
একসময় পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকের বাড়তি আগ্রহ। কখনো সাহসী চরিত্রে, কখনো প্রেমে পড়া তরুণী, কখনো সমাজের চোখে অবহেলিত এক নারীর ভূমিকায়—নিজের অভিনয় দিয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। মাত্র সাত বছর বয়সে অভিনয় শুরু, কৈশোরেই জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি, আর ১৭ বছর বয়সে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। তাঁর জীবনে যেমন ছিল সাফল্যের ঝলমলে অধ্যায়, তেমনি ছিল বিতর্ক, প্রেমের জন্য পরিবারের বিরোধিতা উপেক্ষা করে ঘর ছাড়ার ঘটনা, কিছু অপূর্ণতা ও হারিয়ে যাওয়া সহশিল্পীদের স্মৃতি।
তিনি ভারতের হিন্দি সিনেমার আশির দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী পদ্মিনী কোলহাপুরে। আজ ১ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
সংগীতের পরিবার, অভিনয়ে হাতেখড়ি
১৯৬৫ সালের ১ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের এক সংগীতপ্রিয় পরিবারে জন্ম পদ্মিনীর। বাবা পণ্ডরীনাথ কোলহাপুরে ছিলেন সংগীতশিল্পী। তাঁদের পরিবারে সংগীতের ঐতিহ্যও বেশ সমৃদ্ধ। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। তিন বোনের মধ্যে পদ্মিনী দ্বিতীয়। বড় বোন শিবাঙ্গী কোলহাপুরে অভিনেতা শক্তি কাপুরের স্ত্রী ও শ্রদ্ধা কাপুরের মা। ছোট বোন তেজস্বিনীও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত।
পরিবারের পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে গান ও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় পদ্মিনীর। তবে তিনি প্রথমে গায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। একসময় লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলের গানের দলের সঙ্গে কোরাসেও কণ্ঠ দিয়েছেন। পরে নিজের অভিনীত কয়েকটি সিনেমায়ও গান গেয়েছেন। কিন্তু নিয়তি তাঁকে নিয়ে যায় অভিনয়ের জগতে।
মাত্র সাত বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান পদ্মিনী। ১৯৭২ সালে শুরু হয় তাঁর অভিনয়যাত্রা। এরপর ‘ইশক ইশক ইশক’, ‘জিন্দেগি’ ও ‘ড্রিম গার্ল’-এর মতো সিনেমায় ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে তাঁর জীবনের বড় মোড় আসে রাজ কাপুরের ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় জিনাত আমানের অভিনীত রূপা চরিত্রের ছোটবেলার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। অল্প বয়সেই তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে।
মাত্র ১৫ বছরেই পুরস্কার, ১৭ বছরেই সেরা অভিনেত্রী
শিশুশিল্পী থেকে নায়িকা হয়ে ওঠার পথে পদ্মিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল অভিনয়ের দক্ষতা। অল্প বয়সেই তিনি এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেন, যেগুলোতে পরিণত অভিনয়শিল্পীর প্রয়োজন ছিল। ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ইনসাফ কা তারাজু’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা। এতে এক ধর্ষণের শিকার তরুণীর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। চরিত্রটির যন্ত্রণা, অপমান ও বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন অসাধারণ দক্ষতায়। সিনেমাটি তাঁকে এনে দেয় ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর স্বীকৃতি।
তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫ বছর। অল্প বয়সে এমন কঠিন চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বুঝিয়ে দেন, শুধু সৌন্দর্য নয়, অভিনয় দিয়েও দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।
এরপর ১৯৮১ সালে ‘আহিস্তা আহিস্তা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য বিশেষ স্বীকৃতি পান। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় তৈরি হয় ১৯৮২ সালে। রাজ কাপুর পরিচালিত ‘প্রেম রোগ’ সিনেমায় ঋষি কাপুরের বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। উচ্চবর্ণের এক তরুণ বিধবার চরিত্রে পদ্মিনীর অভিনয় আজও হিন্দি সিনেমার উল্লেখযোগ্য অভিনয়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সামাজিক বৈষম্য, বিধবা নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রেমের অধিকার—সব মিলিয়ে সিনেমাটি ছিল সময়ের তুলনায় সাহসী। পদ্মিনী চরিত্রটির অসহায়ত্বের পাশাপাশি তার প্রতিবাদী সত্তাও ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এই সিনেমার জন্য মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান তিনি। এত কম বয়সে এই স্বীকৃতি পাওয়া ছিল বিরল ঘটনা।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘বিধাতা’, ‘ওহ সাত দিন’, ‘পেয়ার ঝুকতা নেহি’, ‘স্বর্গ সে সুন্দর’, ‘মুদ্দত’, ‘দাতা’সহ একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করেন। মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। আশির দশকে হিন্দি সিনেমার অন্যতম ব্যস্ত ও চাহিদাসম্পন্ন অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন পদ্মিনী।
যে সিনেমাগুলো হাতছাড়া হয়ে আজও আফসোস
পদ্মিনীর ক্যারিয়ারের গল্পে সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে কিছু অপূর্ণতার অধ্যায়। এমন কয়েকটি সিনেমার প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যেগুলো পরে হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়।
যেমন ‘সিলসিলা’, ‘তোহফা’ ও ‘এক দুজে কে লিয়ে’। এসব সিনেমায় পরে যথাক্রমে রেখা, শ্রীদেবী ও রতি অগ্নিহোত্রীর অভিনয় দর্শকের প্রশংসা কুড়ায়। এক সাক্ষাৎকারে পদ্মিনী জানিয়েছিলেন, নানা কারণে চরিত্রগুলো করা হয়ে ওঠেনি। সময়ের সঙ্গে বুঝেছেন, কিছু সুযোগ হাতছাড়া হওয়া তাঁর ক্যারিয়ারের অপূর্ণতা হয়ে রয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় আফসোস ‘রাম তেরি গঙ্গা মেইলি’ নিয়ে। রাজ কাপুরের পরিচালনায় সিনেমাটির কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন পদ্মিনী। কিন্তু একটি চুম্বনদৃশ্যে অভিনয় করতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না বলে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। পরে সেই চরিত্রে অভিনয় করেন মন্দাকিনী। সিনেমাটি মুক্তির পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পদ্মিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজ কাপুর তাঁকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি মন্দাকিনীকে নিয়ে ৪৫ দিনের শুটিং হয়ে যাওয়ার পরও তাঁকে নিয়ে নতুন করে দৃশ্য ধারণের কথা ভেবেছিলেন পরিচালক।
কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন পদ্মিনী। পরবর্তী সময়ে তিনি স্বীকার করেছেন, সিনেমাটি না করার আফসোস তাঁর রয়েছে। তবে পর্দায় চুম্বনদৃশ্যে অভিনয় না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা ছিল না। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যক্তিগত সীমারেখাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
প্রিন্স চার্লসকে চুমু, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হইচই
পদ্মিনীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ১৯৮১ সালের। তখন ভারতের সিনেমা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সেই সময় মুম্বাইয়ের রাজকমল স্টুডিওতে ‘আহিস্তা আহিস্তা’ সিনেমার শুটিং চলছিল। সেখানে উপস্থিত হন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস, যিনি পরবর্তী সময়ে রাজা তৃতীয় চার্লস হন।
তাঁকে স্বাগত জানানোর আয়োজন চলছিল। সহশিল্পী শশীকলা ভারতীয় রীতিতে আরতি করেন। পদ্মিনীও এগিয়ে গিয়ে প্রিন্স চার্লসের গালে চুমু দেন। তাঁর কাছে ঘটনাটি ছিল নিছক সৌজন্য ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ভারতীয় ও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে সেটি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।
তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। তারপরও খবরটি ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। একপর্যায়ে পদ্মিনী পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘প্রিন্স চার্লসকে চুমু দেওয়া সেই অভিনেত্রী’ হিসেবে।
ঘটনাটির কারণে তাঁকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল। তাঁর আইনজীবী চাচাকে পর্যন্ত কিছু নোটিশের জবাব দিতে হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, একজন কিশোরীর এমন আচরণ ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। অথচ পদ্মিনীর কাছে সেটি ছিল খুবই স্বাভাবিক একটি মুহূর্ত।
অনেক বছর পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, প্রিন্স চার্লসকে গালে ছোট্ট একটি চুমু দিয়েছিলেন, এর বেশি কিছু নয়। অথচ সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে অনেক বড় করে তুলেছিল। ২০২২ সালে চার্লস ব্রিটেনের রাজা হওয়ার পরও পুরোনো ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। এমনকি যুক্তরাজ্যে বেড়াতে গিয়ে একবার অভিবাসন কর্মকর্তার কাছেও তাঁকে এ ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পদ্মিনী নিজেই জানিয়েছিলেন, তাঁর পাসপোর্টে পেশা হিসেবে অভিনেত্রী লেখা দেখে ওই কর্মকর্তা জানতে চেয়েছিলেন, তিনিই কি সেই নারী, যিনি প্রিন্স চার্লসকে চুমু দিয়েছিলেন!
ঋষি কাপুরের সঙ্গে পর্দার প্রেম, বাস্তবের বন্ধুত্ব
পদ্মিনী ও ঋষি কাপুরের জুটি আশির দশকের দর্শকের কাছে ছিল বেশ পরিচিত। ‘জামানে কো দিখানা হ্যায়’ থেকে ‘প্রেম রোগ’—বিভিন্ন সিনেমায় তাঁদের রসায়ন দর্শকের মন জয় করে। বিশেষ করে ‘প্রেম রোগ’-এ তাঁদের অভিনয় দুই তারকার ক্যারিয়ারেই স্মরণীয় হয়ে আছে।
পদ্মিনী একাধিক সাক্ষাৎকারে ঋষি কাপুরের প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথা বলেছেন। সিনেমায় আসার আগেই তিনি ঋষির ভক্ত ছিলেন। স্কুল ফাঁকি দিয়ে তাঁর সিনেমা দেখতে যেতেন, মা–বাবার কাছে মিথ্যা বলেও সিনেমা দেখেছেন। অথচ একসময় সেই প্রিয় অভিনেতার সঙ্গেই অভিনয়ের সুযোগ আসে।
‘জামানে কো দিখানা হ্যায়’ সিনেমার ‘পুছো না ইয়ার ক্যায়া হুয়া’ গানের দৃশ্যে ঋষির সঙ্গে প্রথম শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ছিল বিশেষ। দৃশ্যে ঋষিকে জড়িয়ে ধরতে হবে শুনে উত্তেজনায় তিনি একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন বলে স্মৃতিচারণা করেছেন।
২০২০ সালে ঋষি কাপুরের মৃত্যুর পর পদ্মিনী গভীর শোক প্রকাশ করেন। তাঁর কাছে ঋষি ছিলেন শুধু সহশিল্পী নন, ব্যক্তিগতভাবেও কাছের একজন মানুষ। ঋষির চলে যাওয়াকে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষতি বলেই উল্লেখ করেছিলেন তিনি। আশির দশকের সেই ব্যস্ত সময়, একসঙ্গে কাজের স্মৃতি আর সহশিল্পীর সঙ্গে তৈরি হওয়া বন্ধুত্ব—সবকিছুই যেন নতুন করে মনে পড়ে গিয়েছিল তাঁর।
তবে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে প্রেমের নানা গুঞ্জনের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। পর্দার রসায়নকে বাস্তব জীবনের প্রেম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পদ্মিনীর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সহশিল্পী ঋষির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
প্রেমের জন্য ঘর ছাড়লেন, পাশে ছিলেন শক্তি কাপুর ও পুনম
পর্দার প্রেমের গল্পে বহুবার অভিনয় করেছেন পদ্মিনী। কিন্তু বাস্তব জীবনের প্রেমের গল্পও কম নাটকীয় ছিল না। ১৯৮৬ সালে ‘আইসা পেয়ার কাহাঁ’ সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে প্রযোজক প্রদীপ শর্মার সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। প্রদীপের ডাকনাম টুটু শর্মা। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, তারপর প্রেম। দুজনের সম্পর্ক বিয়ের দিকে এগোতে থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় পদ্মিনীর পরিবার।
তাঁর পরিবার ছিল রক্ষণশীল মারাঠি পরিবার। অন্য সম্প্রদায়ের প্রদীপ শর্মার সঙ্গে বিয়ে মেনে নিতে রাজি ছিল না তারা। পদ্মিনী মা–বাবাকে শ্রদ্ধা করতেন, তাঁদের অসম্মতি উপেক্ষা করাও সহজ ছিল না। কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত পরিবারের অমতেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ১৯৮৬ সালে প্রেমিককে বিয়ে করতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান পদ্মিনী। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাশে ছিলেন বড় বোন শিবাঙ্গী, দুলাভাই অভিনেতা শক্তি কাপুর ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু অভিনেত্রী পুনম ধিল্লন।
২০২৫ সালে চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদ হানিফ জাভেরির স্মৃতিচারণায় ঘটনাটি আবার আলোচনায় আসে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বিয়ের পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয়েছিল যে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরাও প্রথমে বুঝতে পারেননি পদ্মিনী বেরিয়ে গেছেন। বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী। পরে পুনম ও শক্তি কাপুরের সহযোগিতায় নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছান। সেখানে প্রদীপ শর্মার সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। এরপর তাঁরা জয়পুরে চলে যান।
ঘটনাটি তখন সিনেমার শুটিংয়েও প্রভাব ফেলেছিল। ‘আইসা পেয়ার কাহাঁ’ সিনেমায় পদ্মিনীর কিছু অংশ নতুন করে ধারণ করতে হয়েছিল। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কেও তৈরি হয়েছিল দূরত্ব। তবে সময়ের সঙ্গে মা–বাবা তাঁদের বিয়ে মেনে নেন। পরে আবার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসে।
এই বিয়ের মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন পদ্মিনী। তাঁদের একমাত্র ছেলে প্রিয়াঙ্ক শর্মা। ২০২১ সালে প্রযোজক করিম মোরানির মেয়ে শাজা মোরানিকে বিয়ে করেন তিনি। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে পদ্মিনী ও টুটু শর্মা একসঙ্গে রয়েছেন। বলিউডের অনেক তারকার সম্পর্ক যেখানে সময়ের সঙ্গে ভেঙে গেছে, সেখানে তাঁদের সংসার টিকে থাকা আলাদা করে আলোচনার বিষয়।
বিয়ের পর অভিনয় থেকে দীর্ঘ বিরতি
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে বিয়ে করেছিলেন পদ্মিনী। তখন তাঁর হাতে একের পর এক সিনেমার প্রস্তাব। জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কিন্তু সংসার ও মাতৃত্বকে সময় দিতে অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
১৯৮৯ সালের দিকে অভিনয়জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকে কাজ করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে শুটিং, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে চলা—এসবের মধ্যে নিজের শৈশব উপভোগ করার সুযোগ পাননি। তাই বিয়ের পর নিজের মতো করে সংসারজীবন কাটাতে চেয়েছিলেন।
ফিরে এসে আবারও প্রশংসা
দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন পদ্মিনী। ২০০৩ সালে মারাঠি সিনেমা ‘চিমানি পাখর’-এ অভিনয় করে প্রশংসা পান। সিনেমাটিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়ে। এ সিনেমার জন্য মারাঠি বিভাগে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান।
এরপর ‘মাই’, ‘দ্য ডটার’, ‘ফাটা পোস্টার নিকলা হিরো’ ও ‘পানিপথ’-এর মতো সিনেমায় দেখা গেছে তাঁকে। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পানিপথ’-এ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। শুধু হিন্দি সিনেমা নয়, মারাঠি ও অন্যান্য ভাষার সিনেমাতেও কাজ করেছেন তিনি।
টেলিভিশনেও অভিনয় করেছেন। ‘এক নায়ি পেহচান’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে ছোট পর্দায় দর্শকের কাছে নতুনভাবে পরিচিত হন। পরে ওয়েব সিরিজ ‘দিল বেকারার’-এ অভিনয় করেন। মঞ্চনাটকেও যুক্ত হয়েছেন। ‘বাপ কা বাপ’ নাটকে অভিনয় করে বিভিন্ন জায়গায় দর্শকের সামনে হাজির হয়েছেন।
২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, পাঁচ দশকের অভিনয়জীবন তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। সিনেমা তাঁর প্রথম ভালোবাসা হলেও মঞ্চে অভিনয় তাঁকে নতুনভাবে সমৃদ্ধ করেছে। মঞ্চে দর্শকের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়, যা একজন অভিনেতার জন্য বড় অভিজ্ঞতা।
২০২৫ সালে প্রায় ১২ বছর পর টেলিভিশনে ফেরেন ঐতিহাসিক ধারাবাহিক ‘চক্রবর্তী সম্রাট পৃথ্বীরাজ চৌহান’-এর মাধ্যমে। সেখানে রাজমাতার চরিত্রে অভিনয় করেন।
সাহসী দৃশ্য নিয়ে আপত্তি, নিজের সিদ্ধান্তে অটল
পদ্মিনীর ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তাঁকে বেশ কিছু সাহসী চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছে। ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’-এ শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়, ‘ইনসাফ কা তারাজু’তে ধর্ষণের শিকার তরুণীর চরিত্র কিংবা ‘প্রেম রোগ’-এ বিধবার প্রেম—প্রতিটি চরিত্রেই ছিল আলাদা চ্যালেঞ্জ।
রাজ কাপুরের সিনেমায় সাহসী দৃশ্যে অভিনয় নিয়েও তাঁকে বহুবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। এ ছাড়া ‘রাম তেরি গঙ্গা মেইলি’ ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা বারবার আলোচনায় এসেছে। সিনেমাটিতে মন্দাকিনীর অভিনীত চরিত্রটি তাঁকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু চুম্বনদৃশ্যে অভিনয় করতে রাজি না হওয়ায় সরে দাঁড়ান তিনি।
পদ্মিনী পরে জানিয়েছেন, পর্দায় চুম্বন করতে না চাওয়াটা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে তাঁর কোনো লজ্জা বা অপরাধবোধ নেই। আবার রাজ কাপুরের সিনেমায় যেসব সাহসী দৃশ্যে অভিনয় করেছেন, সেগুলো নিয়েও অনুশোচনা নেই তাঁর। তাঁর মতে, দৃশ্যগুলো সিনেমার গল্পের প্রয়োজনেই ছিল।
অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ না করার আক্ষেপ
ক্যারিয়ারে অনেক বড় তারকার সঙ্গে কাজ করলেও অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনয় করতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে পদ্মিনীর। ২০২৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছিলেন তিনি। অমিতাভকে তিনি ভালোবেসে ‘অমিতজি’ বলে সম্বোধন করেন।
তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ঋষি কাপুর, মিঠুন চক্রবর্তী, শশী কাপুর, শাম্মী কাপুরসহ অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু অমিতাভের সঙ্গে পর্দা ভাগ করার সুযোগ পাননি। এখনো বিষয়টি তাঁর অপূর্ণতা হয়ে আছে।
এদিকে ব্যক্তিগত জীবনে ভাতিজি শ্রদ্ধা কাপুরের সাফল্যও তাঁকে আনন্দ দেয়। বড় বোন শিবাঙ্গী ও শক্তি কাপুরের মেয়ে শ্রদ্ধা এখন বলিউডের পরিচিত মুখ। পরিবারের নতুন প্রজন্মের এই সাফল্য উপভোগ করেন পদ্মিনী। অভিনয়ের পাশাপাশি পোশাকের ব্যবসাতেও যুক্ত হয়েছেন। তাঁর পোশাকের ব্র্যান্ড ‘পদ্মসীতা’ আত্মপ্রকাশ করে শ্রদ্ধা কাপুরের হাত ধরেই।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে