‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-তে সালমান খানের সঙ্গে রাজীব ভার্মা। আইএমডিবি
‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-তে সালমান খানের সঙ্গে রাজীব ভার্মা। আইএমডিবি

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-তে সালমানের বাবা, সেই অভিনেতা এখন হোটেল চালান

বলিউডে এমন অনেক অভিনেতা আছেন, যাঁদের মুখ দর্শকের কাছে পরিচিত, কিন্তু নামটা মনে করতে একটু সময় লাগে। তাঁরা নায়ক নন, পোস্টারের কেন্দ্রবিন্দুতেও থাকেন না; কিন্তু তাঁদের ছাড়া গল্প সম্পূর্ণ হয় না। ভারতীয় চলচ্চিত্রের এমনই এক পরিচিত মুখ রাজীব ভার্মা। একসময় পর্দায় তিনি ছিলেন আদর্শ বাবা, ভদ্র ব্যবসায়ী কিংবা পরিবারের অভিভাবকসুলভ চরিত্রের প্রতীক। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালের ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-তে সালমান খানের বাবার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি কোটি দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে রাজীব ভার্মার জীবন অনেকটাই শান্ত। ভোপালে তাঁর একটি ছোট হোটেল রয়েছে। সেই ব্যবসা দেখাশোনা করেন। পাশাপাশি থিয়েটারে অভিনয় করেন, যা তাঁর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা। তাঁর সন্তানেরা নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। অর্থনৈতিকভাবে বড় কোনো চাপও নেই। ফলে এখন তিনি কাজ করেন নিজের আনন্দের জন্য, প্রয়োজনের জন্য নয়।

কিন্তু আজ যখন অনেক অভিনেতা আলোচনায় থাকার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রিয়েলিটি শো কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়, তখন রাজীব ভার্মা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি মুম্বাইয়ের ব্যস্ত জীবন ছেড়ে ফিরে গেছেন নিজের শহর ভোপালে। সেখানে একটি ছোট হোটেল পরিচালনা করেন, থিয়েটারে অভিনয় করেন এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। চার দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনের শেষে তিনি বেছে নিয়েছেন শান্তি, স্থিরতা এবং ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তির জীবন।

যে ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি যুগের স্মৃতি
হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ শুধু একটি সফল চলচ্চিত্র নয়; এটি নব্বইয়ের দশকের বলিউড রোমান্সের ভিত্তি তৈরি করা একটি মাইলফলক। এই ছবির মাধ্যমে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সালমান খান। ছবির সাফল্যের পর রাতারাতি তারকায় পরিণত হন তিনি। তবে রাজীব ভার্মার স্মৃতিতে ছবিটির গল্প একটু ভিন্ন।

সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি বলেন, আজ সবাই তাঁকে সালমান খানের বাবার চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা হিসেবে চেনে। কিন্তু ছবিটি যখন নির্মিত হয়েছিল, তখন সালমান খান ছিলেন একেবারেই নতুন মুখ। দর্শক তো দূরের কথা, শিল্পের ভেতরেও খুব কম মানুষ জানতেন যে তিনি একদিন বলিউডের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন।

রাজীব ভার্মার মতে, ছবিটির অনেক শিল্পীরই তখন ক্যারিয়ারের শুরু। ভাগ্যশ্রীর এটি ছিল প্রথম ছবি। রিমা লাগু মারাঠি চলচ্চিত্র থেকে এসে নতুনভাবে হিন্দি ছবিতে কাজ শুরু করছিলেন। লক্ষ্মীকান্ত বেরদেও তখন হিন্দি ছবিতে নতুন।
সেই অর্থে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ ছিল একদল স্বপ্নবান মানুষের সম্মিলিত যাত্রা, যার ফলাফল পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দেয়।

রাজীব ভার্মা। আইএমডিবি

টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ থেকে চলচ্চিত্রে আগমন
অনেকে মনে করেন, ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ দিয়েই রাজীব ভার্মার ক্যারিয়ার শুরু। বাস্তবে তা নয়। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগে তিনি টেলিভিশনের পরিচিত মুখ ছিলেন। আশির দশকে ভারতীয় টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘চুনৌতি’ এবং ‘মুজরিম হাজির’-এ অভিনয় করে তিনি দর্শকের নজর কাড়েন।

রাজীব ভার্মার ক্যারিয়ার ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি এমন অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন যাঁরা পরবর্তী সময়ে বলিউডের শীর্ষ তারকায় পরিণত হয়েছেন।অক্ষয় কুমারের শুরুর দিকের ছবিগুলোর একটি ‘দিদার’-এ তিনি অভিনয় করেন। একই ছবিতে ছিলেন কারিশমা কাপুরও। পরবর্তী সময়ে অক্ষয় ও কারিশমা দুজনই বলিউডের বড় তারকা হয়ে ওঠেন। লারা দত্তের প্রথম চলচ্চিত্রেও কাজ করেছিলেন তিনি।

মজার বিষয় হলো, অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন নিয়মিত চাকরিও করেছেন। অনেক অভিনেতার মতো অভিনয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেননি। প্রায় এক দশক তিনি চাকরি ও অভিনয় একসঙ্গে সামলেছেন।

১৯৯৬ সালে এসে তিনি স্থায়ী চাকরি ছেড়ে পুরো সময় অভিনয়ে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু তখনো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। তিনি কখনো তারকাখ্যাতির পেছনে ছোটেননি। বরং চরিত্র ও কাজকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

অক্ষয়, কারিশমা, লারা—অনেক তারকার শুরুর সাক্ষী
রাজীব ভার্মার ক্যারিয়ার ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি এমন অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন যাঁরা পরবর্তী সময়ে বলিউডের শীর্ষ তারকায় পরিণত হয়েছেন।
অক্ষয় কুমারের শুরুর দিকের ছবিগুলোর একটি ‘দিদার’-এ তিনি অভিনয় করেন। একই ছবিতে ছিলেন কারিশমা কাপুরও। পরবর্তী সময়ে অক্ষয় ও কারিশমা দুজনই বলিউডের বড় তারকা হয়ে ওঠেন। লারা দত্তের প্রথম চলচ্চিত্রেও কাজ করেছিলেন তিনি।

তবে এসব নিয়ে তাঁর কোনো বিশেষ উচ্ছ্বাস নেই। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর মূল্যায়ন তারকাখ্যাতি দিয়ে নয়, অভিনয়ক্ষমতা দিয়ে হওয়া উচিত। একজন ভালো অভিনেতা তারকা হোক বা চরিত্রাভিনেতা—ভালো অভিনেতাই।

টাইপকাস্টিংয়ের ফাঁদ
বলিউডে একটি পুরোনো সমস্যা হলো টাইপকাস্টিং। কোনো অভিনেতা একটি চরিত্রে জনপ্রিয় হলে তাঁকে বারবার একই ধরনের চরিত্রে দেখা যায়। রাজীব ভার্মাও এই অভিজ্ঞতার বাইরে নন।

রাজীব ভার্মা। আইএমডিবি

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-তে তিনি একজন ব্যবসায়ীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি ব্যাপক সফল হওয়ার পর নির্মাতারা তাঁকে একই ধরনের চরিত্রে কাস্ট করতে শুরু করেন। একের পর এক বাবা, ব্যবসায়ী কিংবা অভিজাত পরিবারের প্রধানের চরিত্র তাঁর কাছে আসতে থাকে।

শুরুর দিকে বিষয়টি সমস্যা মনে না হলেও ধীরে ধীরে তিনি একঘেয়েমি অনুভব করতে শুরু করেন।

একসময় তিনি বুঝতে পারেন, অভিনয়ের যে আনন্দ তাঁকে এই পেশায় এনেছিল, তা হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন কিছু করার সুযোগ কমে যাচ্ছে। চরিত্র বদলাচ্ছে না, গল্প বদলাচ্ছে না, শুধু প্রযোজক ও পরিচালক বদলাচ্ছেন।

যখন অভিনয়ও চাকরি মনে হতে শুরু করে
অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিগুলোর একটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাজীব ভার্মা বলেন, একসময় অভিনয়ও তাঁর কাছে আগের অফিসের চাকরির মতো মনে হতে শুরু করে। পার্থক্য ছিল শুধু পারিশ্রমিকে।

তিনি অনুভব করেন, শুটিং, ডাবিং, প্রচারণা—সবকিছুই যেন রুটিনে পরিণত হয়েছে। শিল্পসৃষ্টির আনন্দের জায়গায় এসেছে পেশাগত দায়িত্ব। অনেক অভিনেতা হয়তো এই অবস্থাতেও কাজ চালিয়ে যান। কারণ খ্যাতি, অর্থ এবং আলোচনায় থাকার আকর্ষণ সহজে ছাড়তে ইচ্ছা করে না। কিন্তু রাজীব ভার্মা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন।

ভোপালে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
পাঁচ-ছয় বছর আগে তিনি স্থায়ীভাবে ভোপালে ফিরে যান। এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ আসেনি। বহু বছর ধরে তিনি অনুভব করছিলেন যে পরিবার, বন্ধু এবং ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো থেকে তিনি দূরে সরে যাচ্ছেন।

বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—এসব যেন জীবনের বাইরে চলে গিয়েছিল। একসময় তিনি উপলব্ধি করেন, জীবনে পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুখও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই মুম্বাইয়ের ব্যস্ততা ছেড়ে তিনি নিজের শহরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

হোটেল ব্যবসা, থিয়েটার আর অবসরের আনন্দ
বর্তমানে রাজীব ভার্মার জীবন অনেকটাই শান্ত। ভোপালে তাঁর একটি ছোট হোটেল রয়েছে। সেই ব্যবসা দেখাশোনা করেন। পাশাপাশি থিয়েটারে অভিনয় করেন, যা তাঁর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা। তাঁর সন্তানেরা নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। অর্থনৈতিকভাবে বড় কোনো চাপও নেই। ফলে এখন তিনি কাজ করেন নিজের আনন্দের জন্য, প্রয়োজনের জন্য নয়।

অনেকের কাছে এটি হয়তো ক্যারিয়ারের পতন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাজীব ভার্মার কাছে এটি স্বাধীনতার আরেক নাম।

ওটিটি যুগে বদলে যাওয়া তারকাখ্যাতি
রাজীব ভার্মা মনে করেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে অভিনয়ের সুযোগ বেড়েছে। নতুন শিল্পীরা কাজ পাচ্ছেন। তবে তাঁর মতে, আগের ধরনের তারকাখ্যাতি আর নেই।

একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একবার কয়েকজন পর্যটক তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে আসেন। তাঁরা তাঁর অভিনীত বিভিন্ন চরিত্রের কথা বলেন, প্রশংসা করেন। কিন্তু সবশেষে জিজ্ঞেস করেন, ‘স্যার, আপনার নামটা কী?’ এই ঘটনাকে তিনি অপমান হিসেবে নেননি। বরং হাস্যরসের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন।
তাঁর বিশ্বাস, মানুষ যদি চরিত্রটিকে মনে রাখে, সেটাই একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

রাজীব ভার্মা কখনো বলিউডের প্রথম সারির তারকা ছিলেন না। তাঁর নামে সিনেমা বিক্রি হয়নি। কোটি কোটি ভক্তও ছিল না। কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের ইতিহাসে তাঁর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
‘হাম দিল দে চুকে সনম’, ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’, ‘কোই মিল গেয়া’, ‘চলতে চলতে’সহ বহু জনপ্রিয় ছবিতে তিনি কাজ করেছেন। প্রতিটি ছবিতে তিনি গল্পের ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে