
পুরোনো একটি ছবি। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন শাহরুখ খান। চারপাশে কয়েকজন কিশোর। প্রথম দেখায় ছবিটি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই চমকটা ধরা পড়ে। শাহরুখের পাশের সেই লাজুক কিশোরটাই আজকের বলিউডের অন্যতম আলোচিত অভিনেতা। এবার আরেকটি ছবি দেখি। জন্মদিনের কেক সামনে এক কিশোর। হাসিমুখ সেই কিশোরটি ছিল শাহরুখ খানের পাশে। দুই ছবিতে যে কিশোরের উপস্থিতি, তিনি ভিকি কৌশল।
আজ ১৬ মে ভিকি কৌশলের জন্মদিন। ৩৮ বছরে পা দিলেন তিনি। জন্মদিন ঘিরেই আবার নতুন করে সামনে এসেছে সেই পুরোনো ছবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ছবিটি শেয়ার করে প্রশ্ন তুলেছেন, শাহরুখের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে চিনতে পেরেছেন? অনেকে প্রথমে ভুলও করেছিলেন। কিন্তু ছবির গল্প জানার পর বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই।
ছবিটি ২০০১ সালের। তখন ‘অশোকা’ ছবির শুটিং চলছিল। সেটে গিয়েছিলেন অষ্টম শ্রেণিতে পড়া ভিকি। তাঁর বাবা শ্যাম কৌশল তখন বলিউডের পরিচিত স্টান্ট কোরিওগ্রাফার।
সেই সূত্রেই ছোটবেলা থেকে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে পরিচয় ছিল ভিকির। তবে পরিচিত পরিবেশে বড় হলেও বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করা মোটেও সহজ ছিল না তাঁর জন্য।
সেই ভাইরাল ছবিটি ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছিলেন ভিকির বাবা শ্যাম কৌশল। আবেগঘন পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘সবই স্রষ্টার দয়া।’ ছবিতে থাকা আরেক তরুণ ছিলেন পরবর্তী সময়ে খ্যাতিমান নির্মাতা হওয়া বিষ্ণু বর্ধন। শ্যাম কৌশলের বিশ্বাস, সেদিনই হয়তো ভাগ্য এক সুতায় বেঁধে দিয়েছিল দুই তরুণকে।
আজকের সফল তারকা হওয়ার আগে ভিকির জীবন ছিল একেবারেই অন্য রকম। তিনি পড়াশোনা করেছেন ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। কলেজজীবনে প্রতিদিন বাসে চড়ে যাতায়াত করতেন। মাসিক হাতখরচ ছিল মাত্র ৬০০ রুপি। সেই টাকা থেকে বাসভাড়া, বড়া পাও খেয়ে সামান্য কিছু জমিয়ে দুই সপ্তাহ পরপর সিনেমা দেখতেন।
প্রথম জীবনে অভিনয়কে পেশা হিসেবে ভাবেননি ভিকি। সবাই যখন এমবিএ কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করছিল, তিনিও সেই স্রোতেই ছিলেন। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় একটি ‘ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট’ তাঁর জীবন বদলে দেয়। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অফিসঘেরা জীবন দেখে হঠাৎ মনে হয়েছিল, ‘এই ভবিষ্যৎ আমার জন্য নয়।’ তখনই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, আসলে কী করতে চান? উত্তর এসেছিল একটাই-অভিনয়।
তবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ ছিল না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে খুব আত্মবিশ্বাস পেতেন না তিনি। তবু অভিনয়ের টান ছাড়তে পারেননি। পরিবারের অলিখিত নিয়ম ছিল, আগে পড়াশোনা শেষ করতে হবে। তাই ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেই অভিনয়ের পথে হাঁটা শুরু করেন।
২০০৯ সালে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন ভিকি। তার আগে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন অনুরাগ কাশ্যপ-এর ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ ছবিতে। ছোট ছোট অডিশন, বিজ্ঞাপন, শর্টফিল্ম—সব জায়গায় চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। একটা সময় ভেঙেও পড়েছিলেন। তখন তাঁর সবচেয়ে বড় সাহস ছিলেন মা। হতাশ হয়ে একদিন মাকে বলেছিলেন, তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে সফল হবেন। মা শুধু বলেছিলেন, ‘এটা হবে কি না, সেটা তোমারই দায়িত্ব। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।’ সেই কথাই বদলে দেয় ভিকির জীবন।
২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাসান’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিনয়জীবন শুরু হয় তাঁর। এরপর ‘সঞ্জু’ তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। তবে জীবন পুরো বদলে যায় ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ মুক্তির পর। ছবিটি বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য পায়, আর ভিকি হয়ে ওঠেন বলিউডের নতুন নির্ভরতার নাম। পরে ‘সর্দার উধাম’, ‘জরা হটকে জরা বাঁচকে’, ‘স্যাম বাহাদুর’–এর মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের অভিনয়দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ‘সর্দার উধাম’-এ তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।
ব্যক্তিজীবনেও ভিকি আলোচনায় থাকেন। ২০২১ সালে বলিউড অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের সম্পর্ক ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে ভক্তদের আগ্রহও কম নয়। বলিউডে এখন তাঁরা অন্যতম জনপ্রিয় তারকা দম্পতি।
অভিনয়ের শুরুতে নিজের জন্য পাঁচ বছরের সময় ঠিক করেছিলেন ভিকি। শিখবেন, প্রস্তুতি নেবেন, তারপর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন—এটাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা। অভিনয়ের প্রথম ক্লাসে শিক্ষক প্রশ্ন করেছিলেন, পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান? ভিকির উত্তর ছিল, ‘স্যার, পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে হলের সামনে আমার পোস্টার দেখতে পাবেন।’ আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক পাঁচ বছর পরই মুক্তি পায় ‘মাসান’।
আজ সেই পোস্টার শুধু সিনেমা হলেই নয়, ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। আর শাহরুখের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোর এখন নিজেই বলিউডের অন্যতম উজ্জ্বল তারকা।