‘আমি কেরানি নই, আমি সুপারস্টার’—বলিউডের প্রথম সুপারস্টারের উত্থান–পতন

ইউটিউবে কিশোর কুমারের চেনা কণ্ঠ ভেসে আসে। পর্দায় বরফঢাকা পাহাড়। দুজন তারকার শান্ত, স্বাভাবিক হাঁটা। ‘এহে… আহা হা…’। ‘আরাধনা’ ছবির সেই দৃশ্য—রাজেশ খান্না আর শর্মিলা ঠাকুর পাশাপাশি চলছেন। কয়েক সেকেন্ড পর শুরু হবে গান, ‘কোরা কাগাজ থা ইয়ে মান মেরা…’। গান শুরু হওয়ার আগের দৃশ্যেই যেন একধরনের জাদু আটকে থাকে। মুখে নরম হাসি। চোখে স্থির কোমলতা। শরীরী ভাষায় আত্মবিশ্বাস। ভালোবাসার দৃশ্যের ভাষা যেন তিনি নতুন করে শিখিয়ে দিলেন বলিউডকে। এভাবেই বলিউড পেল একজন সুপারস্টার—রাজেশ খান্না।

গত ২৯ ডিসেম্বর ছিল তাঁর জন্মদিন। ১৯৪২ সালের ২৯ ডিসেম্বর, পাঞ্জাবের অমৃতসরে জন্মেছিলেন তিনি। সিনেমা–সমালোচক, সহকর্মী, ভক্ত—কেউই ভুলতে পারেন না আবেগমাখা সেই সময়গুলো, যখন বলিউড মানেই ছিল রাজেশ খান্না। তাঁর মেয়ে টুইঙ্কেল খান্না, যিনি বাবার জন্মদিনেই জন্মেছিলেন। একবার লিখেছিলেন, ‘এটা আমাদের যৌথ দিন—এখন এবং আজীবনের জন্য।’ সেই সুপারস্টারের জীবন, সাফল্য, পতন আর নিঃসঙ্গতা মিলিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ মানবিক গল্পই যেন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

যতীন থেকে রাজেশ—পরপর ১৬টি হিট
তাঁর আসল নাম যতীন খান্না। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন একটু আলাদা—চুপচাপ, সংবেদনশীল, অভিনয়ের প্রতি একরকম টান ছিল ছোটবেলা থেকেই। খুব অল্প বয়সেই তিনি দত্তক যান আত্মীয় চুনিলাল ও লীলাবতী খান্নার বাড়িতে। সেখানেই বড় হয়ে ওঠা। জন্মস্থান ও বাবার কর্মক্ষেত্র পড়ে আজকের পাকিস্তানের পাঞ্জাব অঞ্চলে। স্কুলে থাকতেই মঞ্চনাটকে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন তিনি। কলেজে ওঠার পর নাটকের প্রতি তাঁর ঝোঁক আরও বেড়ে যায়। নাটকে অভিনয় করে পেয়েছেন পুরস্কার, প্রশংসা—আর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস। সেই সময়েই বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘কাকা’—ভালোবাসার, ঘনিষ্ঠতার সম্বোধন। ১৯৬৫ সালে ফিল্মফেয়ার ট্যালেন্ট প্রতিযোগিতা তাঁর জীবনের বড় বাঁকবদল। সেখানে বিজয়ী হওয়ার পর নজরে পড়েন প্রযোজক–পরিচালকদের। এক বছর পরই ১৯৬৬ সালে  মুক্তি পায় তাঁর প্রথম ছবি ‘আখেরি খাত’। মুখচেনা হয়ে ওঠেন, তবে এখনো ‘সুপারস্টার’ নন।  মোড় ঘোরে ‘আরাধনা’ দিয়ে। গল্পটা যে নায়িকাকেন্দ্রিক, তাই প্রথমে সংশয় ছিল তাঁর। পরিচালক শক্তি সামন্ত অনেক বোঝালেন। অবশেষে রাজি হলেন। আর সেই সিনেমাই পাল্টে দিল তাঁর জীবন। কিশোর কুমারের কণ্ঠ, আর ডি বর্মণের সুর আর তাঁর পর্দার উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ভারতীয় সিনেমা পেল তাদের ইতিহাসের প্রথম ‘সুপারস্টার’। যদিও বলিউডের প্রথম সুপারস্টার নিয়ে ভিন্নমতও আছে।

‘আরাধনা’–এর পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক ছবি, আর টানা ১৬টি সুপারহিট দিয়ে দর্শক মাতাল—যা আজও হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে এক অনথিভুক্ত রেকর্ড। তাঁর নতুন ছবি মানেই তখন প্রযোজকের নিশ্ছিদ্র নিশ্চয়তা, দর্শকের উন্মাদনা আর তরুণ প্রজন্মের অনুকরণীয় স্টাইল। বাড়ির সামনে ভিড় লেগে থাকত। প্রতিদিন আসত হাজার হাজার চিঠি। দেশের নানা প্রান্তে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের নাম রাখা হতো ‘রাজেশ’—এই ভালোবাসা খুব কম তারকাই পেয়েছেন। এমনকি তিনি হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও প্রযোজকেরা নাকি পাশের কক্ষ ভাড়া করতেন, শুধু তাঁকে চিত্রনাট্য শোনাতে।


তাঁর অভিনয়ের স্টাইলও ছিল আলাদা। মৃদু হাসি। চোখ নামিয়ে আবার তাকানো। সংলাপ বলার নরম ছন্দ। এসব মিলেই তৈরি হয়েছিল ‘রাজেশ খান্না স্টাইল’। তাঁর উপস্থিতি পর্দায় এলেই গল্প আর বাস্তবের মাঝের দেয়াল যেন একটু নরম হয়ে যেত। তখনই বলিউড শিখেছে—স্টারডম বলতে আসলে কী বোঝায়।
কিশোর–পঞ্চম–রাজেশ—তিনে মিলে তৈরি হয়েছিল এক জাদু
রাজেশ খান্নার সাফল্যের গল্প বলতে গেলে আলাদা করে বলতে হয় দুজনের নাম—কিশোর কুমার এবং আর ডি বর্মণ (পঞ্চমদা)। তাঁদের তিনজনের সম্মিলিত উপস্থিতি যেন তৈরি করেছিল এক অদ্ভুত সুরজাদু। বলিউডের প্রেমের গানকে নতুন এক আবহে তাঁরা তুলে নেন—যেখানে নরম আবেগ, বিষণ্নতার সূক্ষ্ম ধারা এবং সংযত অভিনয় মিলেমিশে যায় অনায়াসে।

ধারণা করা হয়, কিশোর কুমার রাজেশ খান্নার প্রায় ৯০টির বেশি ছবিতে গান গেয়েছেন এবং আর ডি বর্মণ সুর দিয়েছেন ৩৮-৪০টি ছবিতে। সংখ্যাটা শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটাই প্রমাণ করে, একটি যুগে তাঁরা প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন।
এই জুটির উত্থানও সিনেম্যাটিক। ‘আরাধনা’র গানগুলোতে আসলে প্রথমে গেয়েছিলেন মোহাম্মদ রফি ও অন্য কণ্ঠশিল্পীরা। পরে পরিচালক শক্তি সামন্তের সিদ্ধান্তে কিছু গান নতুন করে গাওয়া হয় কিশোর কুমারের কণ্ঠে। আর ঠিক সেখানেই বদলে যায় ইতিহাসের পথ। ‘মেরে স্বপ্নো কি রানি’, ‘রূপ তেরা মস্তানা’—এই গানগুলো শুধু জনপ্রিয় হয়নি, কিশোর-রাজেশ নাম দুটি যেন চিরকালের মতো বাঁধা পড়ে যায় একসুতোয়। এরপর একের পর এক কালজয়ী গান, ‘ইয়ে শাম মস্তানি’ ‘কোরা কাগাজ থা ইয়ে মান মেরা’ ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’, ‘হাম দোনো দোপ্রিলম’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’—প্রতিটি গানে কিশোরের কণ্ঠে ছিল রাজেশের অভিনয়ের ‘ভেতরের আবেগ’ আর পঞ্চমদার সুরে ছিল সমকালীনের মধ্যেও এক চিরন্তন স্পর্শ।

আর ডি বর্মণের সুর যেন রাজেশ খান্নার পর্দার আবেগকে আরও উজ্জ্বল করে তুলত। কখনো স্যাক্সোফোন, কখনো বেহালার মায়াবী ছোঁয়া, কখনো আধুনিক ড্রামবিট—সবকিছু মিলিয়ে রাহুল দেব বানাতেন এমন এক সাউন্ড, যা ঠিকঠাকভাবে বসে যেত রাজেশের অভিনয়ের ওপর। আর কিশোর কুমার সেই আবেগকে গলায় ধারণ করতেন অনায়াসে। তাঁদের এই তিনজনকে কেন্দ্র করে বলিউডে তৈরি হয় এক ‘গোল্ডেন ট্রায়ো’, যাঁরা মিলেই ষাট-সত্তর দশকের বলিউড রোমান্টিকতার সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন। প্রেমের গান হয়ে উঠেছিল সংযত, পরিণত—কম শব্দে, কম অঙ্গভঙ্গিতে; কিন্তু গভীর অনুভূতিতে ভরা।

ব্যক্তিজীবনের গল্প—ভালোবাসা, দূরত্ব, ভাঙন
সিনেমার বাইরেও তাঁর জীবন ছিল অলিখিত ছবির মতোই নাটকীয়। কলেজজীবনেই দীর্ঘদিন প্রেম করেছিলেন অঞ্জু মহেন্দ্রুর সঙ্গে। কিন্তু সম্পর্ক টেকেনি। পরে জীবনে আসেন ডিম্পল কাপাডিয়া। ডিম্পল তখন নতুন মুখ, ‘ববি’ ছবির সময়ে। আর রাজেশ—সে সময় দেশের সবচেয়ে বড় তারকা। বিমানে পাশাপাশি বসার সেই ঘটনাই নাকি কাছে এনেছিল দুজনকে। ‘ববি’ মুক্তির মাত্র ছয় মাস পরই হয় বিয়ে। কিন্তু সংসার খুব একটা মসৃণ ছিল না। স্বভাব, জীবনযাপন আর চরিত্রের ভিন্নতা ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ায়। একসময় তাঁদের আলাদা থাকতে হয়। এর মধ্যেই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় টিনা মুনিমের সঙ্গে। বলিউডপাড়ায় এই সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন অনেক কথা হয়েছে। অন্যদিকে মুমতাজের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়নও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। যদিও দুজনই বরাবর নিজেদের ‘বন্ধু’ বলেই পরিচয় দিয়েছেন।

অমিতাভের উত্থান, সুপারস্টারের ভেঙে পড়া মন
বলা হয়, অমিতাভ বচ্চনের উত্থান তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি। এমন এক সময় ছিল, যখন বলিউড মানেই ছিলেন রাজেশ খান্না। একের পর এক হিট ছবি, অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তা—তিনি ছিলেন পুরো ইন্ডাস্ট্রির কেন্দ্রবিন্দু। সেই জায়গায় আরেকজন নায়ক এসে জায়গা করে নেবেন, এটা ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাসী (কখনো অহং মনে হওয়া) মনোজগতের জন্য কঠিন সত্য।

প্রায়ই উল্লেখ করা হয় ‘বাবুর্চি’ ছবির শুটিং–সংক্রান্ত একটি ঘটনা। তখন অমিতাভ বচ্চন নিয়মিত সেটে আসতেন প্রেমিকা জয়া ভাদুড়ির সঙ্গে দেখা করতে। এতে নাকি বিরক্ত হয়ে একদিন সবার সামনে অমিতাভকে তির্যক কথা বলেন রাজেশ। অমিতাভ তখন চুপ ছিলেন। কিন্তু জয়া সরাসরি বলেছিলেন, ‘আজ যাঁকে আপনি অপমান করছেন, কাল তিনিই আপনাকে টপকে যাবেন।’
কয়েক বছর পর সত্যিই বদলে যায় সময়ের সমীকরণ। অ্যাকশনধর্মী, প্রতিবাদী চরিত্রে অমিতাভের উত্থান শুরু হয়। দর্শক ধীরে ধীরে রোমান্টিক নায়ক থেকে সরে গিয়ে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এ নিজেদের খুঁজতে শুরু করেন। আর ঠিক তখনই রাজেশ খান্নার জৌলুশ যেন একটু একটু করে ম্লান হয়ে আসে।


একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের কথা প্রায়ই শোনা যায়—সবার নজর তখন অমিতাভের দিকে। স্টেজ, পেছনের ভিড়েও তাঁর নামেই উচ্ছ্বাস। সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন রাজেশ খান্না—চোখে কৌতূহল, হয়তো খানিকটা শূন্যতা। বলা হয়, সেদিন বাড়ি ফিরে তিনি নীরবে কেঁদেছিলেন। এ গল্পের কতটা সত্য, কতটা কিংবদন্তি, তা ইতিহাসই জানে। তবে সত্যিটা হলো, একসময়ের ‘রাজা’ বুঝতে পেরেছিলেন, সিংহাসনে নতুন কেউ বসে গেছে। এটাই ছিল তাঁর জীবনের বড় মানসিক আঘাত। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর ভেতরের ভেঙে পড়া—নীরবে, ধীরে, গভীরভাবে।

পতনের শুরু—নিজের হাতেই তোলা দেয়াল
অনেক সমালোচকের মতে, তাঁর পতনের পেছনে বড় দায় ছিল তাঁর নিজেরই। সাফল্যের চূড়ায় ওঠার পর ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে তৈরি হয় একধরনের খামখেয়ালিপনা। সেটে দেরিতে যাওয়া, কাজে অনিয়ম, সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দোদুল্যমানতা—সব মিলিয়ে প্রযোজক–পরিচালকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ নায়ক। সেই সঙ্গে ছিল অসংযত জীবনযাপন, আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত আর প্রবল আত্মবিশ্বাস, যা অনেকের কাছে অহংকারও মনে হতো। তিনি নিজেই একসময় বলেছিলেন, ‘আমি কেরানি নই, আমি সুপারস্টার। আমার ইচ্ছা হলে তবেই আমি কাজ করব।’ এই মনোভাব তাঁকে ধীরে ধীরে চারদিক থেকে আরও একা করে দেয়। বড় বাজেটের ছবিগুলো আর নিয়মিত তাঁর কাছে আসতে থাকে না। পরিবারেও টানাপোড়েন বাড়ে। ডিম্পল কাপাডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবসান, সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব—সব মিলিয়ে ব্যক্তিজীবনের ভরসার জায়গাগুলোও নড়বড়ে হয়ে ওঠে। এদিকে বলিউডের চাহিদাও বদলে যাচ্ছিল। স্ক্রিনে তখন উঠে আসছেন নতুন নায়ক, নতুন ধারা, নতুন নায়কোচিত ভাষ্য। আর ঠিক এই সময়েই রাজেশ খান্না ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকেন স্টুডিওর আলোঝলমলে জগৎ থেকে। তবু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে ভাঙতে দেননি। নীরব, বিষণ্ন হলেও একরকম দৃঢ়তা ছিল তাঁর মধ্যে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আবার জন্ম নিলে রাজেশ খান্নাই হয়ে জন্মাতে চাই। একই ভুলগুলো আবার করতে চাই।’

শেষযাত্রা—নীরবতার ছায়ায় সুপারস্টার
জীবনের শেষভাগে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন রাজেশ খান্না। ধীরে ধীরে নেপথ্যে সরে গিয়েছিলেন তিনি। ছিলেন না কোনো খবরের শিরোনামে, যেতেন না কোনো আয়োজনে। তাঁকে মিলত না কোনো প্রয়োজনে। ২০১২ সালের ১৮ জুলাই তাঁর মৃত্যুতে বলিউড বুঝতে পারল, এক যুগের শেষে দাঁড়িয়ে আছে তারা। হারাল শুধু এক অভিনেতাকে নয়, একসময়ের প্রতীককে।
রাজেশ খান্না এমনই নায়ক ছিলেন, যাঁর দৃষ্টি, নরম হাসি, সংযত রোমান্টিকতা—সবই গেঁথে আছে দর্শকের স্মৃতিতে। প্রেমকে তিনি করেছিলেন সহজ, শোককে করেছিলেন নান্দনিক। তাই আজও মানুষ ইউটিউবে খুঁজে নেন বরফঢাকা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে শর্মিলার দিকে তাকানো সেই যুবককে। আর মনে পড়ে যায় সেই সংলাপ—‘পুষ্পা, আই হেট টিয়ার্স।’