অনুদীপ কাটিকালা। এক্স থেকে
অনুদীপ কাটিকালা। এক্স থেকে

এই কমেডিয়ানকে ধরতে ১১০০ কিলোমিটার পাড়ি দিল পুলিশ, কী করেছিলেন তিনি

মঞ্চে তিনি হাসাতেন, ব্যঙ্গ করতেন, কখনো তীক্ষ্ণ কথায় আঘাত করতেন—এটাই স্ট্যান্ড-আপ কমেডির স্বভাব। কিন্তু সেই হাসির মধ্যেই কখন যে বিতর্কের আগুন জ্বলে ওঠে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ অনুদীপ কাটিকালা। একটি ‘রোস্ট’শোয়ের কয়েকটি মন্তব্যই তাঁকে নিয়ে গেছে সরাসরি পুলিশি হেফাজতে। আর সেই ঘটনাই এখন দক্ষিণ ভারতীয় বিনোদনজগতে বড় আলোচনার বিষয়।

হায়দরাবাদভিত্তিক এই কমেডিয়ান খুব বেশি দিন ধরেই আলোচনায় আসেননি, কিন্তু নিজের মতো করে জায়গা তৈরি করছিলেন। তিনি ‘সিলি সাউথ কমেডি ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা, তেলুগু স্ট্যান্ড-আপ কমেডির একটি সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম। নিয়মিত হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরুতে পারফর্ম করতেন, আর নিজের কনটেন্টে রাখতেন স্থানীয় সংস্কৃতি, সিনেমা আর সামাজিক ইস্যুর মিশ্রণ।

তবে অনুদীপ কাটিকালার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটি বিশেষ শো—‘টিলিউড রোস্ট শো’। নামেই বোঝা যায়, এখানে রেহাই নেই কারও। এই শোতে তিনি সরাসরি টলিউডের বড় বড় তারকাকে নিয়েই ব্যঙ্গবিদ্রূপ করেন। আর সেখানেই শুরু সমস্যার।
অনুদীপের স্ট্যান্ড-আপ সেটে তিনি মন্তব্য করেন তেলুগু সুপারস্টার পবন কল্যাণের ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষ করে একাধিক বিয়ে ও বিচ্ছেদ নিয়ে। শুধু তা–ই নয়, রাম চরণকে নিয়েও করেন কটূক্তি, এমনকি কনিডেলা পরিবারের অন্য সদস্যদের ব্যক্তিগত জীবনও টেনে আনেন মঞ্চে। দর্শকের একাংশ হাসলেও, অন্য অংশ তা গ্রহণ করেনি।
এসব মন্তব্য দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ভক্তদের একাংশ একে ‘অপমানজনক’ বলে আখ্যা দেয়। ফলস্বরূপ, অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাডা থানায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য।

অনুদীপ কাটিকালা। এক্স থেকে

১৪ এপ্রিল উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ থেকে কাঁকিনাড়া পুলিশের একটি দল তাঁকে আটক করে। অনুদীপকে বর্তমানে তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে ট্রেনে করে কাঁকিনাড়ায় নিয়ে আসা হচ্ছে। যদিও আইনজীবীদের মতে, এটি কোনো প্রথাগত গ্রেপ্তার নয়, বরং পুলিশি আটকমাত্র।

ঘটনার সূত্রপাত ১১ এপ্রিল, যখন পূর্ব গোদাবরী জেলার জনসেনা পার্টির (জেএসপি) এক কর্মী বাড়ে ভেঙ্কট কৃষ্ণা কাঁকিনাড়া টাউন থানায় অনুদীপের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগকারীর দাবি, অনুদীপ তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন, যেখানে পবন কল্যাণ ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে কুরুচিকর ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা হয়েছে। ভিডিওটিতে অনুদীপ পবন কল্যাণের বিবাহবিচ্ছেদ এবং তাঁর ভাইপো-ভাইঝিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রসিকতা করেন। বিশেষ করে পবন কল্যাণের একাধিক বিবাহবিচ্ছেদ এবং অভিনেতা রাম চরণের স্ত্রী উপাসনা কামিনেনির সম্পত্তি নিয়ে তাঁর মন্তব্যগুলো ভক্ত ও দলীয় কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) মানহানি, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং নারীদের অবমাননা–সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারা এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭ নম্বর ধারায় মামলা রুজু করেছে। উল্লেখ্য, পবন কল্যাণের দল জেএসপি বর্তমানে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এনডিএ জোটের অন্যতম শরিক।

এরপরই ঘটে নাটকীয় ঘটনা। অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর ভারতের প্রয়াগরাজ থেকে আটক করে অনুদীপকে।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর অনুদীপ প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও জেএসপি সমর্থকদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। অভিযোগ উঠেছে যে হায়দরাবাদের একটি কমেডি ক্লাবে ঢুকে একদল যুবক অন্য এক কমেডিয়ানকে ভয়ভীতি দেখায় এবং অনুদীপের ফোন নম্বর দাবি করে। জেএসপি নেতা সন্দীপ পাঞ্চাকর্লা এবং কিরণ রয়্যাল এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অনুদীপের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। অন্যদিকে শিল্পীমহল এবং সহ-কমেডিয়ানরা এই পুলিশি পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন। হায়দরাবাদের শিল্পী তাবিথা পার্সি এবং কমেডিয়ান বিবেক মুরলীধরনের মতে, রাজনৈতিক বা সেলিব্রিটিদের নিয়ে রসিকতা করার জন্য পুলিশের এই অতি-সক্রিয়তা বাক্‌স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত।

ভারতের প্রেক্ষাপটে কমেডিয়ানদের বিরুদ্ধে এমন আইনি পদক্ষেপ এই প্রথম নয়। এর আগে মুনাওয়ার ফারুকি, বীর দাস, কুনাল কামরা এবং অতি সম্প্রতি সময় রায়নার মতো শিল্পীরাও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে আইনি জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে