অমিতাভ বচ্চন। এক্স থেকে
অমিতাভ বচ্চন। এক্স থেকে

ভোটে জিতেও কেন রাজনীতি ছেড়েছিলেন অমিতাভ

অভিনয় থেকে রাজনীতিতে এসে চমকে দিয়েছেন দক্ষিণ ভারতের তারকা থালাপতি বিজয়। তাঁর দল এখন সরকার গঠনের চেষ্টা করছে। সিনেমা থেকে রাজনীতিতে এসেছেন অনেক ভারতীয় তারকা। কেউ রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন, কেউ আবার দূর সরে গেছেন। তেমনই একজন অমিতাভ বচ্চন। ভোটে জেতার পরও তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যান।

পর্দায় অমিতাভ ছিলেন ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’; বাস্তবেও কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের নাম। কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন তিনি অভিনয় ছেড়ে রাজনীতিতে পা রাখলেন, তখন কেউ ভাবেননি মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তাঁকে সেই জগৎ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে তীব্র বিতর্ক, কাদা–ছোড়াছুড়ি আর মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে।

আরও বড় তারকা
১৯৮২ সালে ‘কুলি’ ছবির শুটিংয়ের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন অমিতাভ বচ্চন। সহ-অভিনেতা পুনিত ইসারের সঙ্গে একটি অ্যাকশন দৃশ্যে টাইমিং ভুল হওয়ায় মারাত্মক আঘাত পান তিনি। কয়েক সপ্তাহ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। ভারতের নানা প্রান্তে মানুষ তাঁর জন্য প্রার্থনা করেছে, হাসপাতালের বাইরে ভিড় জমেছে হাজারো ভক্তের।

রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বচ্চন পরিবারের সম্পর্ক ছিল বহু পুরোনো। অমিতাভ বচ্চনের বাবা হরীষ রাই বচ্চন ও নেহরু-গান্ধী পরিবারের মধ্যে ছিল পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা। সেই সম্পর্কের কারণেই রাজীবের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অমিতাভ। কিন্তু এ ঘনিষ্ঠতাই পরে অমিতাভের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়াতে থাকে, অমিতাভ নাকি প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ মানুষ। অনেকে আশঙ্কা করতে থাকেন, তাঁর জনপ্রিয়তা একসময় তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের বড় রাজনৈতিক মুখে পরিণত করতে পারে।

সেই দুর্ঘটনার পর অমিতাভ আর শুধু চলচ্চিত্র তারকা ছিলেন না; তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় আবেগের প্রতীক। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার দিন মুম্বাইয়ের রাস্তায় মানুষের ঢল প্রমাণ করে দিয়েছিল, এই মানুষটির জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক নেতাদের চেয়েও কম নয়।

ঠিক এ সময়ই ভারতীয় রাজনীতিতে ঘটে আরেক বড় ট্র্যাজেডি। ১৯৮৪ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন অস্থির। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তাঁর ছেলে রাজীব গান্ধী, যিনি ছিলেন অমিতাভের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধুর আহ্বানেই রাজনীতিতে নামেন অমিতাভ।

‘কুলি’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চন। আইএমডিবি

এলাহাবাদের ভোটযুদ্ধ: তারকার কাছে হারলেন প্রবীণ রাজনীতিক
১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হন অমিতাভ বচ্চন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন অভিজ্ঞ রাজনীতিক হেমবতী নন্দন বাহুগুনা। সেই নির্বাচন ছিল অনেকটা তারকা বনাম প্রচলিত রাজনীতির লড়াই। অমিতাভ যেখানে যেতেন, মানুষের ঢল নামত। কেউ তাঁকে দেখতে আসত, কেউ হাত ছুঁতে চাইত, কেউ আবার বিশ্বাস করত—পর্দার ন্যায়বিচারক নায়ক বাস্তবেও মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।

ফলাফলও ছিল বিস্ময়কর। রেকর্ড ব্যবধানে জয় পান অমিতাভ। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেটি ছিল অন্যতম আলোচিত বিজয়। এক চলচ্চিত্র তারকা যে এত বিপুল ভোটে জিততে পারেন, তা অনেক প্রবীণ নেতাকেই অস্বস্তিতে ফেলেছিল।

দিল্লির করিডরে ‘বহিরাগত’ অমিতাভ
সংসদ সদস্য হওয়ার পর অমিতাভ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছিলেন। তিনি মুম্বাই ও দিল্লির মধ্যে সময় ভাগ করতেন। এলাহাবাদের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতেন, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় দলের ভেতর থেকেই।
রাজনীতির পুরোনো খেলোয়াড়েরা অমিতাভকে সহজভাবে নিতে পারেননি। কারণ, তিনি ছিলেন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। একজন ‘নতুন’ মানুষ হয়েও তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশাধিকার পাচ্ছিলেন সহজে। এতে অনেকেই নিজেদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে বলে মনে করতে শুরু করেন।

‘জঞ্জির’ সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন। আইএমডিবি

সাংবাদিক বীর সাংঘি পরে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, কংগ্রেসের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা অমিতাভের জনপ্রিয়তাকে হুমকি হিসেবে দেখতেন। এলাহাবাদে তিনি কয়েক সপ্তাহ না গেলেই শহরে তাঁর ‘নিখোঁজ’ পোস্টার লাগানো হতো। উদ্দেশ্য ছিল, সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা।
অমিতাভ তখন বুঝতে শুরু করেন, চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতা আর রাজনীতির লড়াই এক জিনিস নয়।

বন্ধুত্বের মূল্য
রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বচ্চন পরিবারের সম্পর্ক ছিল বহু পুরোনো। অমিতাভ বচ্চনের বাবা হরীষ রাই বচ্চন ও নেহরু-গান্ধী পরিবারের মধ্যে ছিল পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা। সেই সম্পর্কের কারণেই রাজীবের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অমিতাভ।
কিন্তু এ ঘনিষ্ঠতাই পরে অমিতাভের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়াতে থাকে, অমিতাভ নাকি প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ মানুষ। অনেকে আশঙ্কা করতে থাকেন, তাঁর জনপ্রিয়তা একসময় তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের বড় রাজনৈতিক মুখে পরিণত করতে পারে।

ভারতের রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা যেমন শক্তি, তেমনি বিপদও। অমিতাভ খুব দ্রুত সেই বাস্তবতা বুঝতে শুরু করেছিলেন।

বফর্স: যে কেলেঙ্কারি বদলে দিল সব
১৯৮৭ সালে ভারতীয় রাজনীতিকে কাঁপিয়ে দেয় বফর্স কেলেঙ্কারি। সুইডিশ অস্ত্র নির্মাতা বফর্স কোম্পানির সঙ্গে ভারতের কামান চুক্তিতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সেই বিতর্কে নানা নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় অমিতাভ বচ্চনের নামও।
অভিযোগ ছিল, তাঁর ভাই অজিতাভ বচ্চন নাকি বিদেশি অ্যাকাউন্টে অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত। যদিও অমিতাভের বিরুদ্ধে কখনোই সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু বিরোধীরা বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রচার চালাতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেই সময়কে জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন অমিতাভ। টেলিভিশন উপস্থাপক সিমি গাড়োয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সেই সময়টা ছিল নরকের মতো।অমিতাভের ধারণা ছিল, চলচ্চিত্র তারকা হিসেবে যেহেতু তিনি দীর্ঘদিন বিতর্ক সামলেছেন, তাই রাজনৈতিক সমালোচনাও সামলে নিতে পারবেন। কিন্তু পরে বুঝেছিলেন, রাজনীতির আক্রমণ অনেক বেশি ব্যক্তিগত, দীর্ঘস্থায়ী ও কৌশলী। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আক্রমণের প্রকৃতি বুঝতে পারিনি।’ এ অভিজ্ঞতা তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও।

চলচ্চিত্রজীবনে গসিপ, সমালোচনা, কটাক্ষ—এসবের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন অমিতাভ। কিন্তু রাজনৈতিক আক্রমণের নির্মমতা ছিল অন্য রকম। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ, সংসদে বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে তিনি ক্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
অবশেষে মাত্র দুই বছরের মাথায় লোকসভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন অমিতাভ বচ্চন।

‘এটা ছিল নরক’
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেই সময়কে জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন অমিতাভ। টেলিভিশন উপস্থাপক সিমি গাড়োয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সেই সময়টা ছিল নরকের মতো।
অমিতাভের ধারণা ছিল, চলচ্চিত্র তারকা হিসেবে যেহেতু তিনি দীর্ঘদিন বিতর্ক সামলেছেন, তাই রাজনৈতিক সমালোচনাও সামলে নিতে পারবেন। কিন্তু পরে বুঝেছিলেন, রাজনীতির আক্রমণ অনেক বেশি ব্যক্তিগত, দীর্ঘস্থায়ী ও কৌশলী। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আক্রমণের প্রকৃতি বুঝতে পারিনি।’ এ অভিজ্ঞতা তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও।

এরপর অমিতাভ আর কখনো সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেননি। বরং অভিনয়ে ফিরে এসে নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলেন। নব্বইয়ের দশকের আর্থিক বিপর্যয়, কোম্পানির ঋণ, ক্যারিয়ারের পতন—সবকিছু পেরিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ান। পরে ‘কৌন বনেগা ক্রৌড়পতি’ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও কিংবদন্তিতে পরিণত করে।

নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ক্ষত রয়ে যায়
বহু বছর পর আদালত ও তদন্তপ্রক্রিয়ায় অমিতাভ বচ্চনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। ২০১২ সালে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, এত বছর পর নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। তবে আক্ষেপও ছিল, যদি তাঁর মা–বাবা বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো এই দিনটি দেখে যেতে পারতেন।
কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাজনৈতিক জীবন শেষ, ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত আর ব্যক্তিগতভাবে তিনি গভীর হতাশার মধ্য দিয়ে গেছেন।

বলিউড তারকা অমিতাভ বচ্চন। এক্স থেকে

কেন আর ফেরেননি রাজনীতিতে
অমিতাভ পরে নিজের ব্লগে লিখেছিলেন, সংসদ সদস্য থাকার সময় তিনি বুঝেছিলেন, সরকারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষের জন্য আরও সরাসরি কাজ করতে চাইলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু যখন তিনি সামাজিক কাজ শুরু করেন, তখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এ অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দেয়।

এরপর অমিতাভ আর কখনো সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেননি। বরং অভিনয়ে ফিরে এসে নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলেন। নব্বইয়ের দশকের আর্থিক বিপর্যয়, কোম্পানির ঋণ, ক্যারিয়ারের পতন—সবকিছু পেরিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ান। পরে ‘কৌন বনেগা ক্রৌড়পতি’ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও কিংবদন্তিতে পরিণত করে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে