
শৈল্পিক ধারার সিনেমা থেকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক সিনেমার মুখ তিনি। বলিউড তো বটেই, তাঁকে দেখা গেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকল্পে। অভিনয় করেছেন ৫০০–এর বেশি সিনেমায়, অভিনয়ে তৈরি করেছেন নিজস্ব ধারা। তিনি আর কেউ নন, অনুপম খের। আজ এই অভিনেতার জন্মদিন। হিমাচল প্রদেশের সিমলায় জন্ম নেওয়া অভিনেতা আজ ৭১ বছরে পা দিলেন। তবে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরির পেছনে অনুপমের ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম।
ব্যাংকে ছিল মাত্র ৪০০ টাকা
অনুমপ খের আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। কিন্তু জীবনের এক সময়ে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল মাত্র ৪০০ টাকা। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সেই কঠিন সময়ের স্মৃতি তুলে ধরেছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে অনুপম খের জানান, ২০০০ সালের শুরুর দিকে তিনি টেলিভিশন প্রযোজনায় বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ফলে তাঁর আর্থিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ে।
২০০৪ সালের দিকে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র ৪০০ টাকা অবশিষ্ট ছিল। সেই সময় পরিবার চালাতে তাঁকে ঋণ নিতে হয়েছিল এবং সুদের চাপ ক্রমেই বাড়ছিল।
অনুপম খের বলেন, ‘আমরা ধার করে চলছিলাম। সুদের পরিমাণ এত বেড়ে গিয়েছিল যে আমার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বলেছিলেন আমরা প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছি। ব্যাংকে মাত্র ৪০০ টাকা ছিল। আমার বাড়ি ও অফিস—দুটোই বন্ধক রাখা ছিল।’
সাফল্যের আড়ালে লুকানো সংগ্রাম
এই কঠিন সময়ে অনুপম খের একের পর এক বড় ছবিতে অভিনয় করছিলেন। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল তাঁর ক্যারিয়ার ও আর্থিক অবস্থা খুব ভালো চলছে। কিন্তু বাস্তবে তিনি তখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তবু ধীরে ধীরে তিনি আবার নিজের অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
শুরুর দিকে একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে ছিলাম। বলা যায়, সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতা। তবে এখন আর আমি কোনো দৌড়ে নেই। এখন তো অনেকে প্রতিটি ছবিতেই দেখাতে চায়, সে কতটা সেরা। এখন সবকিছুই বক্স অফিসনির্ভর হয়ে গেছে। কত কোটি আয় করল ছবি, সেটা অনেক কিছু ঠিক করে দেয়।অনুপম খের
আজ শত কোটি টাকার মালিক
বর্তমানে অনুপম খেরের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি সাধারণত ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নেন। প্রতিবছর তাঁর আয় ৪০ কোটি টাকার কাছাকাছি বলেও জানা যায়।
চার দশকের বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ার
চার দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় করছেন অনুপম খের। তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা ৫০০-এর বেশি। তিনি মনে করেন, অভিনয় এমন একটি শিল্প যা যতই শেখা হোক, শেখার শেষ নেই। তিনি বলেন, নতুন অভিনেতাদের মতোই এখনো প্রতিটি কাজের প্রতি তাঁর একই রকম রোমাঞ্চ থাকে। অভিনয় নিয়ে নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি মনে করি, ঈশ্বর আমার প্রতি খুবই সদয়। তিনি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। আমি নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এক ছেলে। আমার বাবা বন বিভাগের সাধারণ এক কেরানি ছিলেন। আমি শুধু স্বপ্ন দেখতে জানতাম। একদিন বুঝলাম, শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না, একে পূরণের জন্য কাজ করতে হবে। আমি পরিশ্রম করেছি। আজ তার সুফল ভোগ করছি। তবে আমি মনে করি, এখন আমার ক্যারিয়ারে বিরতি এসেছে। তাই এখন আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি। প্রথমার্ধ সম্পর্কে আলোচনা করছি। এবার আমার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হবে। দেখি আরও কী কী করতে পারি।’
সিনেমা থেকে সিনেমায় নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে। এ প্রসঙ্গে অনুপম বলেন, ‘আমি তো শুরু থেকে নিজেকে আবিষ্কার করে আসছি। আমার প্রথম ছবিতেই আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি। সারাংশ ছবিতে ২৬ বছর বয়সে ৬৫ বছরের বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করেছি। আমার ক্যারিয়ার আবিষ্কারে ভরা। খুব কম অভিনেতা আছেন, যাঁরা প্রথাগত একঘেয়েমি (টাইপ কাস্ট) থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। আমি তাঁদের একজন। আমি নিজের প্রতিটা ছবিতে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি। আমি ‘কর্মা’, ‘রাম লক্ষ্মণ’, ‘স্পেশাল ২৬’, ‘আ ওয়েডনেস ডে’র মতো অজস্র ছবি করেছি। অভিনয় একটা এমন ক্ষেত্র, যেখানে নিজেকে নানান রূপে মেলে ধরা যায়। নিজেকে নিয়ে নিরীক্ষা করা যায়। অন্য কোনো পেশায় এই সুযোগ কম।’
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বলিউডের নানা উত্থান–পতন দেখেছেন অনুপম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে ছিলাম। বলা যায়, সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতা। তবে এখন আর আমি কোনো দৌড়ে নেই। এখন তো অনেকে প্রতিটি ছবিতেই দেখাতে চায়, সে কতটা সেরা। এখন সবকিছুই বক্স অফিসনির্ভর হয়ে গেছে। কত কোটি আয় করল ছবি, সেটা অনেক কিছু ঠিক করে দেয়।’
অভিনয় শিক্ষায় অবদান
অভিনয়ের পাশাপাশি নতুন শিল্পী তৈরিতেও কাজ করছেন অনুপম খের। ২০০৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অ্যাক্টর প্রিপায়ার্স নামের একটি অভিনয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। এখানে অভিনয়, লেখালেখি ও পারফরম্যান্স নিয়ে বিভিন্ন কোর্স করানো হয়।
দ্য ইকোনমিক টাইমস অবলম্বনে