজকদের নজরে আসে তাঁর বুদ্ধি, পরিশ্রম আর দৃঢ় মনোভাব।
কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর জীবনে আসে আরেকটি মোড়। সে সময়ের প্রভাবশালী অভিনেত্রী দেবিকা রানী মুগ্ধ হন তাঁর সৌন্দর্য আর সম্ভাবনায়। তিনিই নাম দেন ‘মধুবালা’। নাম বদলের সঙ্গে বদলে যেতে থাকে ভাগ্যও। ১৯৪৭ সালে ‘নীল কমল’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ—কিশোরী বয়সেই প্রধান চরিত্রে কাজ করা তখন সহজ ছিল না। রাজ কাপুরের বিপরীতে ওই ছবিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল আত্মবিশ্বাসী, পরিণত। বলা যায়, এখান থেকেই শুরু হয় সেই যাত্রা—যে যাত্রা তাঁকে অল্প সময়ের মধ্যেই হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত মুখে পরিণত করবে।
‘মহল’: তারকাখ্যাতির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
১৯৪৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মহল’ যেন মধুবালার জীবনে বড় এক পরিবর্তন এনে দেয়। কামাল আমরোহী পরিচালিত এই ছবির রহস্যময় আবহ, ছায়া–আলোয় মোড়া ফ্রেম আর গা ছমছমে গল্পের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল একই সঙ্গে রহস্যময় ও আকর্ষণীয়—চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত টান, মুখে নীরব বিষাদের ছাপ। সমালোচকদের ভাষ্যে, দর্শক তখন যেন নতুন এক নায়িকাকে আবিষ্কার করল—যাঁর সৌন্দর্য কেবল দৃশ্যমান নয়, অনুভবযোগ্যও।
‘মহল’–এর সাফল্যের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ‘দুলারি’, ‘বেকসুর’, ‘তারানা’, ‘বাদল’—একটির পর একটি ছবিতে তিনি হয়ে উঠলেন বক্স অফিসের নিশ্চয়তা। রোমান্টিক, ট্র্যাজিক কিংবা হালকা বিনোদনধর্মী চরিত্র—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অভিনয় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সহ–অভিনেতাদের ছাপিয়ে তিনি নিজের উপস্থিতি আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করতেন, কিন্তু কখনো অতিনাটকীয় হতেন না। এটাই ছিল তাঁর শক্তি—স্বাভাবিকতায় দীপ্তি।
এই সময়েই তাঁর তারকাখ্যাতি ভারত পেরিয়ে পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘থিয়েটার আর্টস’ তাঁকে অভিহিত করে ‘বিগেস্ট স্টার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে, যা তখনকার দিনে এক ভারতীয় অভিনেত্রীর জন্য ছিল বিরল স্বীকৃতি। হলিউড থেকেও আসে আগ্রহ। অস্কারজয়ী মার্কিন নির্মাতা ফ্রাঙ্ক কাপরা তাঁকে দিয়ে অভিনয় করাতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সেই প্রস্তাব বাস্তব হয়নি। পরিবার, বিশেষ করে বাবার আপত্তিতে হলিউডযাত্রা থেমে যায়। হয়তো যদি সেই দরজা খুলত, তাঁর ক্যারিয়ার অন্য মাত্রা পেত। তবু ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে যে অবস্থান তিনি তৈরি করে গেছেন, তা কোনো আন্তর্জাতিক সুযোগের অভাবে ম্লান হয়নি। বরং ‘মহল’–এর পর থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বলিউডের সেই তারা—যাঁর নাম উচ্চারণ মানেই সাফল্যের প্রত্যাশা।
প্রেম আর ভাঙনের গল্প
১৯৫১ সালের ‘তারানা’ ছবির সেটে প্রথমবার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন মধুবালা ও দিলীপ কুমার। সেই সময় দুজনেই ক্যারিয়ারের উত্থানপর্বে। কাজের ফাঁকে বন্ধুত্ব, তারপর ধীরে ধীরে প্রেম। শোনা যায়, একদিন মধুবালা তাঁর হেয়ারড্রেসারের হাতে একটি লাল গোলাপ ও উর্দুতে লেখা ছোট্ট চিরকুট পাঠিয়েছিলেন দিলীপ কুমারের কাছে—‘ভালোবাসলে ফুলটি গ্রহণ করবেন।’ দিলীপ কুমার সেই গোলাপ গ্রহণ করেন। শুরু হয় বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমকাহিনিগুলোর একটি।
প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল এই সম্পর্ক। একসঙ্গে ‘তারানা’, ‘সঙ্গদিল’, ‘অমর’—একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন তাঁরা। পর্দার রসায়ন তখন বাস্তবের আবেগে মিশে গেছে। শিল্পীজীবনের চাপ, তারকাখ্যাতির আলো—সবকিছুর মাঝেও দুজনের সম্পর্ক ছিল গভীর ও ব্যক্তিগত।
কিন্তু এই প্রেমের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান মধুবালার বাবা আতাউল্লাহ খান। তিনি মেয়ের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—দুটিতেই নাক গলাতেন। ১৯৫৭ সালে বি আর চোপড়া প্রযোজিত ‘নয়া দৌড়’ ছবিকে ঘিরে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। চুক্তি অনুযায়ী ছবির আউটডোর শুটিং হওয়ার কথা ছিল ভোপালে। আতাউল্লাহ খান মেয়েকে বাইরে যেতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। প্রযোজনা সংস্থা মধুবালার বদলে বৈজয়ন্তীমালাকে নিয়ে ছবিটি সম্পন্ন করে। অগ্রিম পারিশ্রমিক ফেরত চেয়ে মামলা হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এই মামলায় সাক্ষ্য দেন দিলীপ কুমার। তিনি আদালতে বলেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে পেশাগত দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তিনি সত্য বলছেন। এই অবস্থান পিতৃভক্ত মধুবালাকে গভীরভাবে আঘাত করে। তিনি চেয়েছিলেন দিলীপ কুমার অন্তত তাঁর বাবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করুন। কিন্তু দিলীপ কুমার মনে করেছিলেন, তিনি অন্যায় করেননি—ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
সম্পর্কের ভাঙন শুরু হয় এখান থেকেই। অহং, অভিমান ও অচলাবস্থার সংঘাতে দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরে দিলীপ কুমার বিয়ের প্রসঙ্গে দুটি শর্ত দেন—মধুবালাকে পরিবার থেকে আলাদা হতে হবে এবং অভিনয় ছেড়ে দিতে হবে। অভিনয় ছাড়ার বিষয়ে তিনি নরম ছিলেন, কারণ জানতেন স্টুডিওর দীর্ঘ শুটিং তাঁর অসুস্থ শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু পরিবার ত্যাগের শর্তে রাজি হননি মধুবালা।
এই অচলাবস্থায় প্রেম থেমে যায়। প্রকাশ্যে বিচ্ছেদ হলেও, স্মৃতিতে থেকে যায় এক গভীর ভালোবাসা। পরবর্তীকালে একাধিক সাক্ষাৎকারে দিলীপ কুমার স্বীকার করেছেন, মধুবালা তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিলেন। আর মধুবালার বোনদের ভাষ্যেও আছে—তিনি শেষ পর্যন্ত দিলীপ কুমারকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলেন।
এই প্রেমকাহিনি তাই শুধু তারকাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; এটি বলিউডের ইতিহাসে শিল্প, অহং ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের এক জটিল সমীকরণের গল্প। পর্দায় ‘মুঘল-ই-আজম’–এর সেলিম-আনারকলির প্রেম যেমন বেদনাবিধুর, বাস্তবের মধু-দিলীপের গল্পও তেমনি অপূর্ণতায় দীর্ণ।
‘মুঘল-ই-আজম’ থেকে অসমাপ্ত সংসার
হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মুঘল-ই-আজম’ কেবল একটি সিনেমা নয়, এক যুগের প্রতীক। এই ছবির নির্মাণ শুরু হয় পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়, শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ৯ বছর। সেলিম-আনারকলির প্রেমকাহিনি পর্দায় যতটা বেদনাময়, বাস্তবেও ততটাই টানাপোড়েনময় ছিল মধুবালা ও দিলীপ কুমারের সম্পর্ক। শুটিংয়ের সময় তাঁদের ব্যক্তিগত দূরত্ব বাড়ছিল, কিন্তু ক্যামেরার সামনে সেই ক্ষতচিহ্ন চাপা পড়ে যেত নিখুঁত অভিনয়ে। অনেক সময় নাকি তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতেন না, তবু দৃশ্যের আবেগে কোনো ঘাটতি থাকেনি। অনারকলির কারাবন্দি দৃশ্যগুলোয় তাঁর শরীরী কষ্ট ছিল সত্যিকারের। ভারী পোশাক, ধাতব শিকল, দীর্ঘ সময় ধরে আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা—সব মিলিয়ে শুটিং শেষে তাঁর হাত-পা নীল হয়ে যেত বলে সহশিল্পীরা স্মরণ করেছেন।
হৃদ্যন্ত্রে জন্মগত ছিদ্র নিয়ে এমন কঠোর পরিশ্রম ছিল আত্মনিবেদনেরই আরেক নাম। চিকিৎসকের সতর্কতা উপেক্ষা করে তিনি কাজ করে গেছেন—কারণ অভিনয়ই ছিল তাঁর পরিচয়, তাঁর দায়। ১৯৬০ সালে মুক্তির পর ‘মুঘল-ই-আজম’ ইতিহাস হয়ে যায়। সমালোচক ও দর্শক—দুদিক থেকেই বিপুল প্রশংসা। কিন্তু ছবির সাফল্যের পরও মধুবালার শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয়নি। অসুখ তখন প্রকট, ক্লান্তি স্থায়ী।
ঠিক এই সময়েই ব্যক্তিজীবনে আসে আরেক মোড়। ১৯৬০ সালেই তিনি বিয়ে করেন কিশোর কুমারকে। তাঁদের পরিচয় হয়েছিল ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ ছবির সেটে। সম্পর্কের শুরুটা ছিল সহজ-স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ব্যাখ্যা আছে—কেউ বলেন অভিমান, কেউ বলেন নিরাপত্তার খোঁজ। সত্য যাই হোক, অসুস্থ শরীর নিয়ে নতুন সংসারের স্বপ্ন খুব বেশি দূর এগোয়নি।
বিয়ের পর চিকিৎসার আশায় লন্ডনেও গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করে দেন—হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা তখন আর ফেরানো সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে শুটিং ছেড়ে দিতে হয়। দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী জীবন, মাঝেমধ্যে শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা—সব মিলিয়ে তিনি যেন ক্রমে পর্দার আলো থেকে সরে গিয়ে নিভৃত অন্ধকারে ঢুকে পড়েন।
রুপালি পর্দায় যিনি ছিলেন অমর আনারকলি, বাস্তবে তিনি হয়ে ওঠেন দীর্ঘ অপেক্ষার এক নারী—স্বাস্থ্য, ভালোবাসা আর স্বাভাবিক জীবনের জন্য। ‘মুঘল-ই-আজম’ তাঁকে ইতিহাসে অমর করেছে; কিন্তু সেই অমরত্বের আড়ালে ব্যক্তিগত জীবনে ছিল অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া।
‘আমি বাঁচতে চাই’
ষাটের দশকের শুরুতেই চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন—তাঁর হৃদ্যন্ত্রে জন্মগত ছিদ্র (ভেন্ট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট) রয়েছে, এবং অস্ত্রোপচারের সুযোগ তখনকার চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত সীমিত। ধীরে ধীরে শুটিং কমে আসে। ‘মুঘল-ই-আজম’ মুক্তির পর আর হাতে গোনা কয়েকটি ছবিতে কাজ করতে পেরেছিলেন। বাকি সময় কাটতে থাকে ঘরবন্দী জীবনেই।
প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি ভুগেছেন জটিল হৃদ্রোগে। শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, রক্তবমি—অসুস্থতার উপসর্গ ক্রমেই বাড়তে থাকে। মাঝেমধ্যে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও দীর্ঘমেয়াদি আরোগ্য আর সম্ভব হয়নি। চিকিৎসার আশায় বিদেশযাত্রাও হয়েছিল, কিন্তু চিকিৎসকেরা শেষ পর্যন্ত জানান—অপারেশন ঝুঁকিপূর্ণ এবং ফল অনিশ্চিত।
এই দীর্ঘ শয্যাশায়ী সময়ে কাছের মানুষদের কাছে নাকি প্রায়ই বলতেন, ‘আমি বাঁচতে চাই।’ কথাটি শুধু মৃত্যুভয় নয়, ছিল জীবনের প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। যিনি পর্দায় ছিলেন আলোঝলমলে, তিনি বাস্তবে দিন গুনতেন সুস্থ সকালের আশায়।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, জন্মদিনের মাত্র নয় দিন পর, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল চলচ্চিত্র জগত। মুম্বাইয়ের জুহুর মুসলিম কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। খুব অল্প সময়ের জীবন—কিন্তু প্রভাব এমন গভীর যে পাঁচ দশক পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বিস্ময় ও মুগ্ধতায়।
রূপ, খ্যাতি, প্রেম—সবকিছুর ঊর্ধ্বে শেষ পর্যন্ত যে সত্যটি থেকে যায়, তা হলো এক অসাধারণ শিল্পীর জীবনপিপাসা। মধুবালা শেষ দিন পর্যন্ত বাঁচতে চেয়েছিলেন। আর সেই আকাঙ্ক্ষাই হয়তো তাঁকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে স্মৃতির ভেতর।
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়
মৃত্যুর পরও থেমে থাকেননি মধুবালা। সময়ের সীমানা পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। গুগলের ডুডলে তাঁর প্রতিকৃতি, ডাকটিকিটে তাঁর মুখ—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জনপ্রিয় স্মৃতির মেলবন্ধনে তিনি আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন ও প্রেম নিয়ে বায়োপিক নির্মাণের আলোচনা বারবার ফিরে আসে; সমসাময়িক অভিনেত্রীরা আগ্রহ দেখান তাঁর চরিত্রে অভিনয়ের। যেন পর্দায় তাঁকে নতুন করে আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা কখনো ফুরোয় না।