টেলিভিশনের অভিনেতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু। এরপর সিনেমা, প্রযোজনা, ভিএফএক্স, ক্রিকেট, বিজ্ঞাপন ও নানা ব্যবসায় বিনিয়োগ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এভাবেই নিজের সাম্রাজ্য গড়েছেন শাহরুখ খান। হুরুন ইন্ডিয়ার ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি রুপি বা ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু কীভাবে একের পর এক পদক্ষেপে এই বিপুল সম্পদের মালিক হলেন বলিউডের বাদশাহ?
বলিউডে শাহরুখ খানের পরিচয় শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয়। তিনি প্রযোজক, ব্যবসায়ী, ক্রিকেট দলের মালিক এবং বিনোদনশিল্পের একজন সফল উদ্যোক্তা। পর্দায় তাঁর অভিনয় যেমন দর্শককে মুগ্ধ করেছে, তেমনি পর্দার বাইরেও তাঁর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত তৈরি করেছে আলাদা পরিচিতি। আজ তাঁর সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। অথচ এই যাত্রার শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ।
১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর দিল্লিতে জন্ম শাহরুখের। বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী, মা লতিফ ফাতিমা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। দিল্লির সেন্ট কলম্বাস স্কুলে পড়াশোনা শেষে হংসরাজ কলেজে ভর্তি হন। পরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও অভিনয়ের টানে তা শেষ করেননি। থিয়েটার ও টেলিভিশনে কাজ করতে করতেই তৈরি হয় বড় পর্দায় যাওয়ার স্বপ্ন।
১৯৯১ সালে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান শাহরুখ। পরের বছর ‘দিওয়ানা’ দিয়ে বড় পর্দায় পরিচিতি পান। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, একদিন এই অভিনেতাই হয়ে উঠবেন বিশ্বের অন্যতম ধনী অভিনয়শিল্পীদের একজন।
সিনেমার পারিশ্রমিক থেকে ব্যবসার মালিকানা
শাহরুখের সম্পদ গড়ার প্রথম বড় ভিত্তি ছিল অভিনয়। নব্বইয়ের দশকে ‘বাজিগর’, ‘ডর’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ও ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে তারকাখ্যাতি পান। একের পর এক হিট ছবির সুবাদে বাড়তে থাকে তাঁর পারিশ্রমিক। তবে অন্য অনেক তারকার মতো শুধু নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি তিনি।
ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে ছবির লাভের অংশীদার হওয়ার কৌশলও গ্রহণ করেন। অর্থাৎ কোনো সিনেমার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নেওয়ার পাশাপাশি ছবির ব্যবসা ভালো হলে সেখান থেকেও আয় করার সুযোগ তৈরি করেন। ‘পাঠান’ ও ‘জওয়ান’-এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমা তাঁর এই কৌশলের আর্থিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। অভিনয়ের আয়কে ব্যবসায় বিনিয়োগ করার সুযোগও তৈরি হয় এভাবেই।
প্রথম ব্যবসায়িক উদ্যোগে ধাক্কা
শাহরুখের ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্পে শুরুতেই সাফল্য আসেনি। ১৯৯৯ সালে অভিনেত্রী জুহি চাওলা ও পরিচালক আজিজ মির্জার সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ড্রিমজ আনলিমিটেড। অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমা নির্মাণ ও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়াই ছিল এর লক্ষ্য।
প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সিনেমা ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ মুক্তি পায় ২০০০ সালে। শাহরুখ ও জুহি অভিনীত ছবিটি বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এরপর ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ‘অশোকা’ও ব্যবসায়িকভাবে বড় সাফল্য পায়নি। পরপর দুই ছবির ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠানটির জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করে।
তবে এখানেই থেমে যাননি শাহরুখ। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চলতে চলতে’ তুলনামূলক ভালো ব্যবসা করে।
রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট: সাম্রাজ্যের ভিত্তি
ড্রিমজ আনলিমিটেডের অভিজ্ঞতার পর শাহরুখ নিজের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে আরও বিস্তৃত করেন। ২০০২ সালে গড়ে ওঠা রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট ধীরে ধীরে তাঁর সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্ত্রী গৌরী খানও এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ম্যায় হু না’ ছিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা। এরপর ‘ওম শান্তি ওম’, ‘বিল্লু’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’, ‘দিলওয়ালে’, ‘রইস’ ও ‘জওয়ান’-এর মতো সিনেমা নির্মাণ ও প্রযোজনায় যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রেড চিলিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু সিনেমা তৈরির প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকেনি। চলচ্চিত্রের স্বত্ব, পরিবেশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজেও বিস্তৃত হয়েছে এর কার্যক্রম। ফলে একটি সিনেমা মুক্তির পরও তার স্বত্ব ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ শাহরুখের সম্পদ তৈরির পেছনে শুধু অভিনয় নয়, সিনেমার মালিকানা ও ব্যবসায়িক অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভিএফএক্স ব্যবসায় বিনিয়োগ
সিনেমার ব্যবসায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বা ভিএফএক্সে বিনিয়োগ। সাধারণত দর্শক পর্দায় অভিনেতাদের অভিনয় দেখেন, কিন্তু সিনেমার পেছনে যে প্রযুক্তিগত কাজ থাকে, সেটিও বড় ব্যবসার ক্ষেত্র। শাহরুখ এই সম্ভাবনা বুঝেছিলেন।
রেড চিলিজের অধীনে গড়ে ওঠে রেড চিলিজ ভিএফএক্স। ‘রা.ওয়ান’, ‘কৃষ থ্রি’, ‘ফ্যান’, ‘জিরো’সহ বিভিন্ন সিনেমায় প্রতিষ্ঠানটি ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের কাজ করেছে। অন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সিনেমাতেও কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এখানে শাহরুখের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার একটি দিক স্পষ্ট। তিনি শুধু নিজের অভিনীত সিনেমার জন্য অর্থ ব্যয় করেননি, বরং সেই সিনেমা তৈরির প্রযুক্তি ও দক্ষতাকেও ব্যবসায়িক সম্পদে পরিণত করেছেন।
ক্রিকেটে বিনিয়োগ, কলকাতা নাইট রাইডার্স
শাহরুখের সম্পদ বৃদ্ধির গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগগুলোর একটি ক্রিকেট। ২০০৮ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) প্রথম আসরের আগে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকানায় যুক্ত হন তিনি। জুহি চাওলা ও তাঁর স্বামী জয় মেহতার সঙ্গে মিলে দলটি কেনেন। সে সময় প্রায় ২৬২ কোটি রুপি বিনিয়োগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শুরুর দিকে কেকেআরের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। প্রথম তিন আসরে দলটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু বিনিয়োগ থেকে সরে আসেননি শাহরুখ। ২০১২ সালে প্রথমবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয় কলকাতা। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতে দলটি। এরপর ২০২৪ সালেও চ্যাম্পিয়ন হয় কেকেআর।
এখানেই শেষ নয়। ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগের ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স, যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেটের লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্সসহ বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় নাইট রাইডার্স ব্র্যান্ডের বিস্তার ঘটেছে।
বিজ্ঞাপনে শাহরুখের আলাদা বাজার
শাহরুখের সম্পদের আরেকটি বড় উৎস বিজ্ঞাপন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যের দূত হিসেবে কাজ করছেন তিনি। গাড়ি, ঘড়ি, পানীয়, প্রযুক্তিপণ্য, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে তাঁকে।
এখানে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি জনপ্রিয়তা। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর ভক্ত রয়েছে। ফলে একটি বিজ্ঞাপনে তাঁর উপস্থিতি শুধু ভারতীয় বাজারেই প্রভাব ফেলে না, আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছায়।
২০২৬ সালে প্রকাশিত ভারতীয় তারকাদের ব্র্যান্ডমূল্য–সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, শাহরুখের ব্র্যান্ডমূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৯৪ কোটি রুপি।
মান্নাত থেকে দুবাই, সম্পদের বড় অংশ আবাসন
শাহরুখের সম্পদের আলোচনায় তাঁর বাড়িগুলোর কথা না বললেই নয়। মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা মান্নাত শুধু তাঁর বাড়ি নয়, ভক্তদের কাছে এটি একটি দর্শনীয় স্থান। একসময় এই বাড়ির নাম ছিল ভিলা ভিয়েনা। পরে শাহরুখ এটি কিনে সংস্কার করেন। স্ত্রী গৌরী খান বাড়িটির অভ্যন্তরীণ নকশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এ ছাড়া দুবাইয়ের পাম জুমেইরায় রয়েছে তাঁর বিলাসবহুল ভিলা। লন্ডন ও ভারতের আলিবাগেও তাঁর সম্পত্তি থাকার খবর বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।
পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব
শাহরুখের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের আরেকটি দিক হলো পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা। স্ত্রী গৌরী খান শুধু তাঁর জীবনসঙ্গী নন, ব্যবসারও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের পাশাপাশি গৌরী নিজের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করেন।
ছেলে আরিয়ান খানও বিনোদন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। ২০২৫ সালে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য বার্ডস অব বলিউড’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। মেয়ে সুহানা খানও অভিনয়ে এসেছেন। অর্থাৎ পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও বিনোদনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
১০ হাজার কোটি রুপির হিসাব
হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৬ অনুযায়ী, শাহরুখ খানের মোট সম্পদের আনুমানিক পরিমাণ ১০ হাজার কোটি রুপি। এই হিসাব তাঁকে ভারতের সবচেয়ে ধনী অভিনেতার অবস্থানে রেখেছে। তালিকায় তাঁর পরেই রয়েছেন অমিতাভ বচ্চন, যাঁর সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৪ হাজার কোটি রুপি।
তবে মজার বিষয় হলো, ২০২৫ সালের হুরুন তালিকায় শাহরুখের সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ১২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি। নতুন তালিকায় তাঁর সম্পদের আনুমানিক মূল্য কমেছে প্রায় ২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে