‘জানি দুশমন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘জানি দুশমন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

১০ নায়ক, ৫৮ সেট, তবু সেই সিনেমা ফ্লপ

২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জানি দুশমন: এক অনোখি কাহানি’ এমন একটি ছবি, যার ব্যর্থতা চমকে দিয়েছিল। আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটির অসংখ্য দৃশ্য নিয়ে মিম তৈরি হয়। ইউটিউবে এটি ‘সো ব্যাড, ইটস গুড’ সিনেমার তালিকায় নিয়মিত আলোচনায় থাকে। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই ছবিটি একসময় ছিল বলিউডের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের প্রকল্পগুলোর একটি। পরিচালক রাজকুমার কোহলি বিশ্বাস করতেন, এই ছবিই ভারতীয় সিনেমাকে হলিউডের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পর্যায়ে নিয়ে যাবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হলো? এত বড় তারকাবহুল আয়োজন কেন ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যর্থতায় পরিণত হলো?

ছেলের ক্যারিয়ার বাঁচানোর শেষ চেষ্টা
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে পরিচালক রাজকুমার কোহলির ছেলে আরমান কোহলি নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু একের পর এক ছবি ব্যর্থ হয়। এমনকি বাবার পরিচালিত ‘বিরোধী’, ‘আউলাদ কে দুশমন’ ও ‘কাহার’—কোনোটিই তাকে তারকা বানাতে পারেনি।

ছেলের ক্যারিয়ার নতুন করে গড়ে তুলতেই রাজকুমার কোহলি সিদ্ধান্ত নেন এমন একটি সিনেমা বানানোর, যা হবে তার আগের সব কাজের চেয়ে বড়। তিনি ফিরে যান সেই ঘরানায়, যেটি তাকে একসময় খ্যাতি দিয়েছিল, মাল্টিস্টারার অতিপ্রাকৃত থ্রিলার।

‘জানি দুশমন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

‘নাগিন’ থেকে ‘জানি দুশমন’
১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নাগিন’ ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বড় হিটগুলোর একটি। ছবিটিতে ছিলেন রিনা রায়, সুনীল দত্ত, ফিরোজ খান, জিতেন্দ্র, রেখা, মুমতাজ, কবির বেদিসহ অসংখ্য তারকা।

এরপর ১৯৭৯ সালে আসে ‘জানি দুশমন’, যেটিও বিশাল তারকাবহুল এবং ব্যবসাসফল ছবি ছিল।

এই দুই ছবির সাফল্য রাজকুমার কোহলিকে বিশ্বাস করিয়েছিল—বড় তারকা মানেই বড় ব্যবসা।

এক ছবিতে ১০ নায়ক!
২০০২ সালের ‘জানি দুশমন: এক অনোখি কাহানি’-তে তিনি একসঙ্গে হাজির করেন সে সময়ের জনপ্রিয় প্রায় সব নায়ককে। অভিনয়ে ছিলেন সানি দেওল, অক্ষয় কুমার, সুনীল শেঠি, আরমান কোহলি, আরশাদ ওয়ার্সি, আফতাব শিবদাসানি, আদিত্য পাঞ্চোলি, সোনু নিগম, রাজত বেদিসহ আরও অনেক পরিচিত মুখ।
নায়িকাদের মধ্যে ছিলেন মনীষা কৈরালা, রম্ভাসহ আরও অনেকে। রাজকুমার কোহলি গর্ব করে বলেছিলেন, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এত বড়সংখ্যক জনপ্রিয় নায়ককে এক ছবিতে আগে কেউ একত্র করতে পারেননি।

‘জানি দুশমন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

তারকারাও রাজি হয়েছিলেন
পরিচালকের দাবি ছিল, তিনি কাউকে জোর করে আনেননি, বরং ছবির গল্প শুনে অভিনেতারাই কাজ করতে আগ্রহী হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, গল্পের প্রয়োজনেই এতগুলো চরিত্র ছিল। কারও গুরুত্ব কম-বেশি করার প্রশ্নই ছিল না।
২০০২ সালে ভারতের সিনেমায় ভিএফএক্স তখনো শৈশব পর্যায়ে। সেই সময় রাজকুমার কোহলি ঘোষণা দেন, শুধু ভিজ্যুয়াল ইফেক্টেই তিনি ৪ থেকে ৫ কোটি রুপি ব্যয় করবেন। আজকের হিসেবে হয়তো এ অঙ্ক খুব বড় নয়, কিন্তু দুই দশকেরও বেশি আগে এটি ছিল বিশাল বাজেট।

তিনি বলেছিলেন, ভারতীয় দর্শক আগে কখনো এমন স্পেশাল ইফেক্ট দেখেননি।

৫৮টি সেট!
শুধু ভিএফএক্স নয়। ছবির জন্য তৈরি করা হয়েছিল ৫৮টি আলাদা সেট।
এর মধ্যে ২৭টি সেটে মাত্র এক দিনের শুটিং করা হয়েছিল। অর্থাৎ একটি দৃশ্যের জন্যও বিশাল সেট বানাতে দ্বিধা করেননি নির্মাতারা। এই আয়োজনই প্রমাণ করে, ছবিটিকে কত বড় স্কেলে নির্মাণ করা হয়েছিল।

‘জানি দুশমন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

হলিউডকে টেক্কা দেওয়ার স্বপ্ন
রাজকুমার কোহলি বিশ্বাস করতেন, ভারতীয় সিনেমার সামনে তখন সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলিউড। তাই তিনি এমন একটি ছবি বানাতে চেয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিক মানের হবে। তাঁর দাবি ছিল, ছবির উপস্থাপনা হবে একেবারে আধুনিক। কলেজপড়ুয়া তরুণদের গল্প, প্রেম, প্রতিশোধ, অতিপ্রাকৃত শক্তি—সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের জন্যই ছবিটি নির্মাণ করা হয়েছে।

আরমান কোহলিকে নতুন পরিচয়ে
ছবিতে আরমান কোহলির নামও বদলে দেওয়া হয়েছিল। ক্রেডিটে তাঁর নাম লেখা হয় মুনিশ কোহলি। পরিচালকের বিশ্বাস ছিল, জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী নাম পরিবর্তন করলে হয়তো ভাগ্যও বদলাবে। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, আগের নাম নিয়ে সাফল্য না পাওয়ায় নতুন নাম ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া
রাজকুমার কোহলি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি বলেছিলেন, ‘এই ছবি তাঁর আগের সব সিনেমাকেও ছাড়িয়ে যাবে।’ ডিস্ট্রিবিউটররাও নাকি ছবিটি নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। সবাই ভেবেছিলেন, এটি হবে বছরের অন্যতম বড় ব্লকবাস্টার।

কিন্তু মুক্তির পর...
বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। মুক্তির পর সমালোচকেরা ছবিটিকে প্রায় একযোগে নেতিবাচক রিভিউ দেন। দর্শকেরাও গল্প, সংলাপ, অভিনয়, ভিএফএক্স—কোনো কিছুই গ্রহণ করেননি। বিশাল বাজেটের এই ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে।

আজ কেন কাল্ট?
মজার বিষয় হলো, ব্যর্থ হওয়ার দুই দশক পর ছবিটি নতুন জীবন পায়। ইন্টারনেট যুগে দর্শকেরা ছবির অতিনাটকীয় সংলাপ, অদ্ভুত অ্যাকশন, অসম্ভব ভিএফএক্স এবং অবাস্তব দৃশ্য নিয়ে হাস্যরস করতে শুরু করেন। আজ অনেকেই সিনেমাটি দেখেন বিনোদনের জন্য নয়; বরং এর অদ্ভুত নির্মাণশৈলী উপভোগ করতে।
এ কারণেই অনেকের কাছে এটি এখন ‘সো ব্যাড, ইটস গুড’ ধরনের একটি কাল্ট ছবি।

এরপর কী হলো?
‘জানি দুশমন: এক অনোখি কাহানি’-ই হয়ে যায় রাজকুমার কোহলির পরিচালিত শেষ সিনেমা। এরপর তিনি আর কোনো ছবি পরিচালনা করেননি। অন্যদিকে আরমান কোহলির নায়ক হওয়ার স্বপ্নও কার্যত শেষ হয়ে যায়। পরে তিনি কেবল কয়েকটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন, যেমন ‘এলওসি: কারগিল’ ও ‘প্রেম রতন ধন পায়ো’। এ ছাড়া ‘বিগ বস ৭’-এ অংশ নিয়ে আবার আলোচনায় আসেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে