রাহুল রায়। কোলাজ
রাহুল রায়। কোলাজ

‘আশিকি’ থেকে বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ—রাহুলের উত্থান-পতনের গল্প

একটা সিনেমা কখনো কখনো একজন অভিনেতার জীবনটাই বদলে দেয়। রাতারাতি তাঁকে বানিয়ে দেয় তারকা। কিন্তু সেই খ্যাতি ধরে রাখা যায় না সব সময়। ১৯৯০ সালে ‘আশিকি’ মুক্তির পর রাহুল রায়ের জীবনেও ঘটেছিল এমনই এক বিস্ময়কর পরিবর্তন। ছবিটি তাঁকে রাতারাতি ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলে। তাঁর লম্বা চুল, শান্ত চেহারা, প্রেমিকসুলভ অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় ‘চকলেট বয়’।

কিন্তু এর পরের গল্পটা এতটা মসৃণ ছিল না। একের পর এক সিনেমা ব্যর্থ হয়েছে, অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, অভিনয় থেকে দীর্ঘ বিরতি নিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে জীবিকার জন্য রান্নাঘরে বাসনও মেজেছেন। পরে রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস’-এর প্রথম মৌসুম জিতে আবার আলোচনায় আসেন। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাও স্থায়ী ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারেনি।

এরপর ২০২০ সালে শুটিং করতে গিয়ে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়া তাঁর জীবনের আরেক বড় ধাক্কা। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর এখনো তিনি নতুন করে কাজের সন্ধান করছেন। সম্প্রতি জানিয়েছেন, কখনো কখনো বিয়ের অনুষ্ঠানে নেচে একেকবার দুই থেকে চার লাখ ভারতীয় রুপি আয় করেন। এই স্বীকারোক্তিই আবার তাঁকে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

‘আশিকি’ আর রাতারাতি তারকা হয়ে যাওয়া
১৯৯০ সালে মহেশ ভাটের ‘আশিকি’ ছিল মূলত প্রেম ও সংগীতনির্ভর একটি সিনেমা। রাহুল রায়ের বিপরীতে ছিলেন আনু আগরওয়াল। ছবিটি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি, এর গানও তৈরি করেছিল আলাদা উন্মাদনা। নাদিম-শ্রাবণের সুর, কুমার শানু ও অনুরাধা পাড়ওয়ালের কণ্ঠ—‘ধীরে ধীরে সে’, ‘তু মেরি জিন্দেগি হ্যায়’, ‘নজর কে সামনে’সহ একের পর এক গান মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে।

‘আশিকি’র সাউন্ডট্র্যাকের প্রায় দুই কোটি কপি বিক্রি হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। এত বড় সাফল্য শুধু ছবির অভিনেতাদের নয়, নাদিম-শ্রাবণ ও কুমার শানুকেও প্রতিষ্ঠিত করে। নব্বইয়ের দশকের হিন্দি সিনেমায় রোমান্টিক গানের যে নতুন ঢেউ এসেছিল, ‘আশিকি’ তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন রাহুল। ২৪ বছর বয়সে প্রথম সিনেমায় অভিনয় করেই তিনি হয়ে গেলেন তারকা। পরে এক সাক্ষাৎকারে নিজেই স্বীকার করেছিলেন, ‘আশিকি’র পর তাঁর জীবন এত দ্রুত বদলে গিয়েছিল যে বিষয়টি সামলানোও সহজ ছিল না।

তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু সিনেমার পর্দায় আটকে থাকেনি। রাহুলের চেহারা ও চুলের স্টাইলও হয়ে উঠেছিল তরুণদের অনুসরণ করার বিষয়।

‘রাহুল রায় কাট’—চুলের স্টাইলেও প্রভাব
নব্বইয়ের দশকে বলিউডের নায়ক মানেই শুধু সিনেমার চরিত্র নয়, তাঁর পোশাক, চুল, হাঁটার ধরন—সবই হয়ে উঠত জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। রাহুল রায়ের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল।

‘আশিকি’তে তাঁর লম্বা, পরিপাটি চুলের স্টাইল এতটাই জনপ্রিয় হয় যে সেটি পরিচিতি পায় ‘রাহুল রায় কাট’ নামে। সে সময় তরুণদের অনেকে সেলুনে গিয়ে তাঁর মতো চুল কাটার আবদার করতেন। বিভিন্ন ফ্যাশন-আর্কাইভেও তাঁকে নব্বইয়ের দশকের উল্লেখযোগ্য স্টাইল আইকন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন শহরেও এর প্রভাব দেখা গিয়েছিল। এমনকি দার্জিলিং অঞ্চলের স্মৃতিচারণামূলক লেখায় বলা হয়েছে, নব্বইয়ের দশকে স্কুলপড়ুয়া ছেলেদের মধ্যেও ‘আশিকি স্টাইল’ জনপ্রিয় ছিল।

‘আশিকি’ সিনেমায় রাহুল রায়। আইএমডিবি

এক ছবির পর অনেক ছবি, কিন্তু সাফল্য আর ফিরল না
‘আশিকি’র পর স্বাভাবিকভাবেই রাহুলের হাতে আসতে থাকে একের পর এক সিনেমার প্রস্তাব। ১৯৯২ সালে ‘সপ্নে সাজন কে’, ‘গজব তামাশা’, ‘জুনুন’সহ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। বিশেষ করে ‘জুনুন’-এ তাঁকে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখা যায়। এরপর ‘ফির তেরি কাহানি ইয়াদ আয়ে’, ‘গুমরাহ’, ‘জানম’সহ বেশ কিছু সিনেমায় কাজ করেন।

‘ফির তেরি কাহানি ইয়াদ আয়ে’ ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি। মহেশ ভাট পরিচালিত এই ছবিতে তাঁর চরিত্র ছিল একজন অ্যালকোহল আসক্ত চলচ্চিত্র পরিচালকের, যে পুনর্বাসনকেন্দ্রে যায়। ছবিটির আবেগঘন গল্প ও সংগীতের জন্যও এটি মনে রাখা হয়।

কিন্তু সমস্যা হলো, ‘আশিকি’র বিশাল সাফল্যের পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, রাহুল তা আর পূরণ করতে পারেননি। তাঁর অনেক ছবি ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়। বেশ কিছু সিনেমা আবার নির্মাণই শেষ করতে পারেনি। ‘দিল দিয়া চোরি চোরি’, ‘ক্যালযুগ’, ‘ভাজরা’, ‘জব জব দিল মিলে’র মতো একাধিক প্রকল্প আটকে যায়। ফলে একটা সময় নিয়মিত কাজও কমতে থাকে।

এভাবেই যে অভিনেতা ১৯৯০ সালে বলিউডের নতুন প্রজন্মের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ইন্ডাস্ট্রির মূল স্রোত থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন।

বিয়ে, অস্ট্রেলিয়া, তারপর আরও একবার হারিয়ে যাওয়া
ব্যক্তিজীবনেও রাহুলের জীবন ছিল আলোচিত। ২০০০ সালে তিনি মডেল রাজলক্ষ্মী খানভিলকরকে বিয়ে করেন। প্রায় ১৪ বছর সংসার করার পর ২০১৪ সালে দুজনের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদটি ছিল পারস্পরিক সিদ্ধান্তে।

এর আগে ও পরে রাহুল দীর্ঘ সময় অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন। একপর্যায়ে স্ত্রীকে অনুসরণ করে অস্ট্রেলিয়াতেও গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে যে সময়টা কেটেছে, সেটি তাঁর নিজের ভাষায় ছিল বেশ কঠিন।

এক সাক্ষাৎকারে রাহুল জানিয়েছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর নিয়মিত কোনো কাজ ছিল না। এমনকি রান্নাঘরে বাসন মাজার কাজও করেছেন। বলেছিলেন, ভারতে তিনি যে জগতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সেটি একেবারেই বদলে যায়।
একসময় যাঁর ছবি সিনেমার পোস্টারে, গান টেলিভিশনে, চেহারা তরুণদের সেলুনে—তাঁর এমন জীবনযাপন ছিল বলিউডের ঝলমলে দুনিয়ার বিপরীত ছবি।

‘বিগ বস’ দিয়ে আবার আলোচনায়
২০০৬ সালে রাহুল রায়ের জীবনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি ‘বিগ বস’-এর প্রথম মৌসুমে অংশ নেন এবং বিজয়ী হন। সেই সময় এটি ছিল ভারতের নতুন ধরনের রিয়েলিটি টেলিভিশনের শুরু। ৮৬ দিনের প্রতিযোগিতা শেষে রাহুল জয়ী হন।
‘বিগ বস’ তাঁকে আবার সাধারণ দর্শকের সামনে নিয়ে আসে। অনেক তরুণ দর্শক তাঁকে নতুন করে চিনেছিল, আবার নব্বইয়ের দশকের দর্শকদের কাছে ফিরে এসেছিল পুরোনো নস্টালজিয়া।

কিন্তু রিয়েলিটি শোর এই জনপ্রিয়তা তাঁর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে পারেনি। তিনি অভিনয় ও প্রযোজনায় ফিরলেও নিয়মিত বড় কাজের সুযোগ পাননি।

২০২০ সালের ব্রেন স্ট্রোক
রাহুলের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি আসে ২০২০ সালে। ‘এলএসি—লাইভ দ্য ব্যাটল’ ছবির শুটিং করতে গিয়ে লাদাখের কার্গিল এলাকায় থাকাকালে তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তখন তাঁর কথা বলতেও সমস্যা হচ্ছিল। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।
স্ট্রোকের পর তাঁকে নতুন করে হাঁটা, কথা বলা—স্বাভাবিক জীবনের অনেক কিছুই শিখতে হয়েছে। চিকিৎসা ছিল ব্যয়বহুল। এই সময়ে বলিউডের কয়েকজন সহকর্মী তাঁর পাশে দাঁড়ান। সালমান খান তাঁর চিকিৎসার বকেয়া খরচ মেটাতে সাহায্য করেছিলেন বলে রাহুলের ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন।
অসুস্থতার কারণে কাজ থেকে আরও দূরে সরে যেতে হয় তাঁকে। আর দীর্ঘ সময় কাজ না থাকায় তৈরি হয় আর্থিক সংকটও।

‘আশিকি’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

এখন বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচেন
সম্প্রতি রাহুল রায় নিজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, স্ট্রোকের পর নিয়মিত কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। গত কয়েক বছর তিনি নিজের জীবন নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এই সময় আয় করার জন্য নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। এর মধ্যে রয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো কখনো একটি অনুষ্ঠানে নেচে দুই থেকে চার লাখ ভারতীয় রুপি পর্যন্ত আয় করেন তিনি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো।

এই তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। কিন্তু রাহুলের বক্তব্য, তিনি কারও কাছে হাত পাতছেন না—পরিশ্রম করে আয় করছেন। তাঁর নিজের ভাষায়, এই অর্থ তাঁর প্রয়োজন এবং এটিও তাঁর পরিশ্রমের ফল।

আবার ক্যামেরার সামনে ফিরতে চান
রাহুল জানিয়েছেন, গত কয়েক বছর অসুস্থতা ও কাজের অভাবে কঠিন সময় গেছে। কিন্তু তিনি এখনো অভিনয় ছাড়তে চান না। বরং নতুন করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আনন্দই তাঁকে আবার আশাবাদী করছে।

তাঁর অভিনয়জীবনের সাম্প্রতিক কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সায়োনি’, ‘লক্ষ্ণৌ জংশন’, ‘অনোখি’ এবং ‘আগ্রা’র মতো ছবি। বিশেষ করে ‘আগ্রা’র মতো ভিন্নধর্মী সিনেমায় কাজ করা দেখিয়েছে, রাহুল এখনো শুধু ‘আশিকি’র রোমান্টিক নায়ক হয়ে থাকতে চান না।

ইন্ডিয়া টুডে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে