‘ওম’ সিনেমায় উপেন্দ্র। আইএমডিবি
‘ওম’ সিনেমায় উপেন্দ্র। আইএমডিবি

৫৫০ বার মুক্তি পায় এই সিনেমা, রিমেক হয় বাংলাদেশেও

শশী এক তরুণ সাংবাদিক, যিনি বেঙ্গালুরুর আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত গ্যাংস্টারদের খুঁজে বের করে তাঁদের নিয়ে বই লেখেন। বইটির নামও প্রতীকী—‘ওম’। গ্যাংস্টারকে বইটি পড়তে বলেন তিনি। এই কাজের সূত্রেই শশী জানতে পারেন এক রহস্যময় চরিত্রের কথা—সত্যমূর্তি শাস্ত্রী, সংক্ষেপে সবার কাছে পরিচিত ‘সত্যা’। এর পর কী হবে তা নিয়েই ‘ওম’ সিনেমার গল্প। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিকে কন্নড় ভাষার ক্ল্যাসিক সিনেমা বললেও ভুল হয় না। গত তিন দশকে বারবার মুক্তি পেয়েছে, সংখ্যাটা ৫৫০ বার! কেবল তা–ই নয়, ছবিটি এই অঞ্চলের বহু সিনেমার প্রেরণা হিসেবেও কাজ করেছে।

২০২৩ সাল থেকে ভারতে শুরু হয় এক নতুন ট্রেন্ড। পুরোনো হিট ও কাল্ট সিনেমা আবার মুক্তি পাচ্ছে থিয়েটারে। দর্শকেরা ভিড় জমাচ্ছেন পুরোনো প্রিয় ছবির সামনে, আবার খুঁজে নিচ্ছেন নস্টালজিয়ার স্বাদ। কখনো ‘ভুল বোঝা’ ফ্লপ সিনেমাও দ্বিতীয় জীবনের সুযোগ পাচ্ছে। ‘শোলে’ আর ‘মুঘল-এ-আজম’ ডজনখানেকবার হলে ফিরেছে। বলিউডের চিরকালীন প্রেমকাহিনি ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ও বছরের পর বছর টিকে আছে হলে। তবু কেউ ছুঁতে পারেনি কন্নড় ভাষার ‘ওম’কে, যার পুনর্মুক্তির সংখ্যা এখন অবিশ্বাস্য ৫৫০।

‘ওম’ সিনেমার পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

৭৫ লাখ রুপির সেই সিনেমা
পরিচালক উপেন্দ্র ১৯৯৫ সালে ‘ওম’ বানান। ছবির নায়ক ছিলেন শিবরাজকুমার, নায়িকা প্রিমা। বাজেট ছিল মাত্র ৭৫ লাখ রুপি। কিন্তু বেঙ্গালুরুর আন্ডারওয়ার্ল্ডের টানটান গল্প, বাস্তবধর্মী চিত্রনাট্য আর অভিনয়ের তেজে ছবিটি তখনকার কন্নড় বক্স অফিস কাঁপিয়ে দেয়। আয় হয় বাজেটের বহু গুণ বেশি।

মজার বিষয় হলো, হল থেকে নামানো মাত্রই দর্শকেরা দাবিতে সরব হতেন—‘ওম’ ফিরিয়ে আনতে হবে। ফলে প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর আবারও পর্দায় ফিরত ছবি। বেঙ্গালুরুর কাপালি সিনেমা হলে একাই মুক্তি পেয়েছে ৩০ বার। লিমকা বুক অব রেকর্ডসে নথিভুক্ত এই তথ্যই প্রমাণ করে ‘ওম’ কেবল সিনেমা নয়, হয়ে উঠেছে পপ কালচারের অন্যতম অনুষঙ্গ।

সিনেমার শুটিং শুরুর আগে। আইএমডিবি

কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
‘ওম’ শুধু জনপ্রিয় হয়নি, বদলে দিয়েছিল কন্নড় সিনেমার ভাষা। এর আগে দক্ষিণ ভারতীয় ছবিতে গ্যাংস্টার কাহিনি থাকলেও এত বাস্তব আর এত শক্তিশালীভাবে তা ফুটিয়ে তোলেননি কেউ। ‘ওম’-এর পর থেকেই শুরু হয় এক নতুন ধারা—বাস্তবধর্মী অপরাধচিত্রের জয়যাত্রা।

শিবরাজকুমার, যিনি এর আগেই সফল নায়ক ছিলেন, এই ছবির মাধ্যমে কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ তারকায় পরিণত হন। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তাঁকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ভক্তকুলের উন্মাদনা। তিন দশক পরও সেই ভালোবাসা অটুট।
উপেন্দ্রর জন্যও ছবিটি ছিল মাইলফলক। এটি ছিল তাঁর মাত্র তৃতীয় পরিচালনা। এরপর তিনি পাকা নির্মাতা হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেন। কয়েক বছর পর অভিনয়েও নাম লেখান এবং ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকার।

সীমান্ত পেরোনো জনপ্রিয়তা
‘ওম’-এর গল্প ও আবেদন এতটাই তীব্র ছিল যে এটি বিভিন্ন ভাষায় রিমেক হয়েছে। হিন্দিতে ‘অর্জুন পণ্ডিত’, তেলুগুতে ‘ওমকারাম’, আর বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে ‘পাঞ্জা’। ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে অভিনয় করেন মান্না ও মৌসুমী। পরিচালক ছিলেন কাজী হায়াৎ। তবে মূল কন্নড় সংস্করণের জনপ্রিয়তার সঙ্গে কোনো সংস্করণই পাল্লা দিতে পারেনি। তবে বিভিন্ন ভাষায় মুক্তি পাওয়া বেশির ভাগ সিনেমাই ছিল ‘ওম’-এর অনানুষ্ঠিক রিমেক।

‘ওম’ কেন আলাদা
সিনেমা ইতিহাসে অনেক কাল্ট ছবি আছে। তবে ‘ওম’-এর বিশেষত্ব হলো—এটি দর্শকদের কাছে একেবারেই ‘নিজস্ব’। সিনেমার ভেতরের চরিত্রগুলো যতটা না পর্দায় ছিল, ততটাই যেন জীবনে মিশে গিয়েছিল ভক্তদের। থিয়েটার থেকে নামানো হলেই তাঁরা নতুন করে দেখতে চাইতেন। এই দেখতে চাওয়ার দাবিই বারবার পর্দায় ফিরেয়েছে ‘ওম’কে।